কেন আল্লাহর পথে সেগুলো দান করা শ্রেয় বা উত্তম? উত্তর হচ্ছে- যদি আপনি নিজের জান ও মালকে আল্লাহর পথে দান নাও করেন, তবুও পরিশেষে একদিন এগুলো সবই আপনাকে হারাতে হবে, সেগুলো নিঃশেষ ও বিনাশ হয়ে যাবে। আপনি কী মানবেতিহাসে এমন কাউকে খুঁজে পাবেন যার জান ও মাল অক্ষত ও অটুট আছে? এ পৃথিবীর ইতিহাসে প্রত্যেক মানুষকেই একদিন মরতে হবে, তার ধন-সম্পদ হারাতে হবে (এটা পৃথিবীর চিরাচরিত নিয়ম)। কেউ মৃত্যুর আগেই তার ধন-সম্পদ হারাবে আবার কারও মৃত্যুর পর সেগুলো তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ঠিক এমনটি নয় কি? আপনি এমন কোন লোকের সন্ধান পাবেন না যে চিরস্থায়ীভাবে নিজের ধন-সম্পদকে ধরে রাখতে পেরেছে। যদি কেউ কোটি কোটি টাকার ধন-সম্পদের মালিকও হয়; সেগুলো হয় তার জীবন প্রবাহে ব্যয় হবে, নতুবা কোন জুয়ার আড্ডায় হাত ছাড়া করবে, নতুবা কোন লোকসানের শিকার হয়ে নিঃস্ব হবে কিংবা অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে যাবে অথবা অন্য কোন কারণে সেগুলো নিঃশেষ হয়ে যাবে। যদি কারও জীবদ্দশায় ধন-সম্পদ নিঃশেষ নাও হয়, তবুও তার মৃত্যুর পর সেগুলো তার হাত ছাড়া হয়ে অন্যের আয়ত্তাধীন হবে। এমনটি নয় কি? সুতরাং যদি আপনি স্বীয় জান ও মালকে আল্লাহর পথে ব্যয় না করেন, তবে পরিণতিতে তা (আপনার জান ও মাল) একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। কোন কিছুই আর আপনার আয়ত্তে থাকবে না। কিন্তু যদি আপনি এ পৃথিবীর কর্মযজ্ঞে, জীবন যুদ্ধে, ব্যবসা ক্ষেত্রে, লেনদেনের জগতে স্বীয় মূল্যবান পুঁজিকে যথাযথ স্থানে বিনিয়োগ করেন তথা আপনার জীবনকে আল্লাহর পথে বিসর্জন দেন কিংবা আপনার ধন-সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যয় করেন; তাহলে আল্লাহ তায়ালা সেগুলোর বিনিময়ে আপনাকে এমন প্রতিদান দিবেন যা কখনও নিঃশেষ হবে না। সেটা কি? তা হল শান্তিময় বেহেশত; যা হচ্ছে পারলৌকিক সওয়াব এবং তা চিরন্তন ও অফুরন্ত। এমতাবস্থায় এমন বিনিময় কি সত্যিই লাভজনক নয়? এ লেনদেন কি লাভজনক ও ব্যবসাসফল নয়? নিঃসন্দেহে এমন লেনদেন অত্যন্ত উপকারী ও লাভজনক।
আমি সব সময় বলে থাকি যে, যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে শাহাদত বরণ করেন তারা সত্যিই অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ভাল লেনদেনকারী। তারা এ বিষয়টি খুব ভালভাবেই জ্ঞাত যে, কী করছে তারা। শরীরে যে প্রাণটি রয়েছে তা একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই তারা এ নশ্বর প্রাণকে আল্লাহর পথে বিসর্জন দেয় এবং বিনিময়ে এমন কিছু অর্জন করে যা অতীব মূল্যবান ও অবিনশ্বর। বস্তুত তারা ক্ষয়িঞ্চু ও ক্রমান্বয়ে নিঃশেষিত কোন বস্তুর বিনিময়ে চিরস্থায়ী ও মহামূল্যবান কিছু গ্রহণ করে; যদি কেউ তা যথাযথ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। সুতরাং আপনি যা প্রত্যক্ষ করছেন যে, মানুষ ধারণা করছে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করে কিংবা প্রাণ বিসর্জন দিয়ে সে তার মূল্যবান সম্পদকে হাত ছাড়া করছে; তা হচ্ছে এক বাহ্যত দৃষ্টিভঙ্গি। এহেন ধ্যান-ধারণা নিতান্ত অগভীর ও বাস্তবতার সাথে তার কোন মিল নেই। বরং যদি সঠিক ও গভীর বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, আল্লাহর পথে কোন কিছু বিসর্জন দিলে তা কখনও নিঃশেষ ও বিনাশ হয় না; বরং এ দান অটুট ও অক্ষয় থাকে। প্রকারান্তে যদি তা (জান ও মাল) পার্থিব উপায়ে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয় তবে তা কখনও বহাল থাকবে না, বরং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিঃশেষ হবে। রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি ছাগল জবাই করেন। এ খবর মুসলমানদের নিকট পৌঁছে যায়। সে সময় মুসলমানদের মধ্যে অভাবী ও ক্ষুধার্তদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তারা খবর পেয়ে মহানবীর (সা.) বাড়ীতে উপস্থিত হয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, উপস্থিত সকলের মাঝে এক খণ্ড করে মাংশ বিতরণ করবেন। এভাবে একে একে সকলের মাঝে বিতরণের পর উক্ত ছাগলের শুধুমাত্র ঘাড়ের অংশটুকু অবশিষ্ট ছিল। মহানবীর (সা.) এক স্ত্রী এ অবস্থা দেখে বলেন: ইয়া রাসূলূল্লাহ (সা.)! ছাগলের সব অংশই বিতরণ হয়ে গেছে শুধু ঘাড়ের এ অংশটুকুই রয়ে গেছে। এ কথা শোনার পর তিনি বলেন: না, বরং (বিতরণকৃত) সব অংশই জমা হয়েছে। কেবল ঘাড়ের এ বাকী অংশটুকুই চলে যাবে। হ্যাঁ, এটাই বাস্তবতা যা কিছু আল্লাহর পথে দান করা হয়েছে সেগুলো গচ্ছিত ও সঞ্চিত হয়েছে এবং যে অংশটুকু নিজেরা ভক্ষণ করা হবে তা নিঃশেষ ও নিঃচিহ্ন হয়ে যাবে। আপনি যে ধন-সম্পদকে আল্লাহর পথে খরচ করবেন তা সঞ্চিত থাকবে, আপনি যে প্রাণকে আল্লাহর পথে বিসর্জন দিয়েছেন সেটা থেকে যাবে, আপনি যে সুস্থতা ও পুঁজি আল্লাহর পথে বিনিয়োগ করবেন সেগুলো আপনার জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এগুলো সবই আল্লাহর কোষাগারে গচ্ছিত থাকবে। পক্ষান্তরে, আপনি যা কিছু আল্লাহর পথে বিনিয়োগ করেন নি, সেগুলো সবই বৃথা ও বিনষ্ট হয়েছে। এ পার্থিব জীবনে আমরা কতইনা ভোগ-বিলাস, আহার ও নিদ্রার মাধ্যমে কাটিয়ে দিচ্ছি; এগুলো তো সবই নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তাই তো আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে,
“এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা তা জান (ও উপলব্ধি কর)!”
12
আগের পোস্ট
