কারবালার মহাবিপ্লব ও ইতিহাসের অমর কণ্ঠস্বর হযরত যয়নাব (আ.)

by Syed Yesin Mehedi

ইসলামের ইতিহাসে কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকা- কেবল একটি সাময়িক রাজনৈতিক ট্র‍্যাজেডিই ছিল না, বরং তা ছিল সত্য ও অসত্যের, ন্যায় ও অন্যায়ের চিরন্তন সংগ্রামের এক চরম ও চূড়ান্ত অধ্যায়। হিজরি ৬১ সনের ১০ই মহররম মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও অনুসারীদের যেভাবে অবরুদ্ধ করে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসকে চিরকালের জন্য স্তম্ভিত ও রক্তাক্ত করে দেয়।
বনি উমাইয়ার স্বৈরশাসক ইয়াজিদ এবং তার দোসররা ভেবেছিলÑইমাম হোসাইন ও নবী পরিবারের পুরুষ সদস্যদের হত্যার মাধ্যমে তারা আহলে বাইতের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং উমাইয়াদের স্বৈরাচারী ক্ষমতার পথকে নিষ্কণ্টক করেছে। কিন্তু তাদের সেই আসুরিক অহমিকা, ক্ষমতার দম্ভ এবং ভাসা-ভাসা হিসাব-নিকাশকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন কারবালার সিংহী, ইমাম-ভগিনী হযরত যয়নাব (আ.)। আজ দেড় হাজার বছর পরও বিশ্বজুড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জালিমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণের প্রতীক হিসেবে তাঁর সেই সাহসী কণ্ঠস্বর একইভাবে অনুরণিত হচ্ছে।
কুফাবাসীদের অপরাধবোধ ও হযরত যয়নাবের ঐতিহাসিক ভাষণ
ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পরদিনই বন্দি অবস্থায় হযরত যয়নাব (আ.)-সহ নবী পরিবারের নারীদের যখন কুফা নগরীতে নিয়ে আসা হয়, তখন চারপাশের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। এই কুফাবাসীরাই ইমামকে হাজার হাজার চিঠি দিয়ে মদীনা থেকে ডেকে এনেছিল, অথচ শেষ মুহূর্তে বনি উমাইয়ার ভয়ে ও লোভের বশবর্তী হয়ে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই কুফা নগরীতেই একসময় হযরত যয়নাব (আ.) তাঁর পিতা হযরত আলী (আ.)-এর খিলাফতকালে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে বসবাস করেছিলেন। আর আজ তিনি সেখানেই বন্দি!
কিন্তু শোক ও বিপদের এই চরম মুহূর্তেও হযরত যয়নাব (আ.) ভেঙে পড়েননি। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কুফাবাসীদের সামনে এক ঐতিহাসিক ও জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। হযরত যয়নাব (আ.) তাঁর ভাষণে কুফাবাসীদের এই জঘন্য ভীরুতা, কাপুরুষতা ও মুনাফিকিকে এমন ধারালো ভাষায় উন্মোচিত করেন যে, উপস্থিত জনতার অন্তরে তীব্র খঞ্জর বিদ্ধ হওয়ার মতো অনুভূতি সৃষ্টি হয়।
পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ বাহিনী তলোয়ারের জোরে এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে যে সত্যকে চিরতরে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল, হযরত যয়নাব (আ.) তাঁর অলঙ্কারপূর্ণ ও তেজস্বী কথার শক্তিতে তা জনসমক্ষে টেনে আনেন। তাঁর এই ভাষণের ফলে কুফাবাসীদের মধ্যে তাদের অতীত ভূমিকার জন্য গভীর আক্ষেপের সৃষ্টি হলো; লজ্জায়, অপমানে ও আত্মধিক্কারে তাদের মস্তক অবনত হলো। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার এক তীব্র ও কষ্টকর অপরাধবোধ তাদের অন্তরে এমনভাবে সঞ্চারিত হলো যে, আত্মগ্লানিতে তাদের হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগল। হযরত যয়নাব (আ.) কুফা ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর সেই কণ্ঠস্বর কুফাবাসীদের কর্ণে অনবরত প্রতিধ্বনিত হতে থাকল, যা পরবর্তীকালে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে একাধিক গণজাগরণের মূল মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।
বনি উমাইয়ার ভুল হিসাব-নিকাশ এবং সত্যের জয়
ইতিহাসের খলনায়ক ইয়াজিদ, ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা অত্যন্ত অগভীর ও হালকা হিসাব-নিকাশ করেছিল। তারা ধারণা করেছিল যে, হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে একমাত্র গুরুতর অসুস্থ পুত্র হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) এবং শিশুরা ছাড়া যেহেতু কোনো পুরুষ বেঁচে নেই, তাই এই ইতিহাসের এখানেই চিরসমাপ্তি ঘটেছে। তাদের এই ভিত্তিহীন ধারণার পেছনে ছিল চরম অজ্ঞতা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং মিথ্যা অহমিকা।
তারা মনে করেছিল, ইতোপূর্বে যেভাবে স্বয়ং হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর জীবনের চাকার ঘূর্ণন থেমে যায়নি, কিংবা পরবর্তীতে হযরত ইমাম হাসান (আ.)-কে তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে শহীদ করার পরও জনগণের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো প্রতিরোধ আসেনি এবং সবকিছু মুয়াবিয়ার স্বার্থের অনুকূলেই প্রবাহিত হয়েছিল এবারও পরিস্থিতি তেমনই থাকবে। উমাইয়ারা ভেবেছিল, ইমাম হোসাইনকে হত্যার পর তারা এখন নিশ্চিন্তে তাঁর একমাত্র জীবিত পুত্র ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.)-কেও শত্রুদের হাতে তুলে দিতে পারবে এবং যা খুশি আচরণ করলেও সমাজে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে না।
কিন্তু হযরত যয়নাব (আ.) ময়দানে আবির্ভূত হয়ে তাদের সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেন। কারবালার পর তিনি মাত্র দেড় বছরের মতো জীবিত ছিলেন, কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কুফা থেকে শুরু করে দামেস্কের রাজদরবার পর্যন্ত উমাইয়াদের সমস্ত ষড়যন্ত্রের মুখোশ খুলে দেন। ইয়াজিদের ভরা মজলিসে দাঁড়িয়ে তিনি যে অকুতোভয় ভাষণ দিয়েছিলেন, তা উমাইয়াদের তথাকথিত বিজয়ের আনন্দকে চিরদিনের জন্য মরণবিষে পরিণত করেছিল।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ তাবারী ও ইবনে আসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত যয়নাবের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের মুখে কুখ্যাত ইয়াজিদ খুব দ্রুতই নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। সে লোকচক্ষুর সামনে মুসলমানদের কাছে ঘৃণিত হয়ে ওঠে এবং বুঝতে পারে যে, এই হত্যাকা- আসলে তার নিজের রাজত্বের পতন ডেকে এনেছে। শাসনের শেষ তিনটি বছর তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, বিষণœতা ও আত্মগ্লানির মধ্য দিয়ে কেটেছিল এই স্বৈরাচারের। শুধু ইয়াজিদই নয়, ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদও এই একই মানসিক ব্যাধি ও অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়েছিল।
ঐশ্বরিক বিচার ও অপরাধীদের লাঞ্ছনাদায়ক পরিণতি
ইতিহাসের পাতায় কারবালার ঘাতকদের ঐশ্বরিক শাস্তি ও জাগতিক পরিণতির কথা অত্যন্ত ভয়াবহ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। হযরত যয়নাব (আ.) এবং মজলুমদের রক্তমাখা দোয়ার বরকতে কারবালার কুশীলবরা একের পর এক আসমানী গজব ও লাঞ্ছনার শিকার হতে থাকে, যা তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের নৈশকালীন বৈঠকসমূহের মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাসবিদগণও তাঁদের গ্রন্থে এই অলৌকিক ও নির্মম প্রতিশোধের কাহিনীগুলো উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছেন।
যেমন, ফোরাত নদীর পানি সংগ্রহে ইমাম হোসাইনের পথরোধকারী বনি দারেম গোত্রের সেই ব্যক্তি ইমামের অভিশাপে আজীবন তীব্র তৃষ্ণার রোগে আক্রান্ত হয়। শত কুঁজো পানি ও দুধ পান করার পরও তার তৃষ্ণা মিটত না এবং পিপাসায় চিৎকার করতে করতে একপর্যায়ে পেট ফুলে সে মারা যায়। ইমামের রক্তমাখা টুপি ও শাল লুণ্ঠনকারী বনি কিনানার ব্যক্তিটি নিজের খোদাভীরু স্ত্রীর কাছ থেকে বিতাড়িত হয় এবং আজীবন চরম দারিদ্র‍্য ও সামাজিক অবমাননার শিকার হয়ে মারা যায়। অন্যদিকে, ইমামের পবিত্র দেহ মোবারক থেকে মোজা খুলে নেওয়া পাপিষ্ঠের হাত-পা পচে অনবরত রক্ত ও পুঁজ পড়ত এবং গ্রীষ্মকালে তার হাত শুকিয়ে কাঠের মতো হয়ে যেত।
রক্তের বদলা ও বৈপ্লবিক গণজাগরণ
কারবালার হত্যাকা-ের মাত্র তিন বছর পার হতে না হতেই উমাইয়াদের বিরুদ্ধে ছাইচাপা ক্ষোভের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। জাগ্রত কুফাবাসীরা তাদের সুপ্ত চেতনা ফিরে পেয়ে একতাবদ্ধ হয়ে স্লোগান তোলেÑ”ইয়া লাসারাতিল হোসাইন” (ইমাম হোসাইনের রক্তের প্রতিশোধ চাই)।
এরই ধারাবাহিকতায় হিজরি ৬৬ সনে মুখতার সাকাফির নেতৃত্বে ইরাকে এক ঐতিহাসিক ও সশস্ত্র বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই অভিযানের মূল লক্ষ্যই ছিল কারবালার শহীদদের রক্তের বদলা নেওয়া। এই বিপ্লবের মাধ্যমে ইমাম হোসাইনের হত্যাকা-ে সরাসরি জড়িত ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ, আমর বিন সাদ, তার পুত্র হাফস এবং কুখ্যাত শিমারসহ প্রায় ২৮৪ জন অপরাধীকে খুঁজে বের করে এক স্থানেই আটক করা হয়। এরপর তাদের অপরাধের মাত্রা ও নৃশংসতার ধরণ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। কাউকে আগুনে পুড়িয়ে, কারও হাত-পা কেটে রক্তক্ষরণের মাধ্যমে, আবার কাউকে পশুর মতো জবেহ করে হত্যা করা হয়। এবার আর শহীদদের মস্তক দামেস্কে নয়, বরং অপরাধীদের মস্তক মদীনায় পাঠানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে মদীনায় আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের অভ্যুত্থান, উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতন, আব্বাসীয়দের উত্থান এবং উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয় সালতানাতের প্রতিষ্ঠা এই সমস্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের পেছনে কারবালার মহাবিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়াই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
শেষ কথা: একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাব
ইসলামী ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সমস্ত রাজনৈতিক যুদ্ধবিগ্রহ ও ক্ষমতার পালাবদলের চেয়েও কারবালার সবচেয়ে বড় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল ইসলামী ফিকাহ্ ও স্বাধীন চিন্তাধারার পুনরুজ্জীবন। বিশেষ করে শিয়া মাজহাবের ‘জাফরি ফিকহ’-এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং প্রাচ্য ভূখ-ের মুসলিম জাতিসমূহের রাজনৈতিক ও মাজহাবী জীবন মূলত কারবালার পর আহলে বাইতের এই মহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই মজবুত ও প্রসারিত হয়।
আর এই সমগ্র চেতনা, বৈপ্লবিক জাগরণ এবং ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের মূল সূচনাকারী ছিলেন একমাত্র হযরত যয়নাব (আ.)। এটি কোনো অতিশয়োক্তি বা আবেগীয় বক্তব্য নয়, বরং ইতিহাসের এক অকাট্য ও অলঙ্ঘনীয় সত্য। তিনি যদি সেদিন বন্দি ও শৃঙ্খলিত অবস্থায়ও জালিমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্যের বাণী প্রচার না করতেন, তবে কারবালার প্রকৃত ইতিহাস হয়তো উমাইয়াদের প্রোপাগান্ডার আড়ালে মরুভূমির বালুচরেই হারিয়ে যেত। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে হযরত যয়নাব (আ.)-এর সেই অমর কণ্ঠস্বর পৃথিবীর ইতিহাসে চিরকাল অম্লান, চিরজীবী ও অনুরণিত থাকবে।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔