ইসলামি জীবনদর্শনে আখলাক বা সচ্চরিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল দিক হলো ‘পরোপকার’ বা অন্যের কল্যাণে কাজ করা। আরবিতে একে ‘এহসান’ বা ‘খিদমতে খালক’ বলা হয়। এটি কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি ঈমানের অপরিহার্য দাবি এবং মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম মাধ্যম। একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই কেবল নিজের সুখ-শান্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে না; বরং তার হৃদয়ে সর্বদা অন্যের কষ্ট দূর করার আকুলতা থাকে।
পরোপকার কী? পরোপকার মানে হলো নিজের সাধ্যমতো অন্যের উপকার করা, তা সে আর্থিক সাহায্য হোক, শারীরিক শ্রম হোক, সদুপদেশ হোক বা কেবল একটি মুচকি হাসি। ইসলামের দৃষ্টিতে, সৃষ্টির সেবা করার মাধ্যমেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে পরোপকার পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার পরোপকার ও দানের গুরুত্ব মহিমান্বিত করেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, “তোমরা সৎকর্ম ও খোদভীতিতে একে অন্যের সাহায্য করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করো না।” (সূরা মায়িদা: ২)। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত পরোপকারীদের নিকটবর্তী।” (সূরা আরাফ: ৫৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন পরোপকারের মূর্ত প্রতীক। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ ততোক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতোক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে লিপ্ত থাকে।” অন্য এক হাদিসে এসেছে, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর।”
পরোপকারের বিভিন্ন রূপ ১. আর্থিক সহায়তা: অভাবগ্রস্তকে দান করা, ঋণগ্রস্তকে সাহায্য করা বা এতিম-বিধবাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া।
২. শারীরিক শ্রম: বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিকে রাস্তা পার করে দেওয়া, কারো ভারী বোঝা বহনে সাহায্য করা বা সামাজিক উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা।
৩. জ্ঞান ও সদুপদেশ: কাউকে সঠিক পথ দেখানো, ভালো কাজের পরামর্শ দেওয়া বা পড়াশোনায় সাহায্য করা।
৪. মানসিক সান্ত্বনা: শোকার্ত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার মনোবল বৃদ্ধি করা।
পরোপকারের সুফল
-
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত: পরোপকারের মাধ্যমে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়।
-
অন্তরের প্রশান্তি: অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে নিজের অন্তরে এক অদ্ভূত তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হয়।
-
সামাজিক সংহতি: পরোপকারের ফলে সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।
-
পরকালীন মুক্তি: পরকালে বিচার দিবসে পরোপকার এবং সৃষ্টির সেবার আমল মিজানের পাল্লায় ভারী হবে।
পরিশেষে বলা যায়, পরোপকার ও সহমর্মিতা হলো একটি জীবন্ত ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। আসুন, আমরা আমাদের সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করে স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠি। আমাদের চারপাশে যারা অভাবী, অসুস্থ বা কষ্টে আছে, তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। মনে রাখবেন, ক্ষুদ্রতম একটি পরোপকারও আল্লাহর কাছে মহান হতে পারে এবং এটিই আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার পথ সুগম করতে পারে।
