গত ৩০ অক্টোবর শুক্রবার পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নাবি (স.) উপলক্ষে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে ঘটমান বিভিন্ন ইস্যুর উপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন হিজবুল্লাহ প্রধান সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ। তার বক্তব্যের চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হল:
শুরুতে তিনি মহানবি (স.) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মোবারকবাদ জানিয়ে বলেন: মহানবি (স.) এমন একটি জীবন্ত মুজিযার অধিকারী যা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে; তা হল পবিত্র কুরআন। মহান আল্লাহ্ যে কিতাবকে হজরত মুহাম্মাদ (স.) এর ক্বলবে অবতীর্ণ করেছেন। এ মহাগ্রন্থ বিকৃত করতে শত চেষ্টা চালানো হলেও কোন পরিবর্তন ছাড়াই নিখুঁতভাবেই তা অবশিষ্ট রয়েছে; স্বয়ং এটাও মুজিযা।
তিনি বলেন: আরব্য উপদ্বীপে মহাপরিবর্তন মহানবি (স.) এর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। মুসলমানদের নিকট মহানবি (স.) পবিত্র ও সম্মানের পাত্র। মুসলমানরা সকল নবি, আওলিয়া এবং সৎকর্মশীলদের প্রতি সম্মান করলেও তাদের নিকট মহানবি (স.) এর স্থান সবার উপরে।
মুসলমানরা মহানবি (স.) এর সুউচ্চ মর্যাদার প্রতি ঈমান রাখে এবং তাঁকে সবচেয়ে পূর্ণ, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সৃষ্টি জগতে মহান আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী বলে বিশ্বাস রাখে। আর তাই মুসলমানরা কখনই তাঁর (স.) উপর অবমাননাকে বরদাশত্ করবে না।
সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ বলেন: সৃষ্ট সমস্যার জন্য ফ্রান্স প্রশাসনই দায়ী। ফ্রান্স কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিপর্যয়ের ফলাফল অনুসন্ধানের পরিবর্তে এর নিরসনের পথ খুঁজে বের করা এবং মুসলমানদেরকে এ নিশ্চয়তা দেয়া যে, বাকস্বাধীনতার পক্ষে তাদের অবস্থানের দাবী একটি শক্তিশালী দাবী।
আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে, ফরাসী কর্মকর্তারা মহানবি (স.) এর প্রতি অবমাননার চেয়ে বহুগুণে কম গুরুত্বের ইস্যুতে বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আমরা দেখেছি, যারা হোলোকাস্টের বিষয়ে মুখ খুলেছে তাদেরকে কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।
ফ্রান্স এবং ইউরোপে বাক স্বাধীনতা সর্বক্ষেত্রে ও সর্বস্তরে প্রযোজ্য নয় বরং তারা নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিষয়াদি বিবেচনায় রেখে বাকস্বাধীনতার কথা বলে।
ইহুদি বিদ্বেষ ইস্যুতে বাকস্বাধীনতাকে কেন থামিয়ে দেয়া হল? এ প্রশ্ন তুলে, পশ্চিমা দেশগুলো বাকস্বাধীনতার অর্থের বিষয়টি পূনর্বিবেচনা করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি নীস শহরে হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনার সাথে ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পর্ক নেই। ইসলাম ধর্ম এ ধরনের হামলা ও এর মত অন্যান্য পদক্ষেপের -যা ইতিপূর্বে বা আগামিতে গৃহীত হয়েছে বা হবে- নিন্দা জানায় এবং এ ধরনের হামলা প্রত্যাখ্যাত।
এ ধরনের পদক্ষেপকে কোন ধর্ম বা ঐ ধর্মের অনুসারীদের ঘাড়ে চাপানোর অধিকার ফরাসী কর্তৃপক্ষ বা অন্য কারো নেই। এমনটি করলে তা হবে অন্যায়, অনৈতিক ও অবৈধ। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র জড়িত ব্যক্তিকেই দায়ী করা উচিত, তাই যদি তার উদ্দেশ্যে ধর্ম কেন্দ্রীকও হয়ে থাকে।
যদি কোন খ্রিষ্টান বা অন্য কেউ এমন পদক্ষেপ নেয়, সেটাকে কি খ্রিষ্টান ধর্মের উপর চাপানো বা নাউজু বিল্লাহ্ হজরত ঈসা (আ.) এর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়?!
আসমানী ধর্ম হিসেবে যদি কেউ ইসলাম ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাতে চায় তবে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘ইসলামি ফ্যাসিবাদে’র মত পরিভাষা ব্যবহার পরিহার করতে হবে। যদি কিছু সংখ্যক মুসলমান ইসলাম ধর্মকে আঘাত করে, তবে এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে অবমাননার অধিকার অন্যের জন্য বৈধ হয় না।
আকিদাগত পার্থক্যের কারণে হত্যাকে বৈধ মনে করা তাকফিরি সন্ত্রাসবাদ মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে সমর্থিত। পশ্চিমা বিশ্বের উচিত তাকফিরি গ্রুপগুলোর বিপরীতে তাদের কি কর্তব্য রয়েছে সেটা অন্বেষণ করা।
ইউরোপ ও আমেরিকার সরকারগুলো সিরিয়া ও ইরাকে তৎপর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সমর্থন এবং তাদেরকে আর্থিক সহায়তা করে থাকে। তাকফিরি গ্রুপগুলোর অপরাধজনিত কর্মকান্ডের সাথে মহানবি (স.) ও মুসলিম উম্মাহ’র কোন সম্পর্কে নেই। ইউরোপীয় ও মার্কিনীদের উচিত নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তাকফিরী সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের বিষয়টি পূনর্বিবেচনা করা। এদেরকে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, তা না হলে এ ভুলের মাশুল তাদেরকেই গুণতে হবে।
তিনি ফরাসী কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে বলেন: এই মুখোমুখি অবস্থান অব্যাহত রাখতে আপনাদের চেষ্টা স্বয়ং আপনাদেরই স্বার্থ বিরোধী। যদি ফ্রান্স চায় এ পরিস্থিতি অব্যাহত রাখতে তাহলে মুসলিম দেশসমূহে তাদের স্বার্থের কি হবে? বর্তমানে যা কিছু ঘটছে তার সমাধান ফরাসী কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের উপর নির্ভর করছে।
বিভিন্ন ধর্ম ও নবিগণ (আ.) এর প্রতি অবমাননার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন পাশ এবং এ কাজকে অপরাধ হিসেবে গন্য করা সংক্রান্ত যে প্রস্তাবনা শাইখুল আযহার উপস্থাপন করেছেন তা উল্লেখ করে নাসরুল্লাহ বলেন: শাইখুল আযহারের প্রস্তাবনাকে বাস্তব রূপ দান করে অবমাননা এবং উস্কানীমূলক পদক্ষেপের পথ রোধ করা সম্ভব।
ইয়েমেনের রাজধানী সানয়া’তে মহানবি (স.) এর জন্মদিনে কোটি মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন: কয়েক বছর ধরে অবৈধ আগ্রাসনের মুখে পড়ে দেশটি অবরোধের মুখে এবং তীব্র খাদ্য সংকট তৈরী হয়েছে, তা সত্ত্বেও মহানবি (স.) এর জন্মবার্ষিকীতে তারা রাস্তায় নেমে মহানবি (স.) এর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইয়েমেনিরা মহানবি (স.) এর প্রতি নিজেদের ভালবাসা প্রদর্শনে কোন বাহানা করে না। তারা ফিলিস্তিনী জাতির স্বপ্নকে সমর্থন করে। আর তাদের এ পদক্ষেপ, ফিলিস্তিন ইস্যুতে নিরব থাকা সকলের অজুহাতের সকল পথ রুদ্ধ করে দেয়।
শত বিপদের মাঝেও মহানবি (স.) এর পক্ষে ইয়েমেনের জনগণের এ অবস্থান কি অর্থবহ নয়? অসহায় এ মানুষগুলো ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে, অথচ তারা নিজেরাও আগ্রাসনের শিকার ও অবরুদ্ধ।####
সুত্রঃ আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা)
