হযরত আলী (আ.): কেবল একজন বীর যোদ্ধাই নন, একজন দার্শনিকও

মল্লিক শিহাব ইকবাল

by Syed Yesin Mehedi

প্রতি বছর রমজানের ২১ তারিখ সেই মহান ব্যক্তির শাহাদাতবার্ষিকী হিসেবে পালিত হয়, যাঁর সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, “তুমি দুনিয়া ও আখিরাতে আমার ভাই।” আমি ইসলামী বিশ্বের (হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পর) সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব হযরত আলী ইবনে আবিতালিব (আ.)-এর কথা বলছি। হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে মুসলিম ও অমুসলিম উভয় বিদ্বানদের অসংখ্য রচনা রয়েছে। তবুও আমরা যখন হযরত আলী (আ.)-এর নাম শুনি, তখন প্রথমেই আমাদের মনে আসে খায়বারের যুদ্ধ এবং সেখানে তাঁর অতুলনীয় বীরত্ব, যার মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের বিজয় এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু হযরত আলী (আ.)-এর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বকে কেবল একজন যোদ্ধা হিসেবে সীমাবদ্ধ করা নিঃসন্দেহে তাঁর মর্যাদাকে খাটো করা।
আমরা সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর বীরত্বগাঁথা জানি, কিন্তু খুব কম মানুষই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে অবগত। তিনি শুধু একজন যোদ্ধাই নন, একজন দার্শনিকও ছিলেন। তদুপরি, তিনি ছিলেন উচ্চমানের একজন ফকিহ (ইসলামী আইনজ্ঞ) এবং গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, হযরত আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের প্রকৃত প্রতিনিধি ছিলেন। মহানবী (সা.) একবার বলেছিলেন, “আমি জ্ঞানের নগরী এবং আলী (আ.) তার দ্বার।”
২১শ শতাব্দীতে আমরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেখতে পাই, যেগুলো মূলত অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য গঠিত। মুসলিম বিশ্ব আজ গণতান্ত্রিক সংকট ও উগ্রবাদের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আইএসআইএস (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এ্যাণ্ড সিরিয়া) এবং আল-কায়েদার মতো চরমপন্থী সংগঠনগুলো শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে অরাজকতা পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এসব সমস্যার সমাধান হযরত আলী (আ.)-এর রাজনৈতিক জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার মধ্যেই নিহিত। চরমপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই শুরু। হযরত আলী (আ.) তাঁর সময়ের একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী খারিজিদের বিরুদ্ধেও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
খারিজিরা তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। আজ মুসলিম বিশ্বে আইএসআইএস ও আল-কায়েদার মতো সংগঠনের মাধ্যমে যে উগ্র প্রবণতা আমরা দেখি, তার বীজ প্রথম বপন করেছিল খারিজিরাই। তিনি যেভাবে খারিজিদের মতো উগ্রপন্থীদের মোকাবিলা করেছিলেন, তা বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের জন্য শিক্ষণীয়। হযরত আলী (আ.) বলেছিলেন, “তোমরা যেখানে খুশি বাস করতে পারো এবং যে মতবাদ ইচ্ছা অনুসরণ করতে পারো; কিন্তু নিরোপরাধ মানুষের প্রাণ নেওয়ার অধিকার আমি তোমাদের দেব না।”
হযরত আলী (আ.) অভিজানকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে জনগণমুখী শাসনব্যবস্থার দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। নাহজুল বালাগায় মিশরের নবনিযুক্ত গভর্ণর মালিক আসতার-এর উদ্দেশ্যে তাঁর একটি বিখ্যাত পত্র রয়েছে। সেই পত্রে তিনি গভর্ণরকে প্রদেশে জনগণকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেন।
সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান একবার বলেছিলেন, “খলিফা আলী (আ.) মানব ইতিহাসে (নবী (সা.)-এরপর) সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে বিবেচিত। তাই আমরা আরব দেশগুলোকে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইমাম আলী (আ.)-কে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছিলাম।” ইসলাম সম্পর্কে যখন উগ্র ও চরমপন্থী ব্যাখ্যা সামনে আসে, তখন একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য হযরত আলী (আ.)-এর রাজনৈতিক ইসলামের ধারণা তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
মুসলিম বিশ্বে হযরত আলী (আ.)-এর প্রজ্ঞা নিয়ে নানা চিত্তাকর্ষক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু আলী ইবনে আবিতালিব (আ.)-এর মহত্ত্বের গল্পগুলো তখনই অর্থবহ হবে, যখন আমরা সেগুলো আমাদের সময়ের সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজে লাগাতে পারব। সুতরাং সময়ের দাবি হলো, তাঁর মুগ্ধকর প্রজ্ঞার গল্প কেবল প্রশংসা না করে, তাঁর চিন্তাধারাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔