‘যুগের ইমামের মারেফাত ও ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি’

by Rashed Hossain

অনুবাদঃ মোঃ ইকবাল

তেহরানের জনৈক ইমামে জামায়াত বলেন যে, আমি বিখ্যাত গ্রন্থ “গাদ্বীর” এর লেখক আল্লামা হোসাইন আমানী (রহঃ) নাজাফ থেকে তেহরান সফরে এলে আমিও তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য উপস্থিত হলাম এবং আমার গৃহে তশরীফ আনতে অনুরোধ জানালাম। আল্লামা আমার অনুরোধ রাখলেন। আমি তাঁর সম্মানার্থে অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকেও পূর্বাহ্নেই আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলাম। তাদের উপস্থিতিতে আল্লামা তশরীফ আনলেন এবং আমি তাঁকে অভ্যর্থনা জানালাম। রাত্রে আমি আল্লামাকে অনুরোধ জানালাম এমন কিছু বলার জন্য যাতে আমরা উপকৃত হতে পারি এবং আত্মিক প্রশান্তি লাভ করতে পারি। আল্লামা আমিনী বললেনঃ “আমি বেশ কিছু বই পড়াশুনার উদ্দেশে সিরিয়ার হালাব শহরে গিয়েছিলাম এবং সেখানে অধ্যয়নে মনোনিবেশ করলাম। সে সময় জনৈক সুন্নী ব্যবসায়ীর সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ও পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকলো। একদিন তার গৃহে তিনি আমাকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন। আমি তার গৃহে প্রবেশ করলে দেখতে পেলাম হালাব শহরের সকল বুজুর্গ ব্যক্তিত্ববর্গ সেখানে উপস্থিত। শহরের খ্যাতিসম্পন্ন আলেমে দ্বীন, হালাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, উকিল, বড় বড় ব্যবসায়ী ও দোকানমালিক মোটকথা, সমাজের সকল স্তরের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও হালাব শহরের প্রধান বিচারপতিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আহারের পর প্রধান বিচারপতি আমার প্রতি লক্ষ্য করে বললেন “আমিনী সাহেব! এই যে, শিয়া এটা কেমন মযহাব এর ভিত্তিই বা কী যাকে ত্যাগ করতে পারছোনা”?

আমি তাকে বললাম, “এ হাদিসটি আপনার এখানে গ্রহণযোগ্য কি না, যেখানে এরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজ যামানার ইমামকে না চিনে মৃত্যুবরণ করল সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল”? তিনি উত্তরে বললেন, “এ হাদিসটি সঠিক”।

আমি বললাম, “আজকের বাহাস অব্যাহত রাখার জন্য এ হাদীসটি যথেষ্ট” কাযী সাহেব নীরব থাকলেন। কিছুক্ষণ পর আমি জিজ্ঞাসা করলাম “আপনার দৃষ্টিতে হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ)-এর মরতবা কতটুকু বলে মনে করেন”।

তিনি বললেন, “পবিত্র কোরআনের আলোকে সাইয়্যেদা(আঃ) পূতপবিত্র একজন নারী এবং তিনি হুজুর পাক(সাঃ)-এর মহান ও সম্মানিত সত্যবাদীদের অন্যতম”। আমি তখন প্রশ্ন করলাম,

“হযরত ফাতেমা (আঃ) সে যুগের শাসকের প্রতি অসন্তষ্ট ও ক্রোধান্বিত হয়ে কেন পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন”? তৎকালীন শাসক কী উম্মতের ইমাম ও সত্য খলিফা ছিলেন না? অথবা আল্লাহ ক্ষমা করুন, হযরত ফাতেমা (আঃ) যুগের ইমামের মারেফাত অর্জন না করেই জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করেছেন”? হালাব শহরের আলেম অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। কেননা যদি তিনি স্বীকার করে নেন যে, ফাতেমা (আঃ)-এর অসন্তষ্টি ও ক্রোধ সঠিক ছিল। তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে, সেই শাসন ব্যবস্থা বাতিল ছিল। আর যদি বলতেন যে, ফাতেমা (আঃ) ভূল করেছেন এবং যুগের ইমামের মারেফাত ছাড়াই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তাহলে তাঁর কর্তৃক এ নির্জলা ভুল তার পবিত্রতা ও মর্যাদার পরিপন্থী হতো। অথচ তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার সাক্ষ্য স্বয়ং পবিত্র কোরআন দিচ্ছে। হালাবের প্রধান কাযী বাহাসের দিক পরিবর্তনের উদ্দেশে বললেন, জনাব আমিনী! আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তর সাথে যুগের শাসকের প্রতি হযরত ফাতেমা (আঃ) এর ক্রোধ ও অসন্তষ্টির সম্পর্ক কী? উক্ত সভায় উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দিক থেকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং তারা ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, আল্লামা আমিনী এ সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তাদের আকীদা বিশ্বাসের উপর কত বড় আঘাত করেছেন।

আমি বললাম, আপনারা না কেবল নিজ জামানার ইমামকেই চেনেননি বরং ঐ সকল ব্যক্তির সঠিকতা সম্পর্কেও সন্দেহ ও সংশয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন যাদেরকে আপনারা খলীফাতুর রাসূল (সাঃ) বলে জানেন…।

আমার মেজবান যিনি একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাযী সাহেবের উদ্দেশে বললেনঃ হে শেইখ! আপনি চুপ করুন, আমরা অপমানিত হয়েছি, অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে অপমানিত ও অসম্মানিত করেছেন। আমাদের এ বাহাস সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং প্রভাত নিকটবর্তী হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষক, কাযী ও ব্যবসায়ীবৃন্দ সেজদাবনত হলেন এবং শিয়া মাযহাব গ্রহণ করার ঘোষণা দিলেন। অতঃপর তারা আল্লামা আমিনীর শুকরিয়া আদায় করেন যিনি তাদেরকে নাজাতের তরীতে বসার ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন। এ ঘটনা এখানে বর্ণনা করার একমাত্র কারণ হলো আহলে সুন্নাতের ভাইয়েরা শীয়াদের ন্যায় এ হাদীসটি স্বীকার করেন আর এটি এমন হাদীস যার থেকে প্রমাণিত হয় যে, সকল যুগে একজন ইমামের হওয়া জরুরী যার মারেফাত অর্জন করা ওয়াজিব। যাইহোক, মুসলমানদের জানা উচিৎ যে, তারা তাদের দ্বীনি শিক্ষা কার মাধ্যমে অর্জন করছে এবং তাদের যুগের ইমাম কে?

সাইয়্যেদ আহমেদ মুসাভী নামের জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি পূর্ব বর্ণিত জাহেলিয়াতের মৃত্যু সম্পর্কিত হাদিসের উপর একটি প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছেন যা এখানে উপস্থাপন করা সঙ্গত মনে করছি।

হুঁশিয়ারি বা তিরস্কার (জাহেলিয়াতের মৃত্যু) সম্বলিত হাদিস সম্পর্কে দলিলঃ

সকল মুসলমান এ বিষয়ে একমত যে, যে রেওয়াতসমূহ এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করছে যে নিজ যামানার ইমামকে না চিনে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করে তা নিশ্চিতরূপে রাসূল করিম (সাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস এখানে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। বিষয়বস্ত এবং উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু প্রকৃত বিষয়বস্তর মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য নেই। এ বিষয়টি এত বেশী খ্যাতি ও বিশ্বস্ততা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল যে, অত্যাচারী ও নির্যাতনকারী শাসকও একে অস্বীকার করতে না পারে এবং পরিবর্তন ও নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে। যেমন আল্লামা আমিনী(রহঃ) এ হাদীসগুলোকে শুদ্ধ ও সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন সুতরাং বিষয়টি মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই আর কোন মুসলমানের ইসলাম তার উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্পিত না হওয়া পর্যন্ত পরিপুর্ণ হতে পারে না। এ সত্যতার বিপক্ষে যেমন দ্বিতীয় কোন মত নেই তেমনি একজনও সন্দেহ ও সংশয় প্রকাশ করেন নি । আর এ কথার দলিল যে, ইমাম ব্যতীত মৃত্যুবরণকারীর পরিণতি অত্যন্ত নিকৃষ্টতম হয়ে থাকে এবং তার অদৃষ্টিতে কোন প্রকার সাফল্য ও কল্যাণ নেই। জাহেলিয়াতের মৃত্যু থেকে নিকৃষ্ট অন্য কোন মৃত্যু নেই। প্রকৃতপক্ষে এ মৃত্যু হচ্ছে কুফ্‌র ও নাস্তিকের মৃত্যু এবং এতে কোন ইসলামের মিশ্রণ নেই। (আল-গাদ্বীর, নং ১০, পৃ- ৩৬০)

এখন থাকলো হাদীসের অন্তর্নিহিত মর্ম ও সেক্ষেত্রে এর ব্যাখ্যা ও স্পষ্টকরণের জন্য জাহেলিয়াতের যুগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন এবং তা না হলে বিষয়টি পরিপূর্ণরূপে সৃষ্ট হবে না। ‘পবিত্র কোরআন ও হাদীসে রাসূল করিম (সাঃ)-এর নব্যুয়াতের যুগকে জ্ঞান ও সত্যপথের যুগ এবং এর পূর্বের যুগকে জাহেলিয়াত ও বিপথগামীতার যুগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ সে যুগে ঐশী ধর্মসমূহে পরিবর্তন ও পরিবর্ধণের কারণে সঠিক পথ ও বাণী পাওয়া সম্ভব ছিল না। সে যুগে মানব সমাজে দ্বীনের নামে যে নিয়ম-রীতির প্রচলন ছিল তা ছিল কল্পনাপ্রসূত ও ভিত্তিহীন আর এ দ্বীন ও মাযহাবসমূহ অত্যাচারী শাসকবর্গের হাতে একটি চমৎকার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হতো যার সাহয্যে শাসকবর্গ জনগণের স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে নিজ ইচ্ছা ও অভিলাষের ইশারায় জনগণকে পরিচালিত করতো ।

কিন্তু এরপর যখন মহানবী (সাঃ) নব্যুয়ত ঘোষণা করলেন এবং এ নব্যুয়তের ছায়ায় জ্ঞান ও হেদায়াতের সুর্য উদিত হলো তখন হুজুর পাক (সাঃ) এর দায়িত্বসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল ঐ সকল কল্পকাহিনী ও অর্থহীন বর্ণিত নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং সত্যকে প্রকাশ করা। সে লক্ষ্যে তিনি একজন দয়ালু ও মহানুভব উম্মতের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কাজের সূচনা করলেন এবং স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন যে আমি তোমাদের পিতার ন্যায় এবং তোমাদের শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব আমার। (মুসনাদে ইবনে হাম্বাল, খঃ ৩, পৃঃ ৫৩, সুনানে নাসাঈ, খঃ ১, পৃঃ ৩৮, সুনানে ইবনে মাজা, খঃ ১, পৃঃ ১১৪)

নবী করিম (সাঃ)-এর পয়গাম ছিল আকল ও যুক্তিভিত্তিক। তার এই পয়গামের আলোকে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সত্যকে খুঁজে পাওয়া সহজ এবং তারা স্পষ্টই বুঝতে পারছিলেন যে, এ পয়গামের সম্বন্ধ গুপ্ত ও অদৃশ্য জগতের সাথে সম্পৃক্ত।

তিনি বরাবর এই বলে জনগণকে সতর্ক করতেন যে, যে সকল বিষয়কে আকল ও যুক্তি প্রত্যাখান করেছে তার উপর বিশ্বাস রাখবে না। জ্ঞান ব্যতিরেকে এবং না জেনে কোন কিছুর প্রতি ধাবিত হবে না। এ ভুমিকার মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের কাছে পরিপূর্ণরূপে স্পষ্ট হয় যে, প্রত্যেক যুগের ইমামদের মারেফাত অর্জন কোন এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় ছিলনা যে, কোন ব্যক্তি ইমামের মারেফাত অর্জন না করে যদি মৃত্যুবরণ করে তাহলে ঐ ব্যক্তি জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করেছে বরং প্রকৃতপক্ষে এটি সম্মিলিত এবং সমগ্র উম্মতের পার্থিব জীবনের একটি বিষয় ছিল। নবী করিম(সাঃ) এর নব্যুয়তের সুর্য উদিত হওয়ার সাথে যে জ্ঞান ও মারেফাতের যুগের সূচনা হয় তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না মুসলমান নিজ যুগের ইমামকে চিনে তাঁর আনুগত্য করবে।

পরিস্কার ভাষায় এভাবে বলা যেতে পারে যে ইমামত-ই যুগের জ্ঞান ও ইরফানের একমাত্র জামিনদার যা নবী করিম (সাঃ) এর নব্যুয়ত ঘোষণার সাথে শুরু হয় এবং এ জামানত বিলুপ্ত হওয়ার স্বাভাবিক পরিণাম হলো ওই যুগের ইসলাম ও ইরফানের ধ্বংস যার নিশ্চিত প্রভাব হচ্ছে জাহেলিয়াত যুগের প্রত্যাবর্তন এবং পুরো সমাজ জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করবে। যার প্রতি পবিত্র কোরআন ইঙ্গিত করছে যে, “হে মুসলমান ! দেখ মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল ব্যতীত কিছু নয় এবং তার পূর্বে অনেক রাসূল গত হয়েছেন । এমন না হয় যে, তিনি মৃত্যুবরণ করলে অথবা নিহত হলে তোমরা পুর্বের জাহেলিয়াতের যুগে প্রত্যাবর্তন কর”। অর্থাৎ বোঝা যায় যে, মুসলমানদের জাহেলিয়াতের যুগে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা ছিল আর রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর চিকিৎসা ইমামের মারেফাতের মাধ্যমে করতে চেয়েছেন এবং বরাবর ওই নির্দেশকে স্পষ্ট করেছেন যে উম্মত পূনরায় জাহেলিয়াতের পাঁকে আটকা পড়তে পারে এবং জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করতে পারে আর এর প্রধান কারণ যুগের ইমামের (আঃ) নেতৃত্বের প্রতি অবাধ্যতা ও অস্বীকারের রূপে প্রকাশ পাবে। এখন প্রশ্ন হলো কোন ইমামের মারেফাত? যদি আমরা হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করি তাহলে প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, নবী আকরাম (সাঃ) কোন ইমাম ও কোন ধরনের ইমামের মারেফাতকে জরুরী বলে উল্লেখ করেছেন যার ব্যতীত না প্রকৃত ইসলাম অবশিষ্ট থাকতে পারে আর না জাহেলিয়াতের দিকে প্রত্যাবর্তনের আশংকা উঠে যেতে পারে।

এটা কী সম্ভব যে উল্লেখিত মারেফাতের অর্থ প্রত্যেক ওই ব্যক্তির মারেফাত অর্জন ও অনুগত্য যে, নিজের জন্য ইমামতের দাবীদার হয় এবং ইসলামী সমাজের লাগাম ধরে বসে পড়ে এবং অন্যান্য ব্যক্তি তার আনুগত্য না করে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করে। এতদ্ব্যতীত তার কীর্তি ও কর্মের মুল্যায়ন হয় না এবং তার জুলূম-অত্যাচার আবলোকন না করে যে মানুষকে ওই ইমামগণের মধ্যে গণ্য করে যে জাহান্নামের প্রতি আহবানকারী হয়ে থাকে ?

ইতিহাসে দেখা যায় প্রত্যেক অত্যাচারী ইমাম তাদের যুগে হাদীসের এমন ব্যাখ্যাই দেয়ার চেষ্টা করেছে যাতে তাদের শাসন ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়। সুতরাং এ কারণেই হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে মুয়াবিয়াও অনর্-ভুক্ত যার এ হাদীসের খুবই প্রয়োজন ছিল এবং এটা স্পষ্ট যে, শাসক কর্তৃক যখন হাদীস বর্ণিত হবে তখন দরবারী আলেমরা এর প্রচার ও প্রসারে এবং হাদীসের গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধিতে নিয়োজিত হবেন আর এভাবে হাদীসের আলোকে মুয়াবিয়ার মত ব্যক্তির শাসনকে বৈধতা দান এবং শক্তিশালী করা হয়। যদিও বিষয়টি সম্পর্কে এটা শাব্দিক বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছু না এবং হাদীসের ব্যাখ্যা বিশ্লষণের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই আর না-ই একে ইজতিহাদগত ভূল অথবা অসৎ বুদ্ধি বলা যেতে পারে। এমন কল্পনা কে করতে পারে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর(রাঃ) কর্তৃক আলী (আঃ)-এর বায়ত অস্বীকার করার পেছনে তার জ্ঞান অথবা চিন্তাগত দুর্বলতা ছিল এবং আলী (আঃ) এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তার কোন ধারনা ছিল না? প্রকৃত সত্য হলো ইবনে ওমর কর্তৃক রাতারাতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দরবারে গিয়ে তার হাতে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের জন্য বায়েত করা সেই এহতিয়াতের কারণে হয়েছিল যে, এমন না হয় একটি রাত ইমামের বায়ত ছাড়া অতিবাহিত হয় এবং পয়গাম্বর (সঃ) এর এরশাদ মোতাবেক জাহেলিয়াতের মৃত্যু হয়। ইবনে আকিল হাদীদ উল্লেখ করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর প্রথমে হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) এর বায়ত করতে অস্বীকার করেন । অতঃপর একদিন রাত্রে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের গৃহে এ উদ্দেশ্যে উপস্থিত হন যাতে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের বায়ত তার হাতে করতে পারেন ; এমন না হয় যে, একটি রাত ইমামের বায়ত ছাড়া অতিবাহিত হয় । যে সম্পর্কে নবী করিম (সাঃ) এরশাদ করেন, যদি কোন ব্যক্তি ইমামের বায়ত ছাড়া মৃত্যুবরণ করে সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করেছে। তাই হাজ্জাজ বিন ইউসুফও আব্দুর মালিকের পক্ষে বায়ত গ্রহণের এ সুযোগটি হাতছাড়া না করে হাতের পরিবর্তে চাদরের ভিতর থেকে পা বের করে বায়ত করার আহ্বান জানালো অর্থাৎ তোমার মত মানুষ উপযুক্ত নও যে হাতে বায়ত কর । (নাহাজুল বালাগার ব্যাখ্যা অংশ, পৃঃ ২৪২)

এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি ইমাম আলী (আঃ) কে ইমাম হিসাবে মেনে নিতে পারেনি তার ইমাম আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের ন্যায় জুলুমবাজ ব্যক্তি ছা্‌ড়া আর কে হতে পারে? তার (ইবনে উমর) চিন্তা ভাবনা হল মালিকের বায়াত অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে জাহেলিয়াতের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার শামিল। যে কারণে দেখা যায় যে, রক্ত পিপাসু হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও আব্দুল মালিকের ন্যায় অত্যাচারীর হাতে বায়াত করার ক্ষেত্রেও তিনি কুন্ঠাবোধ করেননি। শুধু তাই নয় এমনকি এজিদের মত কলুষ ব্যক্তি যার হাত রঞ্জিত হয়েছে ইসলাম ও আহলে বায়াতের (আঃ) পবিত্র শোণিত প্রবাহে শেষ পর্যন্ত উক্ত হাদীসটি (ইমামের মারেফাত ব্যতীত মৃত্যুবরণ করা অর্থাৎ জাহেলিয়াতের অবস্থায় মৃত্যুর শামিল) তার উপর প্রমাণ করার চেষ্টা চালায়।

ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে মদিনাবাসীরা এজিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। যার পরিণতিতে হুররার (এজিদকর্তৃক অসংখ্য মুসলিম ব্যক্তিদের নিরবিচারে হত্যা করা হয়) মত একটি ট্রাজেডির সূত্রপাত ঘটে। উক্ত ঘটনার পর আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কোরাইশদের সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন মুতির কাছে এসে কিছু একটা বলার প্রয়াস চালালে আব্দুল্লাহ তাকে বসার অনুরোধ জানায়। তৎক্ষনাৎ উমর বললেন, আমি বসতে আসেনি। আমার আসার উদ্দেশ্য হলো তোমাকে মহানবীর (সাঃ) একটি হাদীস স্মরণ করিয়ে দেয়া। পয়গম্বর (সাঃ) বলেছেন যে, কেউ যদি ইমামের অনুকরণ থেকে হাত গুটিয়ে নেয় তাহলে সে পরকালে এমন অবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার কাছে কোন ওজর বা দলিল থাকবে না এবং কেউ যদি ইমামের আনুগত্য বা বাইয়াত ব্যতিত মারা যায় তবে তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের অবস্থায়। (সূত্রঃ সহীহ মুসলিম, খঃ ৩, পৃ-১৪৭৮, হঃ ১৮৫১)

সুধী পাঠক, আপনারা একটু গভীরবাবে বিশ্লেষণ করলে বুঝতে সক্ষম হবেন যে, উক্ত বিবেক বুদ্ধি বিক্রেতা (ইবনে উমর) কিভাবে হাদীসের প্রকৃত চেহারা পাল্টে দিয়েছেন এবং তা এজিদের হুকুমতের স্বপক্ষে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করছে। মহানবী (সাঃ) পূর্বেই এধরনের ব্যাধির প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর জনতা যেন সত্য ও সঠিক ইমামের আনুগত্য করে সুপথ প্রাপ্ত হতে পারে তারও ভবিষ্যদ্বাণী ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু ধোকাবাজ ও বিকৃত চিন্তার ধারক বাহকরা সত্য হাদীসের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালিয়েছে।

আর এভাবে এই হাদীসগুলোর অপব্যবহার করে ইসলামের ইমারতকে নড়বড়ে করে দেয়ার মাধ্যম বানিয়ে ছিল। কালক্রমে ইসলাম ও ইলমের যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং ইসলামী উম্মাহ সত্য ও সঠিক ইমামকে না চেনার কারনে এবং তাদের অস্বীকার করার ফলে পূনরায় সেই জাহেলিয়াতের যুগের প্রত্যাবর্তন ঘটছে এবং পাশাপাশি কুফর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার সিলসিলাও বলতে গেলে শুরু হয়ে গেছে। অথচ হাদীসের মূলতঃ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল যেন জনতা আয়েম্মায়ে আহলে বাইয়েতের (আঃ) নেতৃত্ব ও রাহবারিত্ব কখনো ভুলে না যায় এবং তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে। কিন্তু বাস্তবতা বিসর্জিত হল, যার ফলে ইলম, হেদায়েতের যুগের পরিসমাপ্তি এবং কুফর ও জাহেলিয়াতের যুগের পুনরাগমন ঘটল । তাই মহানবী (সাঃ) হাদীসে গাদীর, হাদীসে সাকালাইন এবং আরো এরকম অসংখ্য হাদীসের মাধ্যমে সেই দিকে ইঙ্গিত দিয়ে ছিলেন এবং আহলে বায়াতের (আঃ) সাথে থাকার ও আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছিলেন।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔