বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির জটিল প্রেক্ষাপটে ইসলামী উম্মাহর সুদৃঢ় ঐক্য এবং সঠিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুলনায় এক বিশাল আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খুলনার ঐতিহাসিক মসজিদে ওয়ালি আসর প্রাঙ্গণে আঞ্জুমানে পাঞ্জাতনী ও জামিয়্যাতে মুহিব্বীনে আহলে বাইত বাংলাদেশ-এর যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল নব-নির্বাচিত মহামান্য রাহবার আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ীর প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমসাময়িক যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হুজ্জাতুল ইসলাম শাহাবুদ্দিন মাশায়েখী বলেন, “বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সুপরিকল্পিতভাবে মুসলিম দেশগুলোকে বিভক্ত করে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা কখনো রাজনৈতিক, কখনো অর্থনৈতিক, আবার কখনো ধর্মীয় বিভাজনের মাধ্যমে উম্মাহকে ছিন্নভিন্ন করতে চায়। এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের জন্য একমাত্র পথ হলো—আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক নেতৃত্বের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। যদি আমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি দুর্বল ও বিপর্যস্ত বিশ্ব রেখে যাবো।”
আলোচনা সভার সভাপতি হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহিম খলিল রাজাভী বলেন, “আমাদের প্রাণপ্রিয় রাহবার জালেম শক্তির কাছে নতিস্বীকার না করে শাহাদাতের পথ বেছে নিয়েছেন—এটি কোনো পরাজয় নয়, বরং একটি চিরন্তন বিজয়ের সূচনা। তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর পবিত্র রক্ত মুসলিম বিশ্বের অন্তরে এক নতুন চেতনা জাগ্রত করবে, যা অত্যাচারী শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দেবে।
ইরান আজ শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি আদর্শের নাম—যে আদর্শ জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। ফিলিস্তিনের প্রশ্নে তারা যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তা প্রমাণ করে ‘গ্রেট ইসরাইল’-এর নীল নকশা কখনোই বাস্তবায়িত হতে দেওয়া হবে না। এই সংগ্রাম কেবল একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।”
আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপ্যাল, আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুর রশিদ তিনি বলেন, “মুসলিম উম্মাহর মূল পরিচয় হলো তাওহিদ—এক আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস। ইরান যে তাওহিদী চেতনা ধারণ করে, তা কোনো একটি জাতি বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন আকীদা। আজকের এই কঠিন সময়ে আমাদের উচিত বিভেদ ভুলে সেই চেতনার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
যারা জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি ঈমানী দায়িত্ব। আমরা যদি আজ নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।”
বক্তব্য রাখেন নিসারিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল, মাওলানা আব্দুর রহমান তিনি বলেন, “জুলুমের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানেই জালেমকে সহায়তা করা—এটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, কিন্তু আমরা অনেক সময় স্বার্থের কারণে নীরব থাকি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই নীরবতা একদিন আমাদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাই সময় এসেছে—সত্যের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির প্রস্তুতি গ্রহণের।”
উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন খুলনা বিএল কলেজ সাবেক অধ্যাপক, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস তিনি তার বক্তব্যে বলেন হক ও বাতিলের চিরন্তন লড়াইয়ে হকের বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং সকলকে ধৈর্য ও সংগ্রামের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সিনিয়র আইনজীবী রুহুল আমিন সিদ্দিকী, খালিশপুর হাউজা-এ-ইলমিয়া সাহেবুজ্জামান এর অধ্যক্ষ, সৈয়দ রেজা আলী যায়দী এবং বাইতুল মোকাররামের খতিব মাওলানা আজিজুর রহমান সিদ্দিকীসহ অন্যান্য ওলামাগণ মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, মুসলিম বিশ্বের বিপুল সম্পদ, জনশক্তি ও সম্ভাবনাকে যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে আবারও বিশ্ব নেতৃত্বে ফিরে আসা সম্ভব।
উপস্থিত ছিলেন খুলনা ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার মোঃ মোশারফ খান তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে নীরব ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু ফিলিস্তিনের প্রশ্নে ইরান যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
তারা প্রমাণ করেছে—সাহস এবং আদর্শ থাকলে বড় শক্তির বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো সম্ভব। মুসলিম বিশ্বের উচিত এই অবস্থান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নিজেদের নীতি ও অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. শাহজালাল হোসেন বলেন, “ইতিহাস আমাদের শেখায়—সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে গেলে আপোষহীন হতে হয়। হযরত খামেনী ইয়াজিদী শক্তির সাথে আপোষের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যা ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিনি স্বপরিবারে শাহাদাতের পেয়ালা পান করা সত্ত্বেও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। এই ঘটনা শুধু একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি প্রেরণা। আজকের বিশ্বেও আমাদের সেই চেতনা ধারণ করতে হবে।”
বিশিষ্ট আলেম আতিয়ার হোসেন কাউছারী বলেন, “একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি তার ঈমান এবং শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি শাহাদাতকে ভয় পায় না, তাকে কোনো শক্তিই পরাজিত করতে পারে না।
ইরানের শীর্ষ নেতাদের শাহাদাত প্রমাণ করে যে, তারা ক্ষমতা বা দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য নয়, বরং ঈমানী চেতনা ও আদর্শের জন্য সংগ্রাম করছেন। এই চেতনা যদি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে কোনো জালেম শক্তি টিকে থাকতে পারবে না।”
এছাড়াও বিশেষ বক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন মাওলানা ইব্রাহিম ফয়জুল্লাহসহ অন্যান্য গণ্যমান্য ওলামায়ে কেরাম। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা, মজলুম মানবতার মুক্তি এবং বর্তমান রাহবারের দীর্ঘায়ু কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক সংহতির বার্তায় রূপ নেয়।


