ত্যাগ সম্পর্কে একটি আলোচনা

by Syed Yesin Mehedi

এখন আমরা আলোচনা করবো ত্যাগ সম্পর্কে। কারবালার ঘটনা ত্যাগ ও তিতিক্ষার একাধিক উদাহরণে পরিপূর্ণ। ইমাম হোসাইনের (আ.) ভাই বীরশ্রেষ্ঠ হযরত আব্বাস ত্যাগ ও তিতিক্ষার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এ সম্পর্কে ইসলামের প্রাথমিক যুগের এক ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। তবে সে ঘটনায় একজন নয় বরং কয়েক জনের তিতিক্ষার পরিচয় মেলে। জনৈক সাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, কোনো এক ইসলামী জিহাদে আমি আহতদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। আর একজনকে মৃত প্রায় অবস্থায় দেখলাম। (যেহেতু আহতদের দেহ থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হয় এ জন্যে তারা বেশি বেশি তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন।) আমি ঐ লোককে দেখেই বুঝলাম যে তার পানির প্রয়োজন। ছুটে গিয়ে একটি পাত্রে পানি নিয়ে এলাম। কিন্তু যখন তার মুখের কাছে পানি নিয়ে গেলাম তখন তিনি আরেক জনের দিকে ইশারা করে বললেনা: উনি আমার চেয়ে বেশী তৃষ্ণার্ত। তুমি বরং ওনাকে আগে পানি দাও। আমি গেলাম তার কাছে। কিন্তু তিনি আরেক জনের দিকে ইশারা করে ঐ একই কথা বললেন। এভাবে তিনজনকে রেখে যখন অন্য আরেক জনের কাছে গেলাম তখন দেখি তিনি দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। ফিরে এলাম আগের লোকের কাছে এবং দেখি তিনিও ইতোমধ্যে মারা গেছেন। ছুটে গেলাম তার আগের লোকের কাছে এবং দেখি তিনিও মারা গেছেন। এরপর যখন প্রথম লোকের কাছে গেলাম তখন দেখি তিনিও ইতোমধ্যে মারা গেছেন। মোটকথা আমি শেষ পর্যন্ত কাউকেই পানি খাওয়াতে সক্ষম হইনি। এ হলো ত্যাগ তথা উন্নত মানবাত্মার বহিঃপ্রকাশ। সূরা আদ্-দাহরে যেমন বলা হয়েছে: ‘‘নিজেরা ক্ষুধার্ত হওয়া সত্বেও ও তারা অভাবগ্রস্থ, ইয়াতীম এবং বন্দীদেরকে আহার্য দান করে।’’ (দাহর: ৯)
এ আয়াতে মানুষের ত্যাগ ও তিতিক্ষার পবিত্র গুণটিকেই প্রশংসা করা হয়েছে, কারবালার ময়দানেও যেন এ গুণটির প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং এ দায়িত্ব যেন হযরত আব্বাসের উপর আরোপিত হয়। হযরত আব্বাস ইমাম পরিবারের তৃষ্ণার্ত শিশুদের জন্যে পানি আনার দৃঢ়সংকল্প নিয়ে চার হাজার শত্রু-সেনার ব্যুহ প্রাচীর ভেদ করে ফোরাতের পানিতে এসে পড়লেন। তিনি ঘোড়াসহ এমনভাবে পানিতে নামলেন যে, পানি ঘোড়ার পেট ছুয়ে গেল এবং হযরত আব্বাস সহজেই ঘোড়ার পিঠে বসে মশকে পানি ভর্তি করতে পারেন। প্রথমে তিনি মশক ভরে পানি নিলেন। এবার তিনি হাত ভরে পানি তুলে মুখের কাছে আনলেন। শত্রু সেনারা দূরে থেকে তাকিয়ে দেখছিল। তারা বলে যে আমরা এটুকুই দেখলাম যে, হঠাৎ করে তিনি পানি ফেলে দিলেন এবং একফোটা পানিও পান করলেন না। দর্শকরা কেউ এর কারণ বুঝতে পারলো না। কিন্তু ইতিহাস বলে:
হযরত আব্বাসের তৃষ্ণার্ত ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। তিনি ভাবলেন, ইমাম (আ.) তাঁবুতে তৃষ্ণার্ত থাকবেন আর আমি পানি খাব এটা কিভাবে সম্ভব?
প্রশ্ন হতে পারে, ইতিহাস এ কথা কোত্থেকে পেল? জবাব হলো: হযরত আব্বাস যখন পানি থেকে উঠে এলেন তিনি জোরে জোরে এক কাসিদা পড়লেন। নিজের নফসকে উদ্দেশ্য করে বলছেন:
“হে আব্বাসের নফস! আব্বাস হোসাইনের (আ.) পর আর এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে চায় না। কিন্তু তুমি পানি পান করে তৃপ্ত হতে চাও! হে আব্বাস! তোমার ভাই তৃষ্ণার্ত আর তুমি স্বচ্ছ পানি পান করে বেঁচে থাকতে চাও? আল্লাহর শপথ করে বলছি-ভাইয়ের খেদমত, ইমাম হোসাইনের (আ.) খেদমত, সত্যের খেদমত, সেনাপতির বিশ্বস্ততা এভাবে সম্ভব নয়।’’ (দ্রঃ ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ ২/১৬৫; বিহারুল আনওয়ার ৪৫/৪১)
কারবালা ছিল সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার বাস্তব পরীক্ষা কেন্দ্র। এর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বস্ততায় ভরপুর।
উমর ইবনে কোরযা ইবনে কা’ ব ছিলেন মদীনার আনসারদের বংশের লোক। আশুরার দিন যখন প্রচ- তীর বর্ষণের মধ্যে ইমাম হোসাইন (আ.) মুষ্টিমেয় সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নামাযে দাঁড়ান তখন উমর ইবনে কোরযা ঢালের মতো বুক পেতে দিয়ে নামাযের জামাতকে তীরের হাত থেকে রক্ষা করছিলেন। একটার পর একটা তীর এসে এমনভাবে তার বুকে বিধলো যে আর খালি জায়গা ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত উমর পড়ে গেলো। তার মৃত্যু আর কিছু বাকি ছিল না। এমন সময় ইমাম হোসাইন (আ.) তার শিয়রে আসলেন। উমর এত কিছুর পরও সন্দেহ করছেন যে, তিনি তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পেরেছেন কিনা! তাই ইমামকে জিজ্ঞেস করলেন :
“হে ইমাম! আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি?’’ কারবালা এ ধরনের ত্যাগ ও তিতিক্ষার একাধিক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
এখানে কারবালার আরেকজন শ্রেষ্ঠ বীরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইর যখন কুফার বাইরে ছিলেন তখন শুনলেন যে, কী এক গ-গোল হয়েছে এবং কুফাবাসীরা ইমাম হোসাইনের (আ.) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্য জোগাড় করছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইর একজন মুজাহিদ ছিলেন। এ খবর শুনে আল্লাহ নিজে নিজে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি ইসলামের জন্যে কাফেরদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছি। কিন্তু আজ রাসূলুল্লাহর (সা.) বংশধরকে রক্ষা করতে যুদ্ধে নামার মতো গৌরব অতীতের কোনো যুদ্ধেই ছিল না। এ ভেবে তিনি বাড়ীতে ফিরে আসলেন এবং তার স্ত্রীর সাথে ঘটনা খুলে বললেন। স্ত্রী বললেন, ‘সাবাস! খুব ভাল কথা চিন্তা করেছ, তবে আমার এক শর্ত রয়েছে। আব্দুল্লাহ বললেন, ‘ কী শর্ত!’ স্ত্রী বললো, ‘ আমাকেও সাথে করে নিয়ে যাবে।’ আব্দুল্লাহ যখন স্ত্রীকে সাথে নিতে রাজী হলেন তখন তার মা এসে বললো, ‘আমাকেও সাথে করে নিতে হবে।’ কত বীরাঙ্গনা এ নারীরা!
আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইর মা ও স্ত্রীকে নিয়ে ইমাম হোসাইনের (আ.) কাফেলায় যোগ দিলেন। আশুরার দিন অসীম সাহসিকতার সাথে আব্দুল্লাহ ময়দানে এলেন। তার মোকাবিলায় প্রথম আসলো ইবনে সা’ দের গোলাম ইয়াসার। আব্দুল্লাহ বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে আরেকজন শত্রুসেনা পিছন দিক থেকে তাকে আক্রমণ করে বসলো। আব্দুল্লাহ আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত এক হাতের আঙ্গুলগুলো হারালেন। তারপর আরেকটি হাতে অস্ত্র নিয়ে তাকেও হত্যা করলেন। রক্ত মাখা দেহ নিয়ে একা তিনি ইমাম হোসাইনের (আ.) তাঁবুতে ফিরে এলেন। তার মাকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘আমার দায়িত্ব কি ঠিকমতো পালন করিনি?’ জবাবে আব্দুল্লাহর মা বললেন, না। আমি তোমাকে নবীর সন্তানের সাহায্য করার পথে শহীদ অবস্থায় দেখতে চাই। যতক্ষণ তুমি এ কাজ না করবে ততক্ষণ আমি তোমার উপর রাজি হবো না।
এ সময় তার স্ত্রী এলেন। অবশ্য তার স্ত্রী অল্পবয়স্কা ছিলেন। তিনি আব্দুল্লাহকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু তার মা বলে উঠলেন এ সময় স্ত্রীর কথা শোনার অবকাশ নেই। আমার ভয় হয় তুমি স্ত্রীর কথা শুনে যুদ্ধ থেকে বিরত হও কিনা। তুমি যদি আমাকে সন্তুষ্ট করতে চাও তাহলে জেনে রেখো তার একটিই পথ-আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া। আব্দুল্লাহ ময়দানে ফিরে গেলেন এবং প্রাণপণে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে গেলেন। শত্রুরা তার মাথাকে ছিন্ন করে তার মা’ র দিকে নিক্ষেপ করলো। আব্দুল্লাহর মা তার মাথাটিকে তুলে নিয়ে ধুলোমাটি সাফ করলেন এবং চুমু দিয়ে বললেন: সাবাস আব্দুল্লাহ, সাবাস! এখন আমি তোমার উপর পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়েছি। কিন্তু তারপর বললেন: আমরা যে জিনিস আল্লাহর পথে দান করেছি তা ফিরিয়ে নেই না। এ বলে আব্দুল্লাহর মা মাথাটিকে শত্রুদের দিকে নিক্ষেপ করে দিলেন। (বিহারুল আনওয়ার ৪৫/২৮; মানাকিবে ইবনে শাহের অশুব ৪/১০৪; মাকতালুল হোসাইন: খারাযমী ২/২২; মাকতালুল মোকাররাম ৩১৫)
সবশেষে কারবালার উত্তপ্ত ময়দানে বিমূর্ত, ইসলামের অভিন্ন ও সমানাধিকার বিধানের এক বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করেই আমরা এ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি করবো। আশুরার দিন যারা রাসূলের (সা.) খান্দানের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে ক’ জনকেই শেষ মুহুর্তে ইমাম হোসাইন (আ.) নিজে এসে ধরেছিলেন। এই ক’ জনের মধ্যে দু’ জন মুক্ত হওয়া গোলাম ছিল। তাদের একজন হযরত আবুজারের গোলাম ছিলেন ও পরে তিনি তার মুক্তিদান করেন। তিনি ছিলেন নিগ্রো, নাম জন। ধারণা করা হয় যে, মুক্ত হবার পরও তিনি নবীবংশকে ছেড়ে চলে যাননি। নবীবংশের খাদেম হিসেবে তিনি থেকে গিয়েছিলেন। আশুরার দিন এই জন ইমাম হোসাইনের (আ.) কাছে এসে বললেন, ‘আমাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিন।’ ইমাম বললেন, ‘দেখ, জন। তুমি সারা জীবন লোকের খেদমত করলে। তোমার উচিত বাড়ীতে ফিরে গিয়ে এখন থেকে মুক্ত জীবন শুরু করা। তুমি এ পর্যন্ত যা করেছ তাতেই আমরা তোমার উপর সন্তুষ্ট।’ কিন্তু জন নাছোড়বান্দা। ইমামকে অনেক কাকুতি-মিনতি করে যুদ্ধে যেতে চাইলেন। তবুও ইমাম হোসাইন (আ.) না করলেন। কিন্তু এরপর জন এমন এক কথা বললেন যা শুনে ইমাম হোসাইন (আ.) আর তাকে আটকানো জায়েজ হবে না বলে মনে করলেন। জন বললেন: হে ইমাম! বুঝতে পেরেছি কেন আমাকে অনুমতি দিচ্ছেন না। আমি যে কালো! আমার গা থেকে যে দুর্গন্ধ বের হয়। আমার কি শহীদ হওয়ার যোগ্যতা আছে! আমি কোথায় আর এ সৌভাগ্য কোথায়!
একথা শুনে ইমাম হোসাইন বললেনঃ না, তার জন্যে না। ঠিক আছে তুমি যাও। জন অনুমতি পেয়ে খুব খুশী হলেন। বীরদর্পে ময়দানে প্রবেশ করলেন। প্রাণপণ লড়াই করলেন এবং শেষ পর্যন্ত আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। এবার কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ.) নিজেই তার কাছে ছুটে এলেন। তার মাথা কোলে তুলে নিয়ে ইমাম দোয়া করলেন: হে আল্লাহ, পরকালে তাকে সাদা চামড়ার করে দিন, তার গা থেকে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিন। তাকে আবরারদের সাথে পুনরুত্থান করুন। (আবরার অর্থাৎ যারা মুত্তাকিনদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ) কুরআনে সূরা মুতাফফেফিনের ১৮ নং আয়াতে এসেছে :
“অবশ্যই পুণ্যবানদিগের (আবরার) আমলনামা ইল্লিয়িনে।”
এবার এক মর্মভেদী দৃশ্যের অবতারণা হলো। আঘাতের চোটে জন বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। তার চোখের ওপর রক্ত জমাট বেধে ছিল। ইমাম হোসাইন (আ.) আস্তে আস্তে তার চোখের উপর থেকে রক্ত সরিয়ে দিলেন। এসময় জুনের হুশ ফিরলো। ইমাম হোসাইন (আ.)-কে দেখে তিনি হাসলেন। ইমাম হোসাইন (আ.)ও তার মুখের উপর মুখ রাখলেন যা কেবলমাত্র জনের এবং হযরত আলী আকবরের ভাগ্যেই হয়েছিল।
ইমাম হোসাইন (আ.) তার মুখের উপর নিজের মুখ রাখায় জন এতোই খুশী হলেন যে, মৃদু হাসলেন এবং ঐ হাসি মুখেই শাহাদাত বরণ করলেন।
এ ছিল কারবালায় ইসলামের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবির অংশবিশেষ। ত্যাগ-তিতিক্ষা, সহানুভূতি, বিশ্বস্ততা, ঈমান, সাহস ও বীরত্বের অতুলনীয় ও বাস্তব নাট্যমঞ্চ।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔