ইমাম আলীর (আ.) চিন্তাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি সমৃদ্ধ
ঐতিহাসিক গ্রন্থ নাহজুল বালাগা থেকে আলোচনা
নাহজুল বালাগায় হযরত আলীর (আ) স্বরূপটা এমন একজন ইনসানে কামেলের মত ফুটে ওঠে যিনি সত্তার বিস্ময় ও রহস্যের গূঢ়ার্থ সচেতন এবং যিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের সব রহস্যকে খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেন। আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর গুণাবলি এমন এক বিষয় যা নাহজুল বালাগায় বার বার বর্ণিত হয়েছে। তিনি (আ.) আল্লাহর বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহ্যভাবে দিয়ে মানুষের চিন্তা ও আবেগানুভূতিকে এমন এক অনন্ত সত্যের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে তোলেন যে সত্য সম্পর্কে আমরা সবাই নিজেদের উপলব্ধি অনুযায়ী তাঁকে চিনতে পারি এবং যাঁর অপার দয়া ও রহমতের ছায়ায় আমরা জীবনযাপন করি।
হযরত আলী (আ.) ৪৯ নম্বর খোৎবায় বলেন: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি সকল গোপন বস্তু সম্পর্কে অবহিত এবং সত্তার সকল প্রকাশ্য বস্তুই তাঁর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কখনই কারো চোখের সামনে তিনি প্রকাশিত হন না। যে চোখ দিয়ে তাকে দেখে না সেও তাঁকে অস্বীকার করতে পারে না। যে হৃদয় তাঁকে চিনেছে সেও তাকে দেখতে পায় না। তিনি এত মহান, মর্যাদাবান এবং উন্নত যে তাঁর সঙ্গে তুলনা করার মত কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। আবার তিনি সৃষ্টিকুলের এত কাছে যে, কোনো কিছুই তাঁর চেয়ে বেশি কাছের হতে পারে না।
আলীর (আ.) দৃষ্টিতে আল্লাহ হলেন সকল সত্তার উৎস এবং সৃষ্টির সবকিছু তাঁর থেকেই উৎসারিত। আকাশ ও যমিনে যা কিছু আছে সবকিছুই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে সৃষ্টি করেছেন। আর সৃষ্টিকুল যেহেতু তাঁর সঙ্গেই সম্পর্কিত সেহেতু সকল বস্তুই তাঁর মর্যাদা ও একত্বের প্রকাশক। আল্লাহর বান্দাগণ তাঁর সক্ষমতা, কৌশল ও দয়ার কাছে অনুগত ও আত্মসমর্পিত। বান্দার আনুগত্যের কোনো প্রয়োজন তাঁর নেই। বরং বান্দার নিজের মর্যাদা ও সৌভাগ্যের জন্যেই আনুগত্যের প্রয়োজন।
আলী (আ.) জনগণের নিকট প্রত্যাশা করেন যে, তারা যেন আল্লাহকে সময় ও স্থানের গন্ডির মাঝে অবরুদ্ধ না ভাবে এবং তাঁকে নিজের সঙ্গে তুলনা না করে! আল্লাহকে চেনার জন্যে তাঁর সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করলেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, বিশালত্ব ও মহান মর্যাদার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে। নাহজুল বালাগায় তিনি মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন: হে যথার্থ কাঠামোযুক্ত সৃষ্টি! হে মায়ের পেটের অন্ধকারে লালিত সত্তা! সৃষ্টির শুরুতে তুমি ছিলে কাদার তলানি। তারপর তুমি এক নির্দিষ্ট সময় আরামের একটি জায়গায় সুরক্ষিত ছিলে। সেই মায়ের পেট থেকে তোমাকে বের করে এমন এক পৃথিবীতে আনা হয়েছে যেই পৃথিবীকে তুমি ইতোপূর্বে দেখনি এবং লাভের পথ কোনটি তাও জানতে না। তাহলে চুষে চুষে মায়ের দুধ পান করা কে শেখাল? দরকারের সময় ডাকা বা চাওয়ার পন্থা তোমাকে কে শেখাল?
তিনি আরও বলেন: “যে ব্যক্তি তার নিজের বর্ণনায় ভারসাম্য রক্ষা করতে অক্ষম সে নিঃসন্দেহে তার প্রতিপালকের প্রশংসার ক্ষেত্রে আরও বেশি অক্ষম।” আলী (আ.) অপর এক বর্ণনায় বলেন: মানুষের সুখ-শান্তি আর সুস্থিতির মূল উৎস হলেন আল্লাহ। আল্লাহকে খোঁজার জন্যে তাই মানুষ তার আধ্যাত্মিক শক্তি, জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনাকে কাজে লাগায় যাতে খোদার প্রেমের রেকাবিতে পা রাখা যায় এবং তাঁর নিকটবর্তী হয়ে অমোঘ শক্তি লাভ করে। তিনি (আ.) নিজে আল্লাহর প্রেমের রশ্মিতে মহান ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে এতই ঊর্ধ্বে পৌঁছেন যে, এই পৃথিবী ও এই জীবন তাঁর কাছে খুবই তুচ্ছ বিষয় ছিল এবং সর্বদাই আল্লাহর প্রশংসাবাণী তাঁর মুখে, হৃদয়গ্রাহী শব্দে গুঞ্জরিত হত। বলা হয় যে, রাত ঘনিয়ে আসলে কিংবা আঁধারের পর্দা নেমে আসলে, প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর বিশেষ প্রশংসার মুহূর্ত।
আলী (আ.) আল্লাহকে এত গভীরভাবে চিনতেন যে, স্বয়ং রসুলে খোদা (সা.) তাঁর প্রশংসা করতেন। সেই সঙ্গে রসুল চাইতেন, জনগণ যেন তাঁর ওপর কথা না বলে। কেননা আলী (আ.) হলেন আল্লাহর প্রেমে বিমোহিত।
নাহজুল বালাগায় বিধৃত আলীর (আ.) মূল্যবান কিছু বক্তব্য শুনে আমরা আল্লাহর মহৎ কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পাই। নাহজুল বালাগা মূলতঃ বিশ্বের প্রতিপালক সম্পর্কে বা তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জানার সমৃদ্ধ একটি ভান্ডার।
আলী (আ.) তাঁর বক্তব্যে আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে মূল্যবান অনেক কথাই বলেছেন। আলী (আ.) যে খোদার কথা বলেছেন তিনি শুষ্ক ও নিশ্প্রান কিংবা মানুষের সঙ্গে অপরিচিত কেউ নন। তিনি জীবিত ও সচেতন। মানুষের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা বিনিময় হয়। তিনি মানুষকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করেন এবং তিনি তাদের আন্তরিক প্রশান্তি ও সন্তুষ্টির উৎস। সকল সৃষ্টিই নিজের অস্তিত্বের গভীরে তার সঙ্গে গোপন রহস্যের সূতোয় বাঁধা। তাদের সবাই আল্লাহর প্রশংসায় লিপ্ত। অন্যভাবে বলা যায়, নাহজুল বালাগায় আল্লাহ খুবই প্রিয় সত্তা মানুষের ভালোবাসার মূল উৎস। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী: “তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গেই আছেন।”
এ কারণেই হযরত আলী (আ.) আল্লাহকে চেনার উপায়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। আল্লাহর নিদর্শনগুলো নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা করা, অন্তরের সকল কালিমা দূর করে স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা আনা, সত্তার গভীরে ডুবে যাওয়া, আল্লাহর যিকির করা ইত্যাদিকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টির ভিত্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইমাম আলী (আ.) সত্তাকে আল্লাহর সৃষ্টি বলে মনে করেন এ অর্থে যে, বিশ্ব হল সৃষ্ট বস্তু আর আল্লাহই একে তাঁর নিজস্ব কৌশলে সৃষ্টি করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে, আল্লাহ যা সৃষ্টি করার চিন্তা করেন তা-ই সৃষ্টি হয়ে যায়। তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী মহান স্রষ্টা।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে খুঁজে ফিরে তাকে ইমাম আলী (আ.) বলেন, সে যেন কোরআনে করিমের প্রতি মনোনিবেশ করে। কেননা মানুষের চিন্তাশক্তি সীমিত। সে তার নিজের অপূর্ণ চিন্তা দিয়ে একাকী আল্লাহর মত মহান সত্তাকে খোঁজার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারবে না। আলী (আ.) বলেন, হে প্রশ্নকারী! যথার্থ দৃষ্টি দাও! কোরআন আল্লাহর যেসব গুণ বা বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দিয়েছে তার প্রতি আস্থাশীল হও! তাঁর হেদায়েতের আলো থেকে উপকৃত হও! যা কিছু আল্লাহর কিতাব, নবীর সুন্নাত এবং অলী-আউলিয়ার হেদায়েতের পথ থেকে দূরে রাখে এবং শয়তানের প্ররোচনা যাদের নিত্যসঙ্গী তাদের ত্যাগ কর। ঐশী আদর্শের শিক্ষকগণ জ্ঞানের পথে সদা অটল-অবিচল ছিলেন।
আলী (আ.) আল্লাহর একত্বের ব্যাপারে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বহু প্রমাণ তুলে ধরেছেন এবং তারপর তাঁর আনুগত্য করা আমাদের জন্যে ফরয বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, মানুষ খুবই দুর্বল ও অক্ষম সৃষ্টি, তাই মানুষের উচিত সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা, তার নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকা এবং তার সন্তুষ্টির জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে ইমাম আলী (আ.) তদীয় সন্তান ইমাম হোসাইনের (আ.) উদ্দেশ্যে বলেন: জেনে রেখো, হে আমার সন্তান! আল্লাহর যদি কোনো অংশীদার বা শরিক থাকত তাহলে তাদের পক্ষ হতে নবীরাও তোমার কাছে আসতেন। তুমি তাদের শক্তির নিদর্শন দেখতে এবং তাদের কর্মনৈপুণ্য ও গুণাবলি সম্পর্কে জানতে। কিন্তু খোদা তায়ালা এক ও অদ্বিতীয় সত্তা। যেমনটি তিনি নিজেই বর্ণনা করেন: তাঁর নিরঙ্কুশ একাধিপত্যে কারো কোনো অংশিদারিত্ব নেই এবং তাঁর শক্তি নিঃশেষ হবার নয়।
তাঁর অস্তিত্ব সর্বদা ছিল এবং তিনি সব কিছুর শুরু। তবে তাঁর জন্যে শুরু বলে কিছু নেই। সবকিছুরই সমাপ্তি আছে, কিন্তু তাঁর কোনো সমাপ্তি নেই। মানুষ তাঁর শক্তি সম্পর্কে যতটুকু চিন্তা করতে পারে তিনি তার চেয়েও অনেক ঊর্ধ্বে। এখন যেহেতু এই উপলব্ধি বা বোধ তোমার হয়েছে তাই আল্লাহর প্রতি অনুগত হও! তাঁর শাস্তিকে ভয় কর এবং তাঁর রাগের কারণগুলোকে পরিত্যাগ কর! কেননা, খোদা তায়ালা তোমাকে পুণ্যকাজ ছাড়া আর কোনো কিছুর আদেশ দেননি এবং মন্দকাজ ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাপারে নিষেধ করেননি।
হযরত আলী (আ.) আল্লাহকে গভীর প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে চিনতেন এবং তাঁর ভালোবাসা পোষণের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত একটি বক্তব্য হল: “হে খোদা! তোমার বেহেশতের লোভে কিংবা তোমার জাহান্নামের ভয়ে আমি তোমার ইবাদত করি না; বরং তোমাকে ইবাদতের উপযুক্ত ও প্রশংসার যোগ্য পেয়েই তোমার ইবাদত করছি।” তিনি বিনীতভাবে এবং যথার্থ আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর সান্নিধ্যের জন্যে বেদনাহতের মত মোনাজাত করতেন। রাতের অন্ধকারে যখন সবাই গভীর নিদ্রায় ডুবে যেত তখন তিনি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে গুঞ্জন করতে করতে বলতেন: “হে খোদা! তুমি তো তোমার সকল প্রিয় বান্দার দুঃসময়ের সঙ্গী এবং যারা তোমার ওপর নির্ভর করে তাদের অভাব-অভিযোগের ব্যাপারে তুমি তো সবই জানো। হে খোদা! আমার জন্যে তুমি যা কিছু যথার্থ মনে কর তার নির্দেশনা দাও! আমার অন্তরকে উন্নতি-অগ্রগতির দিকে এবং পূর্ণতার দিকে ধাবিত কর! কেননা, এই অনুগ্রহ তোমার হেদায়েতের বাইরে নয়।
402
আগের পোস্ট
