বিয়ের উদ্দেশ্যসমূহ

by Syed Yesin Mehedi
বিয়ে হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন। এর বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ উপকার ও ভূমিকা রয়েছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:
১। পেরেশানি ও আশ্রয়হীনতা হতে মুক্তি: যে মানুষ বিয়ে-শাদি করেননি তিনি নীড় বিহীন কবুতরের মত। তিনি বিয়ে-শাদির মাধ্যমে নিজের গৃহ, নীড় ও আশ্রয়স্থল খুঁজে পান। তিনি জীবনের একজন সঙ্গিনী, সহচরী, গোপনভেদের রক্ষাকারিনী, সমব্যথিনী, প্রতিরক্ষাকারিনী এবং সহযোগিনী লাভ করেন।
২। জৈবিক চাহিদার সন্তুষ্টি লাভ: মানবসত্তার মাঝে জৈবিক চাহিদা, একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মূল্যবান সহজাত প্রবণতা। এই কারণে, একজন স্ত্রীর প্রয়োজন রয়েছে যার নিকট হতে একটি নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশে, প্রয়োজনীয় মুহূর্তে উপকৃত হবেন ও স্বাদ উপভোগ করবেন। লিঙ্গগত সহজাত প্রবণতার সঠিক সন্তুষ্টি একটি প্রাকৃতিক প্রয়োজন এবং তার উত্তর দেয়া জরুরি। অন্যথা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নেতিবাচক ফলাফল টেনে আনতে পারে। যারা বিয়ে-শাদি করতে অস্বীকৃতি জানান তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
৩। বংশধরের ধারাবাহিকতা লাভ: বিয়ে-শাদির ফলে সন্তানসন্ততির জন্ম হয় যা পারিবারিক ভিত্তি সুদৃঢ় এবং স্বামী-স্ত্রীর প্রশান্তি ও মনোরঞ্জনের কারণ হয়। এই কারণেই কুরআন ও হাদীসেও বিয়ে-শাদির ব্যাপারে বহুবিধ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ কুরআনে বলছেন: আর আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে এই যে, তোমাদের জন্যে তোমাদের নিজেদের শ্রেণী হতেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন যাতে তাদের সঙ্গে তোমরা আনন্দ উপভোগ করতে পার এবং ..।
ইসলামের সম্মানিত নবি (সা.) বলেন: ইসলামে এমন কোনো ভিত্তিই প্রতিষ্ঠিত হয়নি যা বিবাহ হতে শ্রেয়তর।
অপর এক স্থানে তিনি বলেন: যে কেউই আমার সুন্নতের অনুসরণ করতে চাইলে তাকে অবশ্যই বিবাহ করতে হবে। বিবাহের মাধ্যমে সন্তান জন্মদান করবে (এবং মুসলমানদের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটাবে) যাতে আমি কিয়ামত দিবসে তোমাদের আধিক্যতার মাধ্যমে অপর উম্মতদের উপর গর্ব করতে পারি।
আমিরুল মোমেনিন (আ.) বলেন: তোমরা বিবাহ কর, কেননা তা আল্লাহর রসুলের (সা.) সুন্নত।
ইমাম রেজা (আ.) বলেন: কোনো কেউ এমন কোনো উপকারই অর্জন করতে পারে না যা উপযুক্ত স্ত্রী থেকে শ্রেয়তর হতে পারে। এমনই একজন স্ত্রী যে, যখন তার দিকে তার স্বামী দৃষ্টি দিবে তখন আনন্দিত হবে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেকে ও স্বামীর অর্থকে সংরক্ষণ করবে।
আমরা এ যাবৎ যা কিছু আলোচনা করলাম তা হল বিবাহের বস্তুগত ও পশুসুলভ অবদান ও উপকার। কেননা পশুরাও এই উপকারগুলোর কতক দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকে। এই ধরনের উপকারসমূহকে, মানুষ হওয়ার দৃষ্টিকোণ হতে মানুষের বিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্য বলা যেতে পারে না। মানুষ এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আসেনি যে, সে কিছু সময় যাবৎ পানাহার করবে, ঘুমাবে এবং যৌন কামনা চরিতার্থ করবে ও স্বাদ উপভোগ করবে; অতঃপর মৃত্যুবরণ করতঃ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষের পদমর্যাদা, এই সব বিষয়ের অনেক ঊর্ধ্বে। মানুষ আগমন করেছেন যাতে জ্ঞান, সৎকর্ম ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে স্বীয় আত্মাকে লালনপালন করবেন এবং মানবতার পূর্ণতা ও সঠিক পথের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যাতে বিশ্বের প্রতিপালকের নৈকট্য অর্জন করতে পারেন। মানুষ এমনই এক সত্তা যিনি আত্মার পরিশুদ্ধতা ও সংশোধন, চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব ও উন্নত নৈতিক গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে এবং খারাপ আচরণসমূহ হতে বিরত থেকে এমনই এক উচ্চ স্তরে আসীন হবেন যে, ফেরেস্তারাও সেই স্তরে পৌঁছতে পারেন না। মানুষ চিরন্তন এক সত্তা, আর এ জগতে এসেছেন যাতে নবিগণের পথনির্দেশনার মাধ্যমে এবং ধর্মীয় আইন-কানুন ও কর্মসূচী বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিশ্চিত করেন এবং পরজগতে স্রষ্টার পাশে চিরন্তন আনন্দ ও আরামে জীবন যাপন করেন।
সুতরাং, মানুষের বিবাহের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে এই কর্মসূচীর মধ্যে অনুসন্ধান করা উচিত। একজন ধার্মিক লোকের বিবাহের উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, তিনি স্বীয় স্ত্রীর সাহায্য ও সহযোগিতায় স্বীয় আত্মাকে পাপ, খারাপ কাজ ও কুচরিত্র হতে বিরত রাখবেন এবং সৎকর্ম ও উন্নত নৈতিক গুণাবলী দ্বারা লালনপালন করবেন যাতে মানবতা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উচ্চ পর্যায়ে আসীন হতে পারেন। এই কারণে, এরূপ গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়ার জন্যে একজন উপযুক্ত ও ভালো স্ত্রী থাকা জরুরি।
দুইজন মোমিন মানুষ যারা বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করেন তারা সখ্যতা, প্রেম-ভালোবাসা, প্রশান্তি ও বৈধ জৈবিক সফলতা লাভ করে থাকেন। ফলে বিচ্যুতি, অবৈধ কামোপভোগ, পাপাচার ও বিপদজনক মাদকাসক্তের কেন্দ্রসমূহে গমন, ভবঘুরে ও ধ্বংসকারী নৈশ গল্পগুজবের আসর হতে নিরাপদে থাকবেন। এই কারণেই, সম্মানিত রসুল ও পবিত্র ইমামগণ (আ.) বিবাহের ব্যাপারে ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছেন।
আল্লাহর রসুল (সা.) বলেন: ‘কেউ বিবাহ করলে সে যেন নিজের অর্ধেক ধর্মকে রক্ষা করল।’
ইমাম সাদেক (আ.) বলেন: ‘অবিবাহিত লোকের সত্তর রাকাত নামাজের চেয়ে বিবাহিত লোকের দুই রাকাত নামাজই উত্তম।’
ধার্মিক ও সফল স্ত্রীর উপস্থিতি, দায়িত্ব বাস্তবায়ন, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব অনুসারে আমল, হারাম ও মকরুসমূহ পরিত্যাগ, উন্নত নৈতিক গুণাবলী দ্বারা সজ্জিত হওয়া এবং দুশ্চরিত্র হতে বিরত থাকার ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই ধার্মিক হন এবং প্রতিপালন ও আত্মার পরিশুদ্ধতার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তাহলে এই দুরূহ পথ অতিক্রমের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পরস্পরের প্রতিবন্ধকই হবেন না, বরং পরস্পরের সহযোগী ও উৎসাহদাতাও হবেন। আল্লাহর পথের একজন মুজাহিদ কি স্বীয় স্ত্রীর অনুমোদন ও সম্মতি ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে ভালোভাবে যুদ্ধ করতে ও বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারবেন? মানুষ কি নিজ স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া আয়-উপার্জন, জীবিকা অর্জন, শরয়ী ও চারিত্রিক যাবতীয় বিষয়কে মেনে চলতে পারবেন? আর্থিক ওয়াজিব অধিকার প্রদান করতে পারবেন? অপব্যয় ও অপচয় হতে বিরত থেকে স্বীয় জরুরি খরচপাতির অতিরিক্ত অংশকে জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারবেন?
ধার্মিক ও মোমিন ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে কল্যাণ ও সংশোধনের প্রতি আহব্বান জানান। আর বেপরওয়া ও দুশ্চরিত্রবান লোক স্বীয় স্ত্রীকে পাপাচার ও দুশ্চরিত্রের প্রতি টানে এবং মানবতার পবিত্র উদ্দেশ্য হতে দূরীভূত করে। এই কারণে, স্বামী ও স্ত্রীর প্রতি গুরুত্ব সহকারে বলা হয়েছে যে, তারা যেন যুগল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবাহের সময় ঈমান, ধার্মিকতা ও চরিত্রকে মৌলিক শর্ত নির্ধারণ করেন।
ইসলামের সম্মানিত নবি (সা.) বলেন: মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোনো মুসলমান লোকের জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণকে একত্রিত করতে চাইলে, তাকে একটি বিনয়ী অন্তর, একটি স্মরণকারী  এবং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণকারী একখানা দেহ দান করি। আর এমন একজন মোমেনা স্ত্রী তাকে দান করি যাকে সে দেখলেই আনন্দিত হয় এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার মাল ও নিজের আত্মার সংরক্ষণ করে।’
জনৈক লোক আল্লাহর রসুলকে (সা.) সবিনয়ে বললেন: ‘আমার একজন স্ত্রী রয়েছে, আমি গৃহে প্রবেশকালে সে আমাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসে, আর আমি গৃহ হতে বাইরে যাবার কালে সে আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানায়। আমাকে দুঃখভারাক্রান্ত দেখলে সে আমার মনোরঞ্জনের জন্যে বলে, ‘তুমি যদি খাদ্য ও আহারের জন্যে চিন্তাভাবনা কর, তাহলে বিষন্ন  হয়ো না! কেননা, আল্লাহ হচ্ছেন আহারের দায়িত্বশীল। আর যদি পরকালের চিন্তাভাবনা কর, তাহলে আল্লাহ যেন তোমার চিন্তাভাবনা ও গুরুত্বারোপকে আরও অধিক করেন!’ তখন আল্লাহর রসুল (সা.) বললেন: ‘এই পৃথিবীতে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি ও কর্মীবৃন্দ রয়েছেন; আর এই নারী হচ্ছেন আল্লাহর সেই কর্মীবৃন্দের সদস্যা। এই ধরনের স্ত্রীই একজন শহিদের অর্ধেক বিনিময় পাবেন।’
আমিরুল মোমেনিনেরও (আ.) এরূপ মহৎ উদ্দেশ্য দৃষ্টিতে ছিল। কেননা তিনি হজরত যাহরার (আ.) বিষয়ে বলেন: ‘আল্লাহর আনুগত্যের পথে সর্বোত্তম সাহায্য।’
ইতিহাসে এরূপ উল্লেখ হয়েছে যে, হজরত আলি ও হজরত যাহরার (আ.) বিবাহ উৎসবের পরের দিন আল্লাহর রসুল (সা.) তাঁদেরকে মোবারকবাদ দেয়ার জন্যে ও হালহকিকত জিজ্ঞাসা করার জন্যে তাঁদের গৃহে গমন করেন। হজরত আলিকে (আ.) জিজ্ঞাসা করেন: ‘তোমার স্ত্রীর ব্যবহার কেমন দেখলে?’ তিনি বলেন: ‘আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে হজরত যাহরাকে সর্বোত্তম সহযোগিনী হিসেবে পেয়েছি।’ অতঃপর তিনি (সা.) হজরত যাহরাকে জিজ্ঞাসা করেন: ‘তোমার স্বামীর ব্যবহার কেমন দেখলে?’ তিনি বলেন: ‘সর্বোত্তম স্বামী।’
আমিরুল মোমেনিন (আ.) এই ছোট্ট বাক্যটিতে, একদিকে উপযুক্ত স্ত্রী ও ইসলামের দৃষ্টান্তকে পরিচিত করিয়েছেন এবং অপরদিকে বিবাহের মৌলিক ও প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বর্ণনা করেছেন।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔