মূল : আয়াতুল্লাহ মাকারেম সিরাজী, অনুবাদ : হারুন আর রশীদ
নবী করিম (সাঃ) বলেন, “মরিয়াম ছিলেন কেবলমাত্র তার সময়ের জন্য এক অনুকরণীয় নারী আর আমার মেয়ে ফাতিমা পৃথিবীর প্রথম থেকে শেষ নারীর মধ্যে সেরা এবং সকল যুগের জন্য অনুকরণীয় এক মহিয়ষী”।
সমগ্র ইতিহাসে নারীদের আছে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। পুরুষের সাথে সাদৃশ্য বিবেচনায় তাদের যে শারীরিক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় সে কারণে এবং সেই সুযোগে সমগ্র ইতিহাস জুড়েই অত্যাচারী এবং স্বৈরাচারীদের নারীর মানবিক সত্তাকে মাড়িয়ে চলার ঘৃণ্যকর প্রচেষ্টা প্রতীয়মান। কোন্ অপরাধ তারা করেছিল বিশেষত আরব সমাজে অজ্ঞতার এবং জাহেলি যুগে? প্রকৃত পক্ষে সমগ্র পৃথিবী যখন নিমজ্জিত ছিল অজ্ঞতার অন্ধকারে যখন নারীর ব্যক্তিসত্তা সবত্রই ছিল নিস্পেষিত এবং তা এই পরিমাণে যে নারীকে গণ্য করা হত ব্যবহার্য পণ্যের মতো। তাদের কোন উত্তরাধীকার ছিলো না। কন্যা সন্তানের জন্মকে তারা গণ্য করতো এক কলঙ্ক হিসেবে জীবন্ত কন্যাকে তারা দিতো কবর এমনকি প্রকৃতির বিধানকে তারা অস্বীকার করত এই বলে যে মেয়ে সন্তানগুলো আমাদের নয়,কেবলমাত্র পুরুষ সন্তানগুলোই আমাদের।
“সেখানে তখন এরূপ কবিতা ছিলোঃ
আমাদের পুরুষ সন্তান সে আমাদের
আমাদের মেয়ে সন্তান সে অপরিচিতের”।
কিন্তু ইসলাম এসেছিল এইসব জঘন্য দৃষ্টিভঙ্গি নির্মূল করে মানুষের মাঝে মানবীয় ও স্বর্গীয় মূল্যবোধ পূণরুজ্জীবিত করতে; মানুষের তথাকথিত ঐ সব অন্ধকার, অজ্ঞতা, অবিশ্বাস ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পৈশাচিকতার সাথে ইসলামের প্রতি পদে পদে বাধল সংঘর্ষ, এবং শেষ পর্যন্ত ইসলাম বিজয়ী হল আর পূণরুদ্ধার করল নারীর হারানো মর্যাদা।
ইসলাম এই কাজ করেছিল সাংস্কৃতিক জ্ঞানসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণ এবং শিক্ষা প্রচারের মাধ্যমে নারী অধিকার আইন তৈরী করে, তাদের বৃদ্ধি বিকাশ কৃতিত্বের মর্যাদা সুযোগ সুবিধা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ও জাগতিক সকল প্রকার কাজে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং চূড়ান্তপর্যায়ে যারা এই সব কর্মের বিরোধিতা করত বা নারীর অধিকারকে অস্বীকার করত তাদের জন্য শাস্তির বিধান ও শাস্তি নিশ্চিত করে।
জাফর বিন আবু তালিবের স্ত্রী আসমা বিনতে ওমায়স তার স্বামীকে নিয়ে হাবসা থেকে প্রত্যবর্তন করলেন এবং নবী করিম (সাঃ) এর স্ত্রীদের দেখতে আসলেন। তিনি প্রথম একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন,নারীদের বিষয়ে কোরআনে কোন আয়াত নাজিল হয়েছে কি?
নবী করিম (সাঃ) এর স্ত্রীগণ বললেন,আমাদের এ বিষয়ে কোন কিছু জানা নেই।
আসমা নবী করিম (সাঃ)কে দেখতে আসলেন এবং প্রশ্ন করলেন,“হে আল্লাহর নবী,নারীরা কি ক্ষতি ও হয়রানীতে আবদ্ধ?”হতে পারে তার এ রকম বলার অধিকার ছিল এ কারণে যে,কোরআন নাজিলের শুরু থেকে বহু বছর পর্যন্ত তিনি দেশের বাহিরে ছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে সেই সব জঘন্য প্রথা এখনও সমাজে প্রচলিত আছে।
নবী করিম (সাঃ) বললেন, কেন?
আসমা বললেন, “কারণ ইসলাম এবং কোরআনে পুরুষের জন্য যেমন সুসংবাদ আছে নারীর জন্য তেমন কোন সুসংবাদ আছে কি?”
যদিও এটা ছিলো হিজরতের পঞ্চম বছর এবং ইসলামের উত্থানের আঠারো বছর পর যখন নারীর ব্যক্তিসত্ত্বা এবং নারীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের অনেক বিষয় পবিত্র কোরআনে ও হাদিসে নির্দেশিত হয়ে ছিল এবং অধিক গুরুত্বে আজহাব অধ্যায়ের আয়াতঃ৩৫ নাজিল হয়েছিল। এটা বাস্তবে এমন একটা আয়াত যা সকল মূল্যবোধ,সকল মূল্যবোধের সবকিছুকে নারী ও পুরুষের জন্য সমান ও একইভাবে নির্ধারিত করে এবং যার মধ্যে নারীদের জন্য আছে অগ্রগামী পদক্ষেপ।
এই আয়াতে ঘোষণা দেয়া হয়ঃ নিশ্চিতভাবে সকল আত্মসমর্পন পুরুষ এবং সকল আত্মসমর্পনকারী নারী, সকল মুমিন পুরুষ ও সকল মুমিন নারী এবং সকল অনুগত পুরুষ ও সকল অনুগত নারী এবং সকল সত্যবাদী পুরুষ ও সকল সত্যবাদী নারী এবং সকল ধৈর্য্যশীল পুরুষ ও সকল ধৈর্যশীল নারী এবং সকল বিনম্র পুরুষ ও সকল বিনম্র নারী,এবং সকল দানশীল পুরুষ ও সকল দানশীল নারী,এবং সকল সিয়াম পালনকারী পুরুষ ও সকল সিয়াম পালনকারী নারী, এবং সকল পুরুষ যারা নিজেকে সংযত রাখে ও সকল নারী যারা নিজেকে সংযত রাখে, এবং সকল পুরুষ যারা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে ও সকল নারী যারা আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করে, আল্লাহ তাদের জন্য রেখেছেন ক্ষমা ও পুরষ্কার।
এভাবে ইসলাম ঘোষণা দেয়, এ বিষয়ে যে সকল মানবীয় মূল্যবোধ এবং স্রষ্টার দিকে নর-নারী যাত্রা পাশাপাশি ও সহ অবস্থানে এবং তারা উভয়ই এ ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করবে।
অনেকে বিস্মিত হন তার নিজের সন্তানকে দুধ দান করার জন্য কিভাবে ইসলাম তার বেতনের অধিকার দিয়েছেঃ
তাহলে,যদি তারা তোমার জন্য দুধ স্তন্য দান করে তাদেরকে পারিতোষিক ও পুরষ্কার দাও।
কোন নারী তার সন্তানের দুধ দানের জন্য পারিশ্রমিক দাবী করবেন, বিশেষত সে যখন তার স্বামীর সাথে একত্রে বাস করেন। কিন্তু এ কথা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে ইসলাম এই আদেশ দিয়েছে একজন নারীর সকল প্রকার মানবিক অধিকারই নয়, তার আছে তার সম্পত্তির ব্যাপারে সকল প্রকার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার এবং পুরুষের কোন অধিকার নেই তার সম্মতি ব্যতিত তার কোন অধিকার ভোগ করা। শুধু তাই নয় সে যদি ইচ্ছা করে সে তার সন্তানের দুধদানের জন্যও পারিশ্রমিক দাবী করতে পারে। এ পরিবেশে যখন নারীর কোন অধিকার ছিলো না তখন এই আদেশ কতই না গভীর প্রভাব রেখেছিল?
সংক্ষেপে বলা যায়, পৃথিবীর সমস্ত নারীদের ইসলামের কাছে কিছু কর্তব্য বাধ্যবাধকতা আছে। কারণ ইসলাম তাদের নির্যাতনকারীদের থাবা থেকে মুক্ত করেছে এবং তা এই শর্তে যে, ইসলামের নির্দেশনা ও অনুশাসন সম্পূর্ণরূপে মেনে চলা হচ্ছে।###
