ফাদাকের হৃদয়বিদারক ঘটনা

মূল : হযরত আয়াতুল্লাহ আল উযমা মাকারেম সিরাজী

by Syed Yesin Mehedi

 

ফাদাক বিশেষতঃ হযরত ফাতেমা যাহরা (আ)-এর পবিত্রময় জীবনের হৃদয়বিদারক ও বিষাদময় ঘটনাবলীর অন্যতম এবং ব্যাপক অর্থে তা আহলে বাইত (আঃ)-এর জন্য ছিল বেদনাপূর্ণ ঘটনা। ইসলামের ইতিহাস নানাবিধি রাজনৈতিক চক্রান্ত ও উথান-পতনে জর্জরিত। আর ফাদাক হচ্ছে ইসলামের প্রাথমিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাবলী সমাধানের অন্যতম মাধ্যম।
কিন্তু উপরোক্ত অনুগতব্য শুরু করার পূর্বে আমাদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া বিশেষ প্রয়োজন: ফিদাক কি এবং কোথায় অবস্থিত?
প্রখ্যাত শব্দবিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদগণের বর্ণনানুসারে “ফিদাক” হচ্ছে: একটি উর্বর ও কৃষি উপযোগী তুমি। যা হিজাজ ভূ-খণ্ডে খায়বারের নিকটে অবস্থিত এবং মদীনা হতে দু’ থেকে তিন দিনের দুরত্ব বিদ্যমান, অনেকে এ ব্যবধানকে একশত চল্লিশ কিঃ মিঃ উল্লেখ করেছেন। উক্ত স্থানটি ছিল পানির প্রস্রবণ ও প্রচুর খেজুর বাগানে সমৃদ্ধ (মোজামুল বুলদান, ফিদাক শব্দমূল) এবং তা খায়বারের পর ইহুদীদের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।
এখানে উল্লেখ্য যে, কিভাবে ফিদাকের এ উর্বল ও সবুজ ভূমিটি রাসুল (সা.)-এর হস্তগত হয়। বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সা.) যখন খায়বার বিজয়ের পর প্রত্যাবর্তন করেন, আল্লাহ তখন ফাদাকবাসী কট্টরপন্থী ইহুদীদের মাঝে চরম ভীতি ও আতংকের সঞ্চার করেন। ফলশ্রুতিতে তারা তাদের মধ্যে একজনকে রাসূল (সা.)-এর নিকট পাঠায় এবং ফাদাক অর্ধাংশের বিনিময়ে তাঁর সাথে সন্ধি করার প্রস্তাব দেয়। রাসুল (সা.) তাদের সে প্রস্তাবে সম্মত হন এবং সন্ধি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এভাবে ফিদাকের জমিটি রাসুল (সা.)-এর নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়। কেননা, পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনানুসারে যা কিছু বিনাযুদ্ধে মুসলমানদের হস্তুগত হয়, তা সম্পূর্ণ রাসূল (সা.)-এর আয়ত্বাধীন এবং তা যুদ্ধেপ্রাপ্ত গানীমাতের সম্পদ হিসেবে বণ্টন করা হবে না। (সুরা হাশর : 6-7)
এ কারণে রাসুল (সা.) ফাদাক গ্রহণ করেন এবং সেটির আয় দু:স্থ, অসহায় এবং দায়গ্রস্থ পথিকদের মাঝে বন্টন করতেন।
এ বিষয়টি ইয়াকুত হামারী “মো’জামুল বুলদান” গ্রন্থে ও ইবনে মানজুর আন্দলুসী “লিসানুল আরাব” গ্রন্থে এবং আরও অনেকে স্ব-স্ব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
তাবারী (রহ.) স্বীয় ইতিহাস গ্রন্থে ও ইবনে আছীর “কামেল” গ্রন্থে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।(আল্লামা সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ হাসান কাজবিনী হায়েরী রচিত গ্রন্থ ফিদাক-এ রুজু করুন।)
অনেক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা.) আপন জীবদ্দশাতে ফিদাকের জমিটি হযরত ফাতেমা যাহরা (আ,)কে প্রদান করেন। (কেননা সেটি রাসুল (সা,)-এর নিজস্ব সম্পদ ছিল)
এ অর্পণের বিষয়টি মুফাসসিরগণ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, বিশেষতঃ প্রখ্যাত সুন্নী মুফাসসির জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ,) তার “তাফসীরে দুররুল মানসুর” গ্রন্থে সূরা ইসরার ২৬ নং আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ যখন এ আয়াতটি নাজিল হয়, তখন রাসূল (সা.) ফাতেমা যাহরা (আ.) কে আহ্বান জানান এবং ফাদাক তাঁকে প্রদান করেন। হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এ আয়াতটি তোমার নিকট আত্মীয়দের হক আদায় কর নাজিল হয়, তখন রাসুল (সা,) ফিদাকটি ফাতেমা যাহরা (আ.)কে প্রদান করেন।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় অপর একটি রেওয়ায়েত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে অনুরূপ বিষয়বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করে বর্ণিত হয়েছে।(দুররুল মানসুর, খণ্ড 4র্থ, পৃ. 177। এ হাদিসটি আহলে সুন্নাতের অনেক রা’বী যেমন: রেজার, আবু ইয়ালী ইবনে মাদুইয়ে ও ইবনে আবি হাতাম আবু সাঈদ খুদরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন। মিজানুল এতেদাল, খণ্ড 2য়, পৃ. 288 ও কানজুল উম্মাল 2য় খণ্ড, পৃ. 158)
এ বিষয় সম্পর্কে আরও একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর একটি বক্তব্য যা নাহজুল বালাগাতে “ফিদাক” প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।
হ্যা, আসমানের নিচে যা কিছু আছে তন্মধ্যে শুধুমাত্র ফাদাক আমাদের অধীনস্থ ছিল। কিন্তু কিছু ব্যক্তি তাতে কার্পণ্যতার পরিচয় দিয়েছে এবং পক্ষান্তরে অপর কিছু ব্যক্তি উদারভাবে তা প্রত্যাখান করেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বোত্তমক বিচারক।(নাহজুল বালাগা, 45নং চিঠি “চিঠিটি উসমান বিন হানীফের নিকট প্রদত্ত”)
এ ব্ক্তব্যটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণীত করে যে, রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশাতে ফিদাক আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) ও ফাতেমা যাহরা (আ.)-এর অধীনস্থ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে একশ্রেণীর কৃপণমনা শাসকচক্রের দৃষ্টি তাতে নিবদ্ধ হয়, ফলে আলী (আ.) ও তার সহধর্মিনী বাধ্য হয়ে তা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন। তবে এ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়াটা সন্তুষ্টচিত্তে সম্পন্ন হয় নি। কেননা, এক্ষেত্রে আল্লাহর সুবিচার কামনা করা হয়েছে এবং তা না হলে -আল্লাহ সর্বোত্তম বিচারক-উক্তিটি করার কোন অর্থ রাখে না।
অনেক প্রখ্যাত শিয়া ধর্ম বিশেষজ্ঞগণ এ সম্পর্কে বহু রেওয়ায়েত প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
হযরত শেখ কুলাইনী (রহ.) উসুলে কাফী গ্রন্থে হযরত শেখ সাদুক (রহ.) ও মুহাম্মাদ বিন মাসউদ (রহ.) স্ব-স্ব তাফসীর গ্রন্থে আলী ইবনে ঈসা আরবেলী কাশফুল গামমাহ গ্রন্থে এবং আরও অনেকে বিভিন্ন তাফসীর, ইতিহাস ও হাদীসগ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, যা এখানে উল্লেখ করলে পরিসর ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔