মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ও বর্তমান বিশ্বের
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ইরানের ভূমিকা শীর্ষক
গোল টেবিল বৈঠক
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি, ভূ-কৌশলগত পরিবর্তন এবং মুসলিম উম্মাহর নানামূখী সংকটে এক ক্রান্তিলগ্নে এসে পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতির গুরুত্ব আজ অপরিসীম। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত, বিভাজনমূলক নীতি এবং ইসলামবিদ্বেষী শক্তির আগ্রাসনের মুখে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই আজ ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং শনিবার সকাল ১১ টায় আল-কাউসার মিলনায়তনে আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানীর উদ্যোগে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি গোল টেবিল বৈঠক-“মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ও বর্তমান বিশ্বের সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ইরানের ভূমিকা” শীর্ষক সভায় খুলনা জেলায় বিশিষ্ট আইনজীবি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মুসলিম ঐক্যের অন্তরায় ও উত্তরনের পথ খোঁজার পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বমঞ্চে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ভূমিকা ও অবদান নিয়ে এখানে গভীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আশা করা হচ্ছে এই গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রস্তাবনা এবং প্রশ্ন-উত্তরপর্ব মুসলিম উম্মাহর (শিয়া-সুন্নি) মধ্যে পারস্পরিক সেতুবন্ধন রচনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সরকারী জিপিপি এ্যাড. জাকির হোসেন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
প্রথমে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের শেষে দোয়া-এ-ইমামে জামান (আ.) মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী’র সেক্রেটারী মোহাম্মাদ ইকবাল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো (যেমন, হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ) একটি অভিন্ন জোটে যুক্ত, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘অক্ষ অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত।
এই জোটের মূল ভিত্তি হলো-ইসরায়েলের প্রভাব ও আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের) হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করা। ইরানের সবচেয়ে পুরোনো ও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিজবুল্লাহ এই অক্ষের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি। হামাস এবং ফিলিস্তিন ইসলামিক জিহাদ গাজা ও ফিলিস্তিনের অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলবিরোধী কার্যক্রমে এই নেটওয়ার্কের অংশ। ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) বাহিনীও এই অক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী শক্তি হিসেবে আঞ্চলিক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। এছাড়াও ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী এই নেটওয়ার্কের অন্তর্ভূক্ত। এই দলগুলো ভৌগোলিক দিক থেকে আলাদা হলেও ইসরায়েল ও পশ্চিমা নীতির বিরুদ্ধে যৌথ কৌশল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্য মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখে চলেছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা ড. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ইরান বরাবরই ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ’ পালনের মাধ্যমে সুন্নি ও শিয়া মুসলমানদের মধ্যে দূরত্ব কমানোর এবং উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে আসছে। ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অবিচার ও আগ্রাসন চলছে তা থেকে মুক্তি পেতে সমন্বিত কুটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।
জমিয়াতে মুয়েব্বিনে আহলে বায়েতের সভাপতি ইব্রাহিম ফায়জুল্লাহ বলেন, আগে সুন্নী আলেমরা এই আলতাপোল লেনে আসতো না, ইমামবাড়ী দিকে তাকাতো না তারা বলতো শিয়ারা কাফের কিন্তু এখন এমন কোন আলেম নেই যারা এই ইমামবাড়ীতে আসে নাই। আমি সফরকালে ইরানে শিয়া-সুন্নী মাযহাবে কোন দ্বন্দ্ব দেখিনি। তারা একত্রে মসজিদে জামাতের সাথে নামায আদায় করে। ইরান একমাত্র জাতি যারা ফিলিস্তিনে মুসলমানদেরকে সাহায্য করছে কিন্তু কোন সুন্নি দেশ নেই যে ফিলিস্তিন মুসলমাদের সাহায্য করছে।
এ্যাড. আবুল হোসেন হাওলাদার বলেন, খুলনায় নিরালায় কাদিয়ানী মসজিদকে আমি শিয়া মসজিদ বলে মনে করতাম কিন্তু আজ আমার ভূল ধারণাটি পরিষ্কার হয়েগেছে যে শিয়া আর কাদিয়ানী আলাদা।
পরপর আইনজীবিরা প্রশ্নকরা শুরু করে-
এ্যাড. শেখ মো. হোসাইন কবির বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে ইরানের ভুমিকা কি?
এ্যাড. মুন্সি আব্দুল হামিদ বলেন, বাইরে বা খোলা ময়দানে এই অনুষ্ঠান করা কি সম্ভব?
এ্যাড. আবুল কাউচার বলেন, শিয়া-সুন্নির ঐক্য না হওয়ার পিছনে ইহুদী ও নাসারাদের হাত আছে কিনা? ফরজে কোন পার্থক্য নেই কিন্তু শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে এত পার্থক্য কেন?
বাগেরহাট সোনাতোনি কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, মাও. আব্দুল আজিজ বলেন, একটি মাঠে ১১জন খেলোয়ার ধর্ম বিভিন্ন ধরনের কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিষ্টান কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে গোল দেওয়া। আমরা যে মতবাদই হোক না কেন আমাদের কলেমা এক, রাসুল এক, আল্লাহ এক। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে জাতি কোন জাতির প্রতি মহব্বত দেখায় কেয়ামতের দিবসে আল্লাহ ঐ জাতিকে মহব্বাত জাতির সাথে দাঁড় করাবেন।
আইনজীবিদের প্রশ্নের উত্তর দেন ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলীল রাজাভী। তিনি আইনজীবি শেখ মো. হোসাইন কবির এর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ইরানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী। দক্ষিণ এশিয়ার সাথে ইরানের ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ এই অঞ্চলকে তেহরানের পররাষ্ট্র নীতির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সংযোগ (চাবাহার বন্দর) : দক্ষিণ এশিয়ার সাথে ইরানের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ভারতের সাথে অংশীদারিত্ব। বিশেষ করে ভারতের অর্থায়ন ও পরিচালনায় ইরানের চাবাহার বন্দর নির্মাণের মাধ্যমে ইরান দক্ষিণ এশিয়াকে (ভারত ও পাকিস্তান হয়ে) মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের সাথে যুক্ত করার একটি ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। এই বন্দরটি পাকিস্তানকে এড়িয়ে ভারতের জন্য আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের বিকল্প পথ তৈরী করে দিয়েছে।
আফগানিস্তান সংকট ও নিরাপত্তা স্বার্থ ঃ দক্ষিণ এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা ইরানের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতাগ্রহণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক চোরাচালান রোধ এবং শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় ইরান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর (বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভারত) সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রেখে চলে। আফগানিস্তানে শিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা হাজারাদের সুরক্ষাও তেহরানের একটি অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য।
পাকিস্তান ও দ্বিপক্ষীয় ভারসাম্য: পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা (যেমন ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প) সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী বা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তেহরান ইসলামাবাদের সাথে একটি স্থিতিশীল ও সুপ্রতিবেশিসূলভ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে।
ভারত-ইরান সম্পর্ক ও বৈশ্বিক চাপের ভারসাম্য : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বাধা থাকলেও ভারতের মতো দক্ষিণ এশীয় পরাশক্তির সাথে ইরানের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব ঃ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে (বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া মুসলিম এবং সুফি ধারার অনুসারী রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ইরান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং মধ্য এশিয়া ও ইউরেশিয়ার সংযোগস্থল এবং বিকল্প অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে একটি অপরিহার্য হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলীল রাজাভী আইনজীবি মুন্সি আব্দুল হামিদ এর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, খুলনায় সার্কিট হাউজে খোলা ময়দানে এমন ধরনের অনুষ্ঠান আগামীতে হবে ইনশাল্লাহ।
হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলীল রাজাভী আইনজীবি আব্দুল কাওসার-এর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ইমাম খোমেনী (রহ.) বলেন, ১২-১৭ রবিউল আউয়াল মুসলিম ঐক্য সপ্তাহ হিসাবে ধরা হোক। কেননা, ১২ রবিউল আউয়াল সুন্নি মাযহাবে হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্মদিবস এবং ১৭ রবিউল আউয়াল শিয়া মাযহাবে হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্মদিবস বিধায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য ১২-১৭ রবিউল আউয়াল মুসলিম ঐক্য সপ্তাহ ঘোষণা দেন। ইহুদী ও নাসারা চায় না শিয়া ও সুন্নি ঐক্যবদ্ধ হোক। শিয়া-সুন্নি ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা বিশ্বে রাজত্ব করব তা ওরা (ইহুদী ও নাসারা দল) চায় না।
আইনজীবি শেখ আব্দুল আজিজ বলেন, ইহুদীবাদী যেভাবে মানুষ হত্যা করেছিল ইরানের শক্তি দেখে তারা চুপ হয়ে গেছে ।
রুপসা জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মঞ্জুরুল আহমেদ-এর মুনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

