পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর হতে চলল বর্তমান সময় পুরো ইসলামী জগতে যে শব্দটি পথে ঘাটে, এখানে সেখানে, উঠতে বসতে-জীবনের সর্বক্ষেত্রে হরহামেশা শুনতে শুনতে কান ঝালপালা হয়ে যায় !
বহুল প্রচারিত ও সফল ভাবে বাজারজাতকৃত কথাটি হল-বিদআত।
বিদআত কথাটি পরিপূর্ণ ভাবে অনুধাবন করতে হলে সুন্নাত কথাটির অর্থ ও ব্যবহার প্রথমে অনুধাবন করা জরুরী। তাই প্রথমে সুন্নাত কথাটি কি-পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে।
এরপরে পরের অংশে থাকবে বিদআত কথাটির শাব্দিক অর্থ এবং পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ওয়াহাবীদের বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘বিদআত’।
ওয়াহাবী আলেমদের ফতোয়াসমূহ থেকে বোঝা যায় এমন অনেক আমলই যা মুসলমানদের সর্ব সাধারণের কাছে সুন্নাত ও জায়েয বলে পরিগণিত ওয়াহাবীদের পক্ষ থেকে তা বিদআত বলে ঘোষিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হল শরীয়তের বিধান বোঝার ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা ও স্থবিরতা।
তাদের গোঁড়ামী ও কূপমন্ডূকতার কারনেই এক সময় তারা সাইকেলকেও শয়তানের বাহন বলে আখ্যায়িত করেছিল। অবশ্য এখন তাদের আলেমরা সৌদি সরকারের সর্বাধুনিক যানবাহনে আরোহণ করেন এবং তাকে বিদআত বলেন না।
তাদের এরূপ চিন্তা-ভাবনার পিছনে বিশেষ কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
আমরা জানি ইসলামের সকল বিধানসমূহ যা মহানবী (সাঃ) এর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে তাকে সহজ শরীয়ত বলে অভিহিত করা হয়েছে। তদুপরি ওয়াহাবীগণ অসংখ্য বৈধ বা জায়েয বিষয়কে বিদআতের শ্রেুীতে ফেলে তা হারাম বলে ঘোষণা করেছে।
তাই আমরা প্রথমেই সুন্নাত ও বিদআতের সংজ্ঞা ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।
শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে সুন্নাত
সুন্নাত শব্দগতভাবে নিয়ম বা পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
এর বহুবচন হল সুনান। সুন্নাত শব্দটি পবিত্র কোরআনে আল্লাহর জন্য যেমন ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ক্ষেত্রেও এসেছে, যেমন- “আল্লাহর নীতি পূর্ব হতেই এরূপ (যে, সত্য মিথ্যার উপর বিজয়ী হবে) এবং আল্লাহর নীতিতে কোন পরিবর্তন নেই।” সূত্র-সূরা ফাতহ : ২৩।
অন্যত্র বলেছেন, “(তাদের জন্যও) পূর্ববর্তীদের পথ (পূর্ববর্তীদের জন্য আল্লাহর অনুসৃত রীতি) নির্ধারিত হয়ে গেছে।” সূত্র-সূরা আনফাল : ৩৮।
সুন্নাতুল্লাহ্ বা আল্লাহর নীতি বলতে তাঁর গৃহীত প্রজ্ঞাময় রীতি ও পদ্ধতি বোঝানো হয়েছ। আল্লাহর চিরাচরিত নীতি বা রীতি এটাই যে, সময়ের পরিক্রমায় তিনি জাতির পর জাতিকে সৃষ্টি করেন, তাদের উদ্দেশে নবী, ধর্মগ্রন্থ ও শরীয়ত (বিধিবিধান) প্রেরণ করেন, তাদের আল্লাহর আনুগত্যের পথ দেখান এবং এভাবে তাদের পরীক্ষা করেন যাতে করে তারা স্বাধীনভাবে নিজেই নিজের পথকে বেছে নিয়ে ঈমান ও সৎকর্মের পথে অগ্রসর হয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে (আল্লাহর সন্তুষ্টি) পৌঁছতে পারে।
কিন্তু পূর্ববর্তী অধিকাংশ জাতির অনুসৃত রীতি এটা ছিল যে, তারা আল্লাহর প্রেরিত নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অন্যায় ও সীমা লঙ্ঘনের পথ গ্রহণ করত। এভাবে নিজেদের আল্লাহর জন্য একটি নীতির উপযুক্ত করত আর তা হল আল্লাহর শাস্তির উপযোগী হওয়া।
তারা আল্লাহর প্রেরিত নবীদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে আল্লাহর নির্ধারিত আজাবে পরিণত হয়ে ধ্বংস হত।
যেমন আল্লাহ বলেছেন- “হেদায়েত আসার পর এ প্রতীক্ষাই শুধু মানুষকে বিশ্বাস স্থাপন করতে এবং তাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বিরত রাখে যে, কখন আসবে তাদের কাছে পূর্ববর্তীদের জন্য (আল্লাহর) অনুসৃত রীতি অথবা কখন আসবে তাদের কাছে সরাসরি আজাব।” সূত্র – সূরা কাহ্ফ : ৫৫।
মহানবী (সাঃ) ও পবিত্র আহলে বাইতের ইমামগণের (আঃ) হাদীসে সুন্নাত শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে –
ক) – কোরআন ব্যতীত যা কিছু মহানবী (সাঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের উন্নত জীবনের জন্য এনেছেন। এ অর্থে সুন্নাত একটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় সকল বিধান-ইবাদত ও লেনদেনসহ যাবতীয় বিধান (ফরজ, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরূহ, মুবাহ, চুক্তিসমূহ বৈধ বা অবৈধ হওয়া প্রভৃতি ) এর অন্তর্ভুক্ত।
খ) – হাদীসসমূহে সুন্নাত শব্দটি শুধু পছন্দনীয় ও মুস্তাহাব কর্মের ব্যাপারেও ব্যবহৃত হয়েছে।
যদি ‘সুন্নাত’ শব্দটি ‘কিতাব’ শব্দের পাশাপাশি আসে তার অর্থ হয় প্রথমটি
যেমন ইমাম সাদিক (আঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে -‘এমন কোন বিষয় নেই যার বিধান ‘কিতাব’ অথবা ‘সুন্নাতে’ বর্ণিত হয় নি।
সূত্র – উসুলে কাফী, ১ম খন্ড, পৃ. ১৭৬ / কিতবু ফাজলুল ইলম / বাবুর রাদ ইলাল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ, হাদীস নং ৪।
* যেসব রেওয়ায়েতে সুন্নাত ও বিদআত শব্দ পাশাপাশি এসেছে তাতেও সুন্নাত এ প্রথম অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
হাদীস সমূহে ‘সুন্নাত’ শব্দটি দ্বিতীয় অর্থেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
যেমন হাদীসে এসেছে- السواک هو من السنّة و مطهرة للفم ‘মিসওয়াক একটি সুন্নাত।
মুখবিবরকে পরিচ্ছন্ন রাখে।’ সূত্র – ওয়াসায়িলুশ শিয়া, ১ম খন্ড, পৃ. ৩৪৭।
অন্যত্র হাদীসে এসেছে – ‘এটি সুন্নাত বলে গণ্য যে, প্রতি শুক্রবারে তোমরা এক হাজার বার রাসূল (সাঃ) ও তাঁর আহলে বাইতের (আঃ) উপর দরূদ পড়বে।’ সূত্র-ওয়াসায়িলুশ শিয়া, ১ম খন্ড পৃ. ৩৪৭।
ফিকাহবিদদের পরিভাষায় সুন্নাত হল মহানবী (সাঃ) ও পবিত্র ইমামগনের (আঃ) বাণী (কাওল), কর্ম (ফেল) এবং নীরব সমর্থনের (তাকরীর) বিষয়সমূহ।
সকল মুসলমানই মহানবীর নিষ্পাপত্বে বিশ্বাস করে। তাই তাঁর বাণী, কর্ম ও নীরব সমর্থনের সকল বিষয়ই সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত।
যেহেতু বার ইমামীয়া শীয়ারা সকল নবী রাসুল এবং রাসূল (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণকেও (আঃ) পূতঃপবিত্র নিষ্পাপ বলে বিশ্বাস করে, সেহেতু তাঁদের বাণী (قول), কর্ম (فعل) এবং নীরব সমর্থনের (تقریر) বিষয়সমূহও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে।
রাসূলের (সাঃ) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণকেও (আঃ) পূতঃপবিত্র নিষ্পাপ বিষয় সুরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াত দেখুন —
“-নিশ্চয়ই আল্লাহ চান তোমাদের কাছ থেকে সমস্ত অপবিত্রতা দূরে রাখতে, হে আহলে বাইত, এবং তোমাদেরকে পবিত্র করতে পূর্ণ পবিত্রকরনের মাধ্যমে”। সুরা-আহযাব : ৩৩”।
কোন বিষয় সুন্নাতের অথবাা অন্তর্ভুক্ত কিনা তার জন্য দু’টি পথ রয়েছে –
(১) মুতওয়াতির (বহুল বর্ণিত) হওয়া এবং
(২) গাইরি মুতাওয়াতির (অপেক্ষাকৃত কম বর্ণিত এবং একক সূত্রে বর্ণিত হাদীসসমূহ)।
(১) – মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদীস হতে মানুষ নিশ্চিত বিশ্বাস লাভ করে যে, তা রাসূল (সাঃ) ও পবিত্র ইমামগণ (আঃ) হতে প্রকৃতই বর্ণিত হয়েছে।
তাই এরূপ হাদীসের বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
(২) – গাইরি মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ দু’ভাগে ভাগ করা যায়।
কখনও কখনও তার সঙ্গে এমন কিছু সমর্থক ইঙ্গিত থাকে যা মানুষকে হাদীসটি ইমাম (আঃ) হতে বর্ণিত হওয়াকেই প্রতিষ্ঠিত করে। এইরূপ সহায়ক উপাদান বিদ্যমান থাকলে সেরূপ হাদীসও নির্ভরযোগ্য ও পালনীয় বলে গণ্য।
কিন্তু যদি কোন হাদীসের সঙ্গে সমর্থনকারী ইঙ্গিত না থাকে ও হাদীসটি ইমাম (আঃ) হতে বর্ণিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকে তবে তা নিশ্চিত বর্ণিত বলা যায় না। বরং তা সম্ভাব্য বর্ণিত বলে গণ্য এবং এক্ষেত্রে যদি বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ (আদেল অর্থাৎ বার ইমামীয়া শীয়া নির্ভরযোগ্য রাবী ও বিশ্বস্ত হয় তবেই শুধু তা গ্রহণযোগ্য হবে।
শাব্দিক অর্থে বিদআত
বিদআতের শাব্দিক অর্থ হল অভূতপূর্ব ও নতুন কোন বিষয়।
এ শব্দটি শাব্দিক অর্থে সাধারণত কর্তার পূর্ণতা ও সৃষ্টিশীল বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিতবহ।
(بَدِیع) শব্দের অর্থ হল অভিনব ও নজীরবিহীন, এ শব্দটি যখন মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে
ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হল মহান আল্লাহ বিশ্বকে কোন পূর্ববর্তী নজীর ছাড়াই কারও সাহায্য ব্যতীত ও কোন প্রাথমিক উপাদান ভিন্নই সৃষ্টি করেছেন।
অর্থাৎ তিনি সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোন নমুনারই অনুসরণ করেন নি।
সূত্র-অভিধান গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য। আল আইন, মুফরাদাত লি রাগিব ইসফাহানী, লিসানুল আরাব প্রভৃতি, ‘بدع’ ধাতু।
বিদআত শব্দটি হাদীস গ্রন্থসমূহে সাধারণত শরীয়ত ও সুন্নাতের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ এমন কিছু করা যা ইসলামী শরীয়ত ও মহানবী (সাঃ) এর সুন্নাতের পরিপন্থী বলে গণ্য।
হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, অর্থাৎ ‘মানুষ দু’ধরনের : হয় শরীয়তের অনুসারী, নতুবা ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভাবক’। সূত্র-নাহজুল বালাগা, খুতবা নং ১৭৬।
অন্যত্র তিনি মহানবীর (সাঃ) নবুওয়াত সম্পর্কে বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ মহানবীর (সাঃ) মাধ্যমে মানব জাতিকে তাদের অজানা ও ভুলে যাওয়া শরীয়তের সাথে পরিচিত করিয়েছেন (অজানা বিধানসমূহকে তাদের সামনে প্রকাশ করেছেন) এবং পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহের মধ্যে যে বিদআত ও নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ সংযোজিত হয়েছিল তা হতে পরিশুদ্ধ করেছেন।’ সূত্র – প্রাগুক্ত, খুতবা নং ১৬১।
অন্যত্র আমীরুল মুমিনীন আলী (আঃ) বলেছেন, ‘এমন কোন বিদআতই (নব উদ্ভাবিত বিষয়ই) শরীয়তে প্রবেশ করে নি যার দ্বারা কোন না কোন সুন্নাত উপেক্ষিত ও পদদলিত না হয়েছে।’ সূত্র – প্রাগুক্ত, খুতবা নং ১৪৫।
পারিভাষিক অর্থে বিদআত
ফিকাহ্শাস্ত্রবিদ এবং মুহাদ্দিসগণ বিভিন্নভাবে বিদআতকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
এখানে আমরা এরূপ কয়েকটি সংজ্ঞা উপস্থাপন করছি-
১) – ইবনে রাজাব হাম্বালী বলেছেন, ‘বিদআত হলো নব উদ্ভাবিত বিষয় যার শরীয়তগত কোন ভিত্তি ও দলিল-প্রমাণ নেই। যদি কোন কিছুর শারয়ী দলিল থাকে তবে তা বিদআত বলে গণ্য নয়, যদিও শাব্দিক অর্থে তা বিদআত হয়ে থাকে।’ সূত্র-জামেয়ুল উলুম ওয়াল হিকাম, পৃ. ১৬০।
২) ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন, ‘বিদআত হল নব উদ্ভাবিত এমন বিষয় যার কোন শরীয়তগত প্রমাণ ও দলিল নেই। যদি শরীয়তে তার সপক্ষে কোন দলীল থাকে তবে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না।’ সূত্র-ফাতহুল বারী, ১৭তম খন্ড, পৃ. ৯।
৩) সাইয়্যেদ মুর্তাজা বলেছেন, ‘বিদআত হল ধর্মে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করে তাকে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত করা।’ সূত্র – ফাতহুল বারী, ১৭তম খন্ড, পৃ. ৯।
৪) আল্লামা মাজলিসী বলেছেন, ‘শরীয়তের ক্ষেত্রে বিদআত হল এমন বিষয় যা রাসূলের মৃত্যুর পর ধর্মে সংযোজন করা হয়েছে এবং এর সপক্ষে কোন প্রমাণ কোরআন ও সুন্নাহয় নেই। তবে তা সাধারণ কোন বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হলে বিদআত হবে না।’ সূত্র-বিহারুল আনওয়ার, ৭৪তম খন্ড, পৃ. ২০২।
হাদীসশাস্ত্র ও ফিকাহবিদদের বর্ণিত সংজ্ঞাসমূহ হতে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, বিদআত পারিভাষিক অর্থে ধর্মে কোরআন ও সুন্নাহর দলিল ব্যতিরেকে কোন নতুন বিধান সংযোজন বা বিয়োজন।
সুতরাং এমন কোন বিষয় (বাণী ও কর্ম) যার শরীয়তে পূর্ব নজীর নেই কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহ তার সপক্ষে দলিল-প্রমাণ রয়েছে অথবা তার ইঙ্গিত রয়েছে তবে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না।
যদিও মুজতাহিদ কোরআন ও সুন্নাহ হতে বিধান বের করতে ভুল করে থাকেন এবং হাদীস হতে সঠিক অর্থ উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়ে থাকেন। কারণ ইজতিহাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে শাস্তি দিবেন না।
এখানে উল্লেখ্য যে, বুদ্ধিবৃত্তিক অকাট্য বিধানও কোরআন ও সুন্নাহ কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে। অকাট্য বুদ্ধিবৃত্তি শরীয়তের বিধানের অন্যতম উৎস। যদি বুদ্ধিবৃত্তিক অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে কোন নতুন ধর্মীয় বিধান হস্তগত হয়, তবে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
বিদআত হারাম-
ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর সংযোজন বা বিয়োজন এ অর্থে বিদআত হারাম কর্ম বলে বিবেচিত। কারন শরীয়তের বিধান প্রণয়নের দায়িত্ব এককভাবে শুধুই আল্লাহর এবং তাঁর ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতীত শরীয়তের বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার কারও নেই।
পবিত্র কোরআন ধর্মীয় পুরোহিতদের অন্ধ অনুসরণের কারণে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং তাদের নিরঙ্কুশ কর্মবিধায়ক নির্ধারণ করার কারনে তীব্র নিন্দা করে বলেছে, “তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সংসারবিরাগী পুরোহিতদের নিজেদের পালনকর্তা বলে গ্রহণ করেছে।” সূত্র – সূরা তাওবা : ৩১।
যদিও ইহুদী আলেমরা তাঁদের অনুসারীদের নিজেদের উপাসনার দিকে আহ্বান করতেন না কিংবা তাঁদের অনুসারীরাও তাঁদের উপাসনা করত না। কিন্তু তাঁরা আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম এবং হারাম করা বস্তুকে হালাল বলে ঘোষণা করতেন। জনসাধারণ তা জানা সত্ত্বেও তাঁদের আনুগত্য করত ও তাঁদের কথা শুনত।
এ কারনেই এ আনুগত্যকে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিপালক গণ্যকারী বলেছেন যা প্রকৃতপক্ষে একরূপ উপাসনার নামান্তর।’
সূত্র-উসূলে কাফী, ৪র্থ খন্ড, কিতাবুল ঈমান ওয়াল কুফর, শিরক অধ্যায়/তাফসীরে তাবারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৮০।
খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, “আর বৈরাগ্য, তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল যা আল্লাহ তাদের জন্য নির্ধারণ করেন নি।” সূত্র-সূরা হাদীদ : ২৭।
বিদআতের উপাদানসমূহ-
হাদীস ও ফিকাহ্শাস্ত্রবিদদের উপস্থাপিত সংজ্ঞা হতে আমরা বলতে পারি,
বিদআতের তিনটি মৌলিক উপাদান রয়েছে —
১) যদি কেউ কোন বিধান বা আদেশকে ধর্মের উপর আরোপ করে অথবা কোন ধর্মীয় বিধিকে ধর্ম বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে তা বিদআত হবে।
যেমন যদি কেউ الصلوة خیرٌمن النوم- কে আজানের অংশ বলে ঘোষণা করে অথবা ‘মুতা বিবাহ’ যা রাসূলের যুগে বৈধ ঘোষিত ছিল তা অবৈধ বলে ঘোষণা করে।
মহান আল্লাহ মুশরিকদের এ জন্য তিরস্কার করেছেন যে, তারা তাঁর প্রতি মিথ্যা আরোপ করত।
“বলুন, আল্লাহ কি তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন নাকি তোমরা আল্লাহর উপর অন্যায় মিথ্যারোপ করে থাক।” সূত্র-সূরা ইউনুস : ৫৯।
অন্যত্র বলেছেন, “তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লিখে, অতঃপর বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। যাতে করে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে।” সূত্র-সূরা বাকারা : ৭৯।
২) বিদআত তখনই নিন্দনীয় ও হারাম হবে যখন তার প্রণয়নকারী তার নষ্ট ও বিকৃত বিশ্বাস অথবা শরীয়তে অবৈধ ঘোষিত কোন কর্ম সমাজে প্রচার করবে। কেবল এরূপ বিশ্বাস পোষণ বা গোপনে এরূপ কর্ম সম্পাদন কোন বিষয় বিদআত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
সহীহ আল মুসলিম নিজ সূত্রে মহানবী (সাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, ‘যে কেউ বিচ্যুতির দিকে আহ্বান করবে, তার গুনাহ ঐ সকল ব্যক্তির গুনাহের সমান যারা ঐ কাজে তাকে অনুসরণ করবে অবশ্য ঐ গুনাহের অনুসরণকারীদের পাপ হতে এতে কিছুই কম করা হবে না।’
সূত্র – সহীহ মুসলিম, ৮ম খন্ড, পৃ. ৬২, কিতাবুল ইলম। সহীহ আল বুখারী, ৯ম খন্ড, বাবুল ইতিসাম বিল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ (কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের অপরিহার্যতা অধ্যায়)।
এই হাদীসটিতে বিদআতের প্রতি আহ্বানের উল্লেখ রয়েছে যা তা প্রচারের দিকটির প্রতি ইশারা করছে।
৩) দ্বীনের মধ্যে উদ্ভাবিত বিষয়টি বিদআত হতে হলে এর কোরআন ও সুন্নাহ্ভিত্তিক কোন দলীল থাকা চলবে না। বিদআতের পারিভাষিক যে সংজ্ঞা আমরা উল্লেখ করেছি তা হতে স্পষ্ট বোঝা যায় কোন বিষয় বিদআত হওয়ার এটি অন্যতম শর্ত।
তাই দু’টি বিষয় বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয় –
ক) নব উদ্ভাবিত বিষয়টি অভিনব হলেও তার জন্য শরীয়তে বিশেষ দলীল বিদ্যমান রয়েছে, যদিও তা রাসূলের (সাঃ) জীবদ্দশায় না ঘটে থাকে। যেমন রাসূলের (সাঃ) জীবদ্দশায় মদীনায় কখনই ভূমিকম্প হয় নি। তাই ‘সালাতুল আয়াত’ যা ভীতিকর যে কোন কারণে পড়া হয় এক্ষেত্রে পড়া হয় নি। কিন্তু পরবর্তীতে কুফায় একবার ভূমিকম্প হলে ইবনে আব্বাস ভূমিকম্পের জন্য আয়াতের নামায পড়েন।
খ) এমন সকল বিষয় যা ইসলামের সর্বজনীন নীতির অধীন। ঐ সর্বজনীন বিধানই ইসলামী শরীয়তের রক্ষক ও নিশ্চয়তা দানকারী ঐ অর্থে যে, শরীয়তে বিদ্যমান সর্বজনীন দলীল সমূহই নতুন উদ্ভাবিত বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। এটিই ইসলামী বিধানের গতিশীলতায় টিকে থাকার রহস্য। এ কারণেই শরীয়তে উদ্ভূত নতুন কোন বিষয়কে এ নীতির ভিত্তিতে ধর্মীয় বলে ঘোষণা করা হলে যদি তার জন্য বিশেষ কোন বিধান শরীয়তে (কোরআন ও সুন্নাহতে) পাওয়া না যায়। কিন্তু তা ঐ সর্বজনীন দলিলসমূহের আওতায় পড়ে, তবে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না।
যেমন আল কোরআনের এ আয়াতটি -“তোমাদের শত্রুদের জন্য তোমাদের সাধ্যমত সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ।” সূত্র-সূরা আনফাল : ৬০।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে অবতীর্ণ হলেও যেহেতু এর আহ্বান সর্বজনীন ও সাধ্যমত সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার বিষয়টি বর্তমানে তৎকালীন সময়ের হতে ভিন্নরূপ। তাই এখন কোন মুসলিম দেশের উচিত হবে শত্রুদের সন্ত্রস্ত রাখতে আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম যেমন, ট্যাংক, যুদ্ধ বিমান, নৌবহর ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তুত রাখা।
সহীহ আল বুখারীতে রাসূল (সাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা লাভ করে এবং অন্যকে তা শিক্ষাদান করে।’
এখন যদি কেউ আধুনিক পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষা করে তবে তা ঐ নির্দেশের বহির্ভূত বলে গণ্য হবে না। কারণ তা এই সর্বজনীন নির্দেশের অন্তর্গত।
এ যুক্তিতে ইবনে তাইমিয়া ও ওয়াহাবীদের ঘোষিত অনেক বিষয়ই বিদাআতের সীমার বাইরে পড়বে। যেমন, কবরের উপর সৌধ নির্মাণ, আল্লাহর ওলীদের জন্য শোক পালন, তাঁদের জন্মদিনে উৎসব পালন ইত্যাদি।
কারণ এর সবগুলোই মহান আল্লাহর সর্বজনীন বিধান নিম্নোক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে -“এবং কেউ আল্লাহর নামযুক্ত বস্তুসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহ্ভীতি প্রসূত।”
সূত্র-সূরা হাজ্জ্ব : ৩২।
আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে বিদআতে হাসানাহ ও বিদআতে কাবিহ —
পূর্ববর্তী আলোচনা হতে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে বিদআত নিন্দনীয় (অপছন্দনীয়) একটি বিষয় এবং তা শরীয়তের বিধান মতে হারামের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং বিদআতকে হাসান (পছন্দনীয়) ও কাবিহ (অপছন্দনীয়) এ দু’ভাগে ভাগ করা সঠিক নয়।
কিন্তু আহলে সুন্নাতের আলেমদের মতে বিদআত ‘হাসান’ও ‘কাবিহ’এ দু’ভাগে বিভক্ত।
সূত্র-ইবনে আসির, আন নেহায়া, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৯।
বিদআতকে বৈধ ও অবৈধ অর্থাৎ পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় এরূপ বিভাজনের কোন বৈধতা নেই। কারণ বিদআত হল এমন বিষয় যার কোন শরীয়তগত ভিত্তি নেই অর্থাৎ এমন কোন বিধান সৃষ্টি করা যার উৎস কোরআন ও সুন্নাতে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বিদআত হচ্ছে এরূপ একটি বিধান নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় ও হারাম বলে গণ্য।
কোন বিষয় বা কর্মে মোবাহের কর্মগত বিধান-
যে ক্ষেত্রে শরীয়ত কোন বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করে নি সেক্ষেত্রে ঐ বিষয়টি বৈধ হওয়ার সার্বিক নীতি।
উসূলশাস্ত্রের পন্ডিতগণ বলে থাকেন, ‘কোন বিষয় বা কর্মের ক্ষেত্রে মূলনীতি হল বৈধতার নীতি অর্থাৎ যদি কোন বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা না থাকে তবে সেক্ষেত্রে বৈধতার অথবা স্বাধীনতার সর্বজনীন নীতি কার্যকর হবে।
যাকে উসূলশাস্ত্রের পরিভাষায় আসালাতুল হিল্লিয়াত (বৈধতার সর্বজনীন নীতি) অথবা আসালাতুল জাওয়ায বলা হয়। স্বাধীনতার সর্বজনীন নীতি (আসালাতুল বারায়াত) হতেও এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এ নীতি মতে যে বিষয়ে শরীয়তের প্রবর্তক করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়কে বর্ণনা করেন নি সে বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ বলে গণ্য অর্থাৎ সেক্ষেত্রে শরীয়তের অনুসারীদের স্বাধীনতা রয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেছেন- “আপনি বলে দিন; যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে, তন্মধ্যে আমি কোন হারাম খাদ্য পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্য যা সে ভক্ষণ করে। কিন্তু মৃত অথবা প্রবাহিত রক্ত অথবা শুকরের মাংস-এটা অপবিত্র ও অবৈধ। অথবা যবেহ করা জন্তু যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয় সে কারণে।”
সূত্র-সূরা আনআম : ১৪৫।
ডঃ ইউসুফ কারদ্বাভী বলেছেন, ‘ইসলাম সর্বপ্রথম যে নীতি প্রবর্তন করেছে তা হল সকল বস্তু ও কল্যাণকর বিষয়ের ক্ষেত্রে বৈধতার সর্বজনীন নীতি এবং যে বিষয়গুলো শরীয়তের প্রবর্তক সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেন নি, তার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা হতে মুক্তির নীতি।’
সূত্র – আল হালাল ওয়াল হারাম, পৃ . ৩৩-৩৫।
রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইতের (আঃ) অনুসৃত নীতিও সুন্নাত বলে গণ্য এবং তা শরীয়তের নীতি নির্ধারক।
এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোকে ওয়াহাবীরা এজন্য বিদআত বলে থাকে যে, তারা রাসূলের (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতের (আঃ) সুন্নাতকে শরীয়তের জন্য নীতি নির্ধারক ও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না।
অথচ সহীহ হাদীসসমূহে তাঁদের অনুসৃত কর্ম ও নীতিও শরীয়তের নির্ধারক ও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত ঘোষিত হয়েছে।
এখানে আমরা এরূপ কয়েকটি দলীলের প্রতি ইশারা করেছি যা ইতিমধ্যে আপনারা পড়েছেন। লেখাটি সংগৃহীত।#######
