তাবলীগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রথাসমূহ কি প্রতিবন্ধক?

by Rashed Hossain

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা সাইয়েদ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী, অধ্যক্ষ, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।

শিয়া মযহাব তার নিজস্ব একটি পরিচিতি বহন করে। রাসুল (সা.) এর যুগ থেকেই ক্রমশর সজীবতা ও বিস্তার লাভকারী ইসলাম ধর্ম মোহাম্মাদী ইসলাম নামে প্রতিষ্ঠিত সার উসূল (মূলনীতি সমূহ) ও ফরু (শাখাগত বিষয়সমূহ) ভাষা ও জাতীয়তা পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয় না।

কিন্তু ধর্মে এমন কিছু বিষয় থাকে যেগুলোকে ধর্মের প্রথা বা রীতি বলা যায়, ভাষা ও জাতীয়তা পরিবর্তনের সাথে এগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। ধরণ পাল্টাতে পারে কিন্তু রূহ বা চেতনা এবং নৈতিক দৃষ্টি ভঙ্গীর এক হওয়া জরুরী। যদি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী ও চেতনার পরিবর্তন হয় তাহলে ধর্ম কখনো তা গ্রহণ করেনা। আযাদারীর বয়স বা রীতি-নীতিগুলো স্বয়ং ধর্মের শাখা প্রশাখাগত বিষয়ের অর্ন্তগত। কিন্তু এর চেতনা বা রূহ মৌলিক নীতির সাথে সম্পর্কযুক্ত, যে রূহ অর্থাৎ ভালবাসা (মোয়াদ্দাত) হচ্ছে উসূলে দ্বীন। (ইনকুন্তুম তো হেব্বুনাল্লাহ ফাত্তাবেউনী)। এ ভালবাসা যা স্মপর্কে ঈমানের সাথে উসূলেরই অংশবিশেষ এবং অনুসরণ বা অনুগত্য হচ্ছে ফুরূয়ে দ্বীন। দ্বীনের ফুরূয়াত বা শাখা প্রশাখা সমূহ ওয়াজিব, মুসতাহাব, হারাম, মাকরূহ ও মোবাহ এর অর্ন্তভূক্ত। ‘ওয়াজিব’ এমন ধর্মকে বলা হয় যা সম্পাদন করবেনা সে গোনাহের ভাগীদার হবে এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
‘মাকরূহ’ সে সব ধর্মকার্য যা না করা উত্তম এবং সওয়াব যোগ্য কিন্তু করলে গোনাহ বা শাস্তি নেই।‘মাবাহ’ যে কর্ম সম্পাদন করার বৈধতা ও অনুমতি দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়টিও স্বীকৃত যে, শরীয়ত যে তালিকা তৈরী করেছে তা ওয়াজিব, মুস্তাহাব, হারাম ও মাকরূহ’র অন্তর্ভুক্ত এবং এ তরিকার বহির্ভূত অপরাপর বিষয়সমূহ সবগুলোই ‘মোবাহ’ এবং বৈধ। কিন্তু এ বিষয়টিও প্রণিবান যোগ্য যে ‘জায়েজ’ এবং ‘মোবাহ’এ শব্দগুলোও শরীয়তকর্তৃক প্রদানকৃত।

‘আযাদারী’ মোয়াদ্দাত বা ভালবাসার সাথে সংযুক্ত এবং মোয়াদ্দাত হচ্ছে ওয়াজিব। এখন প্রকৃত ভালবাসা প্রকাশার্থে যদি আযাদারীর ধরণ ও রীতি পাল্টে যায় এবং তা যদি মোবাহের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে কোন অপরাধ নয়। আযাদারীতে এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলো বিশ্বে বসবাসকারী সকল শিয়াদের মধ্যে অভিন্ন এবং স্বীকৃত; যেমন: ক্রন্দন ও মাতম। বিশ্বের সকল শিয়াদের মধ্যে তা পরিলক্ষিত হয় চাই সে বাঙালী হোক, ভারতীয় হোক অথবা ইরানী বা আরবী! অভিযাত আলেম সমাজ হোক অথবা মুজতাহিদ। ভাষাগত অথবা জাতিগত পরির্বতনের কারণে আযাদারীতে কোন পরিবর্তন এসেও যায় এবং তা যদি মোবাহ হয় তাহলে আলেম সমাজ হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকেন যতক্ষনপর্যন্ত তা শরিয়ত পরিপন্থি অথবা ক্ষতিকারক না হয়। সুতরাং “লা যারারা ওয়া লা যারারা ফিল ইসলাম” এই নীতি অনুযায়ী মুজতাহিদ গণের হস্তক্ষেপ অথবা এমন কোন কর্ম যা মাযহাবের জন্য অবমাননাকর হয় সেখানে মুজতাহিদগণের ফতোয়া অথবা অপব্যয়ের বিষয় অনিবার্য হলে আলেমগণ হস্তক্ষেপ করেন। এছাড়া বাহ্যতঃ হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ নেই।

এখন যদি ইরানে হযরত আব্বাস (আ.) এর পতাকা (আলম) ভিন্ন ধরণের হয় কিম্বা পাকিস্তান বা ভারতের অন্য ধরণের হয় সে ক্ষেত্রে আযাদারীর রূহ বা চেতনায় কোন রকম প্রভাব পড়ে না। আর না-ই এক্ষেত্রে কোন বিতর্কের সুযোগ আছে। আলম বা পতাকার পার্থক্য দেখে এ কথা কেউ বলতে পারে না যে, ইরানের মাযহাব আলাদা এবং অন্য দেশসমূহের মাযহাব আলাদা। যদি উসলে দিন এবং ফুরুয়ে দিন এক হয় এবং আযাদারীর চেতনা অবশিষ্ট থাকে তাহলে রসম বা প্রথাগত পার্থক্যের কারণে জাতীগত পরিচয়ে পার্থক্য হতে পারে কিন্তু মাযহাবের পরিচয় বা সনাক্ত করণে কোন পার্থক্য সৃষ্টি হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হল যে, কিছু অজ্ঞ ব্যক্তি আযাদারির সাথে সম্পৃক্ত তাবারকসমূহকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। কখনো তারা বলেন যে, মাতম তাবলিগী কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, সুতরাং মাতম করা যাবেনা। আলম বা পতাকার কারণে তাবলিগী কাজে অসুবিধা হচ্ছে তাই এটা করা যাবেনা। অথবা “আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ” এ দরূদ বলা যাবে না তদ্বস্থলে দরূদে ইব্রাহীমী পড়তে হবে যাতে তাবলিগী কাজ সহজতর হয়।

আযানে “আলীয়্যুন ওয়ালিওল্লাহ” এই বাক্যটি বলা যাবেনা। এতে তাবলিগী কাজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যারা এ কথাগুলো বলছেন তারা কেন চিন্তা করেননা যে, ধরুণ এ কথা বলে যে এগুলো মোবাহ কর্ম তাই এই গুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ তাহলে অন্য মাযহাবের মানুষ বলবে যে, ধীরে ধীরে তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারছে; তাহলে এটা কি তাবলিগের জন্য ক্ষতিকারক নয়? দ্বিতীয়ত: সকল শিয়া একদিকে আর উক্ত মুবাল্লিগ বা আলেমের কথা মেনে নিয়ে যদি মাতম ইত্যাদি বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে অন্য একটি দলের কি সৃষ্টি হবে না? ঐ ব্যক্তির কথা যদি বাংলাদেশের কিছু লোক মেনেও নেয় তাহলে কি বিশ্বের ত্রিশ কোটি শিয়ারাও কি তা মেনে নেবে? মাযহাবের ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে তা কি উপযোগী হবে? আল্লাহর ওয়াস্তে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে অথবা অন্য কোন চক্রান্তের শিকারে পরিণত হয়ে এমনটি করবেন না। যদি কেউ এমন কিছু করার চেষ্টা করেন তাহলে এর মোকাবিলায় সমগ্র জাতিকে শীশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে যাতে কেউ মাযহাবের ক্ষতিসাধন করতে না পারে।

আমিও যখন তাবলিগী কাজের সূচনা করি তখন মসজিদ ও ইমামবাড়ী অন্য মাযহাবের অনুসারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের দাওয়াত দিলে অনেকেই বলেছিলেন যে, জনাব, আপনার কথা সঠিক এবং যুক্তিপূর্ণ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আপনি নিজেকে শিযঅ মুসলমান দাবী করছেন। যদি শিয়া বলা ছেড়ে দেন তাহলে তাবলিগী কাজ সহজতর হয় এবং আপনার প্রতিষ্ঠানে আমাদের যাওয়া আসার কোন সমস্যার সৃষ্টি হয না। তখন আমি তাঁদেরকে প্রশ্ন করলাম তাহলে নিজের পরিচয় কি দেব?তাঁরা কোন জবাব দিলেন না। তখন আমি বললাম যে, নিজেকে শিয়া বলে দিন। শিয়অ পরিচয় দিলে আমি গর্ব অনুভব করি। এতে স্পষ্ট হয় যে, মোয়াবিয়া ও এজিদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক ইে হারুরুর রশীদ ও মামুনুর রশীদের সাথে। আমার সম্পর্ক ইমাম আলী (আ.) ও ইমামহোসাইন (আ.) এর সাথে। যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী তা হলো শিয়াদের বিরুদ্ধে যে ভাবে মিথ্যা প্রচার প্রপাগন্ডা চালানো হয় যার কারণে শিয়া বলতেই একটা ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়। এই ভ্রান্ত ধারণা অপনোদনের চেষ্টা করা আমাদের উচিৎ, নাকি নিজেকে শিয়া না বরা? ‘মাতম না করা’ বা ‘আলম বের না করা’ এ কথাগুলো না বলে বরং শিয়অদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জোরালো ও স্পষ্ট জবাব দেযা উচিৎ।

যেমন, শিয়ারা আলী (আ.) কে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর চাইতে শ্রেষ্ঠ মনে করেন-এমন কথা যারা বলেন তাদেরকে বলুন যে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা অপবাদ। একজন ধার্মিক ব্যক্তি কখনও মিথ্যা বলে না। কেন একটি জাতিকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অভিযুক্ত করছো?

  • শিয়ারা বলে জিব্রাঈল (আ.) ভূলকরে আলী (আ.) এর পরিবর্তে মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর ওহী নাযিল করেছিলেন এটি মিথ্যা অপবাদ।
  • শিয়াদের কুরআন চল্লিশ পারা বিশিষ্ট-এটি মিথ্যা অপবাদ। শিয়াদের প্রচলিত কুরআনের উপর ঈমান নেই-আমি বলি মিথ্যা।
  • শিয়া মাযহাব আব্দুল্লাহ ইবনে সা’বা নামের এক ইহুদী ব্যক্তি কর্তৃক সৃষ্ট এটি নির্লজ্জ মিথ্যা কথা। এ নামের কোন ব্যক্তির সন্ধান ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদের মাধ্যমে ‘শিয়া’ শব্দকে একটি অশ্রাব্য গালিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সুতরাং শিয়া হওয়ায় আমি গর্ব অনুভব করি। গর্ব করে আমাদের বলা উচিৎ, আমরা শিয়া। তাই ইমাম খোমেনী (রহ) গর্ব করে বলেছিলেন… ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য এবং জরুরী বরং ওয়াজিব কর্মসমূহের অন্তর্গত। যার অর্থ হলো শিয়া শিয়া এবং সুন্নী সুন্নীই থেকে শত্রুদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে উচ্চ কন্ঠে বলুন আমরা মুসলমান। কিন্তু নিজ নিজ ফেকহী পরিচয় স্ব-স্বস্থানে কায়েম থাকবো।

দলিল ভিত্তিক আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে। যে দলিল গ্রহণযোগ্য হবে তা মানা যাবে এবং এর পাশাপাশি আমরা ইমামের (আ.) আগমনের অপেক্ষায় থাকি। তাঁর আগমনে ফেকাহগত পার্থক্য ও বিরোধের সমাপ্ত ঘটবে।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔