১৮ জিলহজ্ব মুমিন ও মোনাফিকদের চিনিয়ে দিয়েছে

by Rashed Hossain

লেখকঃ সোনিয়া নাসরিন

আরবী ১৮ ই জিলহজ্ব ইসলামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ঈদে গাদীর নামে এ দিনটি পরিচিত । দশম হিজরির এ দিনে রাসুলে খোদা (সা:) যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন তারই আলোকে এ দিনটি উদযাপিত হয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে।
আল্লাহর রাসুল এটা জানতেন যে প্রত্যাদেশ বাণী বা আল্লাহপ্রদত্ত জীবন বিধান পূর্ণতা লাভ করার পর তিনি বেশিদিন ইহজগতে থাকবেন না। তাই নবম হিজরির পর থেকেই মূলতঃ তিনি এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছিলেন। ঐ সময় ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংশয় সৃষ্টির জন্য কাফের মুশরেকদের পক্ষ থেকেও জোর তৎপরতা শুরু হয়েছিল। তারা প্রচার করতো ইসলামের নবীর কোন পুত্র সন্তান নেই, কাজেই তার মৃত্যু হলে ইসলাম ধর্র্মের অস্তিত্বও আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে পড়বে।
এমন এক অবস্থায় মুসলমানদের মনে কিছুটা অস্বস্তি বিরাজ করছিল। সাহাবায়ে কেরাম এটা দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করতেন ইসলাম আল্লাহপ্রদত্ত একটি জীবন বিধান। এটা চিরস্থায়ী এবং পূর্ণাঙ্গ। পবিত্র কোরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্যে সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ এবং হযরত মুহাম্মদ (দঃ) হচ্ছেন সর্বশেষ নবী এবং রাসুল। কাজেই এই ধর্ম চিরকাল টিকে থাকবে। ইসলামের বিধান শাশ্বত, অমর ও অক্ষয়।
যতদিন এ জগত থাকবে ইসলামের দেদীপ্যমান দীপ্তি আলো বিকিরণ করে যাবে। এ আলো নিভিয়ে দেয়ার ক্ষমতা কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।
এই বিশ্বাসকে ধারণ করার পরও মুসলমানদের মনে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। আল্লাহর রাসুলের ইহলোক ত্যাগের সম্ভাবনায় একদিকে তাদের মনে ছিল বিরহজনিত অন্তর্দাহ। অন্যদিকে ইহুদী, খৃষ্টান ও পৌত্তলিকদের অব্যাহত চক্রান্তের কথা ভেবে তারা ইসলামের ভবিষ্যতের ব্যাপারেও নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন। সবার কাছে এই প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, প্রিয় নবীজী যখন এ জগতে থাকবেন না, তখন পবিত্র কোরআন কে ব্যাখ্যা করবেন? মুসলমানরাই বা জীবন জিজ্ঞাসার জবাব জানার জন্যে কার দ্বারস্থ হবেন?
ইতোমধ্যে হজ্বের সময় ঘনিয়ে এলো। রাসুলে খোদা (সা.) মুসলমানদেরকে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র হজ্ব পালন করলেন। এটাই ছিল আল্লাহর রাসুলের শেষ হজ্ব। বিদায় হজ্ব নামে যা আজও পরিচিত। হজ্বের সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নবীজী এবার লক্ষ মুসলমানদের কাফেলাকে সঙ্গে নিয়ে মাতৃভূমি মক্কাকে বিদায় জানালেন, চলছেন প্রিয় মদিনার পথে। আল্লাহর রাসূলকে খুবই চিন্তিত মনে হচ্ছিল, এটা বিশিষ্ট সকল সাহাবীই লক্ষ্য করলেন। সবার মনেই এক অজানা আশঙ্কা। এমন সময় কাফেলা গাদীরে খুম নামক এক স্থানে এসে পৌঁছায়। আল্লাহর রাসুল যখন এই স্থানে এসে পৌঁছলেন তখন হযরত জিব্রাইল (আ.) সুরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াত নিয়ে হাজির হলেন। বলা হলো- “হে রাসুল! তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা তুমি সবার কাছে পৌঁছে দাও, যদি তা না কর তাহলে তো তুমি তার বার্তা প্রচার করলে না।”
রাসুলে খোদা (সা.) আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর দায়িত্বের এই বোঝা থেকে মুক্ত হতে উদ্যোগী হলেন। তিনি সবাইকে সমবেত হতে বললেন। যারা কিছুটা এগিয়ে ছিলেন তারা পেছনে ফিরে তাকালেন। আর যারা পেছনে ছিলেন তারা খানিকটা এগিয়ে এলেন। রৌদ্রস্নাত উত্তপ্ত মরু হাওয়ায় সবাই ক্লান্ত অবসণ্ন। তারপরও সকলেই প্রবল মনোযোগ সহকারে অপেক্ষা করতে লাগলেন আল্লাহর রাসুল কিছু একটা বলবেন। মুসলমানদের জন্যে নতুন কোন বিধান বা দিক নির্দেশনা দেবেন।
আল্লাহর রাসুল উটের জিনকে মঞ্চের মত করে তাতে আরোহণ করলেন। এরপর সমবেত সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, হে মুসলমানগণ! অচিরেই আমার জীবনের অবসান ঘটবে, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এ জগত ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাকে। আমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আমি কি আমার উপর অর্পিত রেসালতের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছি? সকলেই সমস্বরে বলে উঠলো, হে নবী আপনি আপনার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং এ পথে আপনি অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন।
এরপর আল্লাহর রাসুল (সা.) চারদিকে তাকিয়ে আলীকে খুঁজে বের করলেন এবং হযরত আলীর দুই হাত উত্তোলন করে বললেন, মহান আল্লাহ হচ্ছে আমার অলী এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী। আমি হচ্ছি মুমিন বিশ্বাসীদের অলী ও অভিভাবক, আর আমি যার নেতা ও অভিভাবক, আলীও তার নেতা ও অভিভাবক। হে আল্লাহ! যে আলীকে বন্ধু মনে করে তুমি তাকে দয়া ও অনুগ্রহ করো, আর যে আলীর সাথে শত্রুতা করে, তুমিও তার প্রতি একই মনোভাব পোষণ করো।
রাসুলে খোদা (সা.) এর এই ভাষণের পরপরই হযরত জিব্রাইল (আঃ) আবার অহী বা প্রত্যাদেশ বাণী নিয়ে এলেন। বলা হলো, “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন বা জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সুরা মায়েদার ঃ ৩)
বিশ্বনবী (সা.) নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে হযরত আলীর (আ.) মাথায় নিজের হাতে তাঁর পবিত্র পাগড়ীটি পরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি গাদিরে খুমে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। এই তিন দিন ধরে শীর্ষস্থানীয় সব সাহাবিগণসহ সব মুসলিম নারী-পুরুষ পৃথক পৃথকভাবে হযরত আলীকে (আ.)আমিরুল মু’মিনিন হিসেবে অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন বলে নির্ভরযোগ্য সুন্নি সূত্রেও বর্ণনায় এসেছে।
তাই আমরা লক্ষ্য করি তাবুক অভিযানের সময় নবী করিম (দঃ) এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু নবীজী হযরত আলীকে মদিনায় থেকে যেতে বললেন। হযরত আলী এর কারণ জানতে চাইলে আল্লাহর রাসূল উত্তরে বলেছিলেন, তুমি কি চাও না মুসার স্থলে হারুন যেমন ছিল, তেমনি আমার স্থলেও হোক তোমার স্থান। যদিও আমার পরে আর কোন নবী বা রাসুল আসবে না।
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্মরণ করো যখন ইব্রাহীমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি ব্যাপারে পরীক্ষা করলেন এবং সেসব পরীক্ষায় সে পুরোপুরি উত্তীর্ণ হলো। এরপর আল্লাহ বলেছিলেন “আমি তোমাকে সব মানুষের (ইমাম) নেতার পদে অধিষ্ঠিত করবো।
ইবরাহীম আবেদন করেছিলেন, আর আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও (ইমাম বা নেতা করুন)।
আল্লাহ জবাব দিলেন, আমার এ অঙ্গীকার জালেমদের ব্যাপারে প্রযোজ্য হবে না (কেবলমাত্র তোমার যেসব বংশধর নিষ্পাপ ও পবিত্র থাকবে, তারাই এ পদের যোগ্য হিসেবে গণ্য হবে)।
হজরত মূসা(আ.) তাঁর ভাই হারুনকে নিজের সহযোগী হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য আল্লাহর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এরপর আল্লাহ তা কবুল করেন। সূরা ত্বাহার ৩৬ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ঃ আল্লাহ বললেন, হে মূসা! তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো।
সূরা সা’দের ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা, হজরত দাউদকে (আ.) উদ্দেশ্য করে বলেছেন, হে দাউদ! আমি অবশ্যই তোমাকে পৃথিবীতে সৃষ্টিকুলের প্রতিনিধি করেছি। সুতরাং মানুষের মধ্যে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে বিচার-মীমাংসা কর।
এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা এ কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনিই মানবজাতির নেতা ও ইমাম নির্ধারণ করেন। ইসলাম ধর্র্মে নেতৃত্ব ও ইমামত কেবল মানুষের দৈনন্দিন ও প্রচলিত জীবন ব্যবস্থার জন্য নয়। ইসলাম ধর্র্মে একজন ইমাম বা নেতা, বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রের নেতা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি (মুদ্দা যিল্লুহুল অলী) বলেছেন, ইসলাম ধর্র্মে একজন নেতা, জনগণ থেকে আলাদা নয়। গাদিরের ঘটনাকে তিনি জনগণের নেতৃত্ব ও নীতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হিসেবে গণ্য করেন।
রাসূলের(সা.) ওফাতের পর শান্ত মুসলিম সমাজ যাতে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্ধে জড়িয়ে না পড়ে এবং স্বার্থান্বেষীরা ওই শোকাবহ ঘটনাকে যাতে অপব্যবহার করতে না পারে সেজন্য রাসূলকে (সা.) এ দায়িত্ব দেয়া হয় যে, তিনি যাতে তাঁর পরবর্তী নেতার নাম ঘোষণা করেন। রাসূলে খোদা বিদায় হজ্বের পর এক সমাবেশে আলীকে (আ.) তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করেন। তিনি আলীর (আ.) যোগ্যতা বর্ণনা করতে যেয়ে বলেন,
হে জনগণ, এমন কোনো জ্ঞান নেই, যা আল্লাহ আমাকে দেননি এবং আমিও পরহেজগারদের নেতা আলী (আ.)-কে সেই জ্ঞান শিখিয়েছি। আপনারা কেউই আলী (আ.)-র পথ থেকে বিচ্যুত হবেন না। তাঁর পথ থেকে দূরে সরে যাবেন না। তাঁর নেতৃত্বকে অমান্য করবেন না। কারণ সে সবাইকে সত্যের পথে পরিচালিত করে এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে কাজ করে। সে অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটায় এবং নিজে অন্যায় থেকে দূরে থাকে। আলী (আ.) আল্লাহর পথে চলার ক্ষেত্রে কোনো কিছুকেই ভয় করে না।
হে মুসলমানগণ, আলী (আ.) হচ্ছে আমার ভাই, স্থলাভিষিক্ত ও আমার শিক্ষায় শিক্ষিত। সে আমার উম্মতের নেতা-কোরআনের তাফসির যার জানা। সে কুরআনের দিকে আহ্বানকারী এবং কুরআনের নির্দেশ বাস্তবায়নকারী। সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে। সে আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। সে আল্লাহ বিরোধীদের শত্রু এবং আল্লাহপ্রেমীদের বন্ধু। সে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে জনগণকে বিরত রাখে।
রাসুলে খোদা ( সা.) এর অসংখ্য উক্তি বা বক্তব্যের আলোকে মুসলমানদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করেন, মহানবী (সা.) এর পর মুসলমানদের নেতৃত্ব বা পবিত্র কোরআনের যথার্থ ব্যাখ্যার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছিল হযরত আলীর উপর। তিনি মুসলমানদের ইমাম হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন, আর এই দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে অর্পিত হয়েছিল গাদিরে খুমের ঐতিহাসিক স্থানে।
অগণিত নক্ষত্রের একজন হয়েও সন্ধ্যা তারা যেমন সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল, হযরত আলী তেমনি বিশ্বনবীর নৈকট্য মহিমায় ইমামতের দীপ্তিতে উজ্জ্বল। দিবসের দীপ্ত রবি অস্তমিত হওয়ার পর ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে প্রশান্তির বাণী নিয়ে যেমনিভাবে গগণ কোণে সন্ধ্যা তারার উদয় হয়। বিশ্বনবীর অন্তর্ধানের পর আলোকবর্তিকা হিসেবে দিগভ্রান্ত ইসলামের গগণ কোণে দেখা দিলেন হযরত আলী।
হযরত আলী সম্পর্কে নবী করিম (দঃ) বলেছেন, আলী প্রেম মানুষের পাপ এমনভাবে ধ্বংস করে যেমনি আগুন জ্বালানী কাঠ ধ্বংস করে দেয়।
একবার হযরত আলীকে দেখে আল্লাহর রাসুল বলেছিলেন, তিনটি এমন বৈশিষ্ট্য তোমার রয়েছে যেটা আমারও নেই, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তুমি এমন একজনকে শ্বশুর হিসেবে পেয়েছো, যা আমি পাইনি, এমন একজনকে তুমি স্ত্রী হিসেবে পেয়েছো, যে কিনা আমার কন্যা, আর তৃতীয়টি হচ্ছে তুমি হাসান-হোসাইনের মত সন্তানের পিতা যেটা আমার নেই।
এখন আপনি নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন, রাসুল (সা.) এর ওফাতের পর সেই যুগের ব্যক্তিবর্গ নিজের স্বার্থের জন্য হযরত আলী (আ.)’র গাদিরের সেই ঘোষণার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল তারা আসলে কে? তাদেরকে আমরা কি বলবো? তারা জানে না ইতিহাস কখনও মাটির তলে চাপা থাকে না। একদিন না একদিন বিবেকের সামনে ভেসে উঠবে।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔