(৩) তিনি আকাশম-লী ও ভুবনকে যথাযথভাবে (সত্যের ভিত্তিতে) সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের আকৃতিও অতি সুন্দর করেছেন, আর (সকল কিছুর) পরিণাম তো তাঁর দিকেই। (৪) আকাশম-লী ও ভূম-লে যা কিছু আছে সমস্তই তিনি অবহিত এবং তিনি তাও জানেন যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর; এবং আল্লাহ বক্ষের রহস্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। (৫) তোমাদের নিকট কি পূর্ববর্তী কাফিরদের বৃত্তান্ত পৌঁছায়নি? তারা তাদের কৃতকর্মের সাজা আস্বাদন করেছিল এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (৬) এটা এ কারণে যে, তাদের নিকট তাদের রাসূলগণ স্পষ্ট প্রমাণসহ আসত, কিন্তু তারা বলত, ‘মানুষ কি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করবে?’ বস্তুত তারা অবিশ্বাস করল ও বিমুখ হয়ে গেল। এতে আল্লাহর কিছু আসে যায় না; আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত।
বিশ্বজগতের প্রতি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসীর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য
এ বরকতময় সূরার বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্ববর্তী দু’টি পর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে, এ সূরায় উল্লিখিত বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ হলো, এ সূরার অন্তত কিছু অংশ আমাদেরকে সেই জ্ঞানের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে এবং ব্যাখ্যা করতে চায় যা মানুষের কর্মের সঠিক পথ এবং মানুষের ইসলামি ও ঐশ্বরিক জীবনের ভিত্তিকে সমর্থন করতে পারে। অবশ্যই, এ সূরার প্রথম আয়াতগুলোতে আল্লাহর গুণাবলি এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষা রয়েছে যা মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক এবং বিদ্যমান পরিবেশের সাথে মানুষের জীবনের সম্পর্ক। মানুষ যখন এ শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং কুরআন মানুষকে সে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করবে, তখন ফলাফল দাঁড়াবে যে, মানুষ জীবনের নিজস্ব পথ খুঁজে পাবে এবং ঐশী চিন্তাভাবনার আলোকে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে। উদাহরণস্বরূপ, এ শিক্ষা-দীক্ষার কিছু দিক সম্পর্কে আমরা পূর্বেকার অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি; তার মধ্যে একটি হচ্ছে- সর্বশক্তিমান আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে সত্যের ভিত্তিতে সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে আমরা সেখানে সত্যের ভিত্তিতে সৃষ্টির অর্থ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেছিলাম যে, এ সমস্ত সৃষ্টি ও ঐশ্বরিক সৃষ্টির বিশাল ও অপরিসীম অংশগুলোর একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিণতি রয়েছে; যার দিকে এ বিশ্বের গতিবিধি পরিচালিত হয় এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহ স্বীয় ঐশী আইন, বৈশিষ্ট্যাবলি ও দিকনির্দেশনা দিয়ে এ মহান কারখানাটি তৈরি করেছেন যাতে মানুষ যে নিজের ইচ্ছায় চলাচল করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় এ আইন-কানুন ব্যবহার করতে পারে এবং তার লক্ষ্য চূড়ান্ত পরিপূর্ণতার দিকে পরিচালিত করতে পারে। অর্থাৎ এ পৃথিবীর সুখ এবং পরকালের সুখের দিকে, যাকে আমরা মানুষের পরিপূর্ণতা ও মহিমা এবং আল্লাহর দিকে লক্ষ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করি এবং মানুষ যাতে সে লক্ষ্যের আলোকে স্বীয় জীবনকে যথাযথভাবে সাজাতে পারে। নভোম-ল ও পৃথিবীর সঠিক সৃষ্টির অর্থ এটাই যে, এ পৃথিবীর সকল প্রাণীকে সঠিকভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। হ্যাঁ, এটি হচ্ছে ঐশী ও ইসলামি শিক্ষা। যে ব্যক্তি এ সমগ্র বিশ্বকে একটি সুসংগঠিত সমগ্র বলে মনে করে যার নিয়ম ও আইন অনুসারে একটি সুসংগত গতিও রয়েছে এবং একটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের জন্য গঠিত হয়েছে; এমন ব্যক্তির জীবনের সাথে ঐ ব্যক্তি যে এ বিশাল বিশ্বকে একটি একক সমগ্র বলে মনে করে না, অথবা এর সুসংগততা আছে বলে মনে করে না, অথবা এর গতি আছে বলে মনে করে না, অথবা এর গতিকে একটি পরিকল্পিত লক্ষ্যের গতি বলে মনে করে না, তার জীবনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এমন ব্যক্তি এ সমগ্র বিশ্বকে একটি বিক্ষিপ্ত জিনিস বলে ধারণা করে এবং মনে করে যে, মানুষকে এ বিক্ষিপ্ত সমগ্রের প্রতিটি সম্ভাব্য দিকে এগিয়ে যেতে হবে যাতে সে যার মধ্যে কল্যাণ ও স্বার্থ রয়েছে বলে মনে করে তা হাসিল করতে পারে।
এ দুই ধরনের মানুষ পরস্পর থেকে আলাদা; যে ব্যক্তি এ পৃথিবীকে একটি সম্পূর্ণ বিষয় বলে বিশ্বাস করে এবং নিজেকে এ সমগ্রের একটি অংশ বলে মনে করে এবং একই সাথে বিশ্বাস করে যে, এ পৃথিবী নির্দিষ্ট নিয়ম ও আইন অনুসারে সৃষ্ট হয়েছে এবং এ আইন লঙ্ঘন করা সমগ্র বিশ্বজগতের সামগ্রিক ও সুসংগত গতিবিধি লঙ্ঘন করা, সে এ আইনগুলো বোঝার ও তার জীবনকে সেগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে; এমন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির জীবনধারা এক ধরনের। অপরদিকে যে ব্যক্তি এ শিক্ষাগুলোতে বিশ্বাস করে না এবং বিশ্বকে একটি সম্পূর্ণ বিষয় বলে মনে করে না, তার জীবনপদ্ধতি অন্য ধরনের। সুতরাং এরূপ বিশ্বাস যে, এ পৃথিবী একটি সামগ্রিক ও সুসংগঠিত অস্তিত্ব এবং এর কিছু সুনির্দিষ্ট আইন তথা নিয়ম-নীতি রয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ আইনগুলো নির্ধারণ করেছেন; এ আইনগুলো এ জন্য নির্ধারিত হয়েছে যে, এ সমগ্র সৃষ্টিজগৎ একটি একক ও অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে উন্নীত হবে; মনে করুন, যদি আমি একজন মানুষ হিসেবে আমার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে চাই একজন নাবিক যিনি জানেন যে, যদি তিনি তাঁর গন্তব্যে পৌঁছতে চান, তাহলে তাঁকে এভাবে তাঁর পাল স্থাপন করতে হবে, ঝড়, বাতাস, ঢেউ ও সমুদ্রের গতিবিধির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং যদি একজন মানুষ এ পৃথিবীতে সঠিকভাবে তার জীবন পরিচালনা করতে চায়, তাহলে তাকে সৃষ্টির নিয়মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। আর যে ব্যক্তি এমনটি চায় স্বাভাবিকভাবেই তার জীবনধারা হবে একটি নির্দিষ্ট ও কাক্সিক্ষত জীবনধারা। এ ধরনের ব্যক্তি এ নিয়মগুলো বোঝার চেষ্টা করে, বিশ্বকে জানতে চায়, সেই সমস্ত আইন সন্ধান করে যা জ্ঞানের ভিত্তিতে, বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে এবং মা’রেফাতের উপর ভিত্তি করে সমগ্র জীবনের জন্য সাজানো হয়; সে এ ধরনের নিয়মগুলো অনুসন্ধান করে, সে তার নিজের অজ্ঞতার উপর নির্ভর করে না। এটি আল্লাহর উপর বিশ্বাসী মানুষের আত্মা, দাসত্বের আত্মা; দাসত্বের অর্থ হচ্ছে এটাই। যে দাসত্বের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অর্থাৎ মানুষ তার জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে এটি মানুষ এবং বিশ্ব সৃষ্টির সাধারণ লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়; এটিই হলো আল্লাহর দাসত্বের অর্থ, শব্দের পূর্ণ এবং প্রকৃত অর্থে যে, সমস্ত মানুষকে দাসত্বের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি সেই জ্ঞান সেই ঐশী জ্ঞান, যা মানুষ ও বিশ্বের সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত সঠিকভাবে না বোঝে তবে স্বাভাবিকভাবেই তার বিশ্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকবে না, মানুষের নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পর্কে এমন ধারণা থাকবে না এবং স্বাভাবিকভাবেই তার পথচলাও সঠিক ও যথাযথ হবে না।
40
