এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন যে, যখন বলা হয় সূরা সাফ্ফের তিরস্কারমূলক বর্ণনায় মু’মিনদের প্রতি সম্বোধন করা হয়েছে, তখন এটা মু’মিনদের জন্য মন্দ নয়। কেননা আল কুরআনের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে প্রশিক্ষণ ও সংশোধন। কুরআনের লক্ষ্য এমন নয় যে, শুধু মু’মিনদেরকে বলবে তোমরা অনেক ভাল, তোমাদের কোন দোষ নেই কিংবা ঢালাওভাবে মু’মিনদের দোষত্রুটিকে আঁড়াল করবে; এমনটি মোটেও কাম্য নয়। বরং একটি সমাজের পথপ্রদর্শকের উচিত একজন দায়িত্ববান শিক্ষক ও মুরুব্বির ভূমিকা পালন করা তথা সমাজের লোকদের ভাল কিংবা মন্দ দিকগুলো যথাযথভাবে তাদের সম্মুখে তুলে ধরা। আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিরক্ষা যুদ্ধের ‘ফাতহুল মুবীন’( ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আট বছরের (১৯৮০-১৯৮৭ সন পর্যন্ত ) প্রতিরক্ষা যুদ্ধের অন্যতম বীরত্বব্যঞ্জক অভিযানের নাম ‘ফাতহুল মুবীন’ অভিযান। এ অভিযান ১৯৮২ সনের এপ্রিল মাসে ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চল আন্দিমিশক ও দেজফুলে ইরানের সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। এ ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে ইরানের সামরিক বাহিনী ব্যাপক সাফল্য লাভে সক্ষম হয়; যা প্রতিরক্ষা যুদ্ধের মোড়কে ইরানের অনুকুলে নিয়ে আসে এবং একই সাথে ইরান দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক মহলে উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সফলতা অর্জন করে। এ অভিযানে ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের দেশের ২৪ হাজার বর্গ কি:মি: ভূ-খন্ড হানাদার ইরাকি বাহিনীর হাত থেকে দখলমুক্ত করে, শত্রæপক্ষের উল্লেখযোগ্য অস্ত্রশস্ত্র বিশেষ করে ৩২০টি যুদ্ধ ট্যাঙ্ক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, ১৫ হাজারের অধিক শত্রু সেনাকে বন্দি এবং তাদের সামরিক সরঞ্জমাদির ব্যাপক ক্ষতিসাধনে সক্ষম হয়। )
অভিযানের সময় প্রত্যক্ষ করেছি যে, যখন এ অভিযানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক সাহসিকতা ও ত্যাগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়, তখন ইমাম খোমেনী (রহ.) -যিনি সব সময় প্রতিরক্ষা যুদ্ধের লড়াকু সৈনিকদের প্রতি ছিলেন সদয় ও স্নেহশীল- যোদ্ধাদের প্রতি সতর্ক করে বলেন: এ বিজয় যেন তোমাদেরকে অহংকার ও অহংবোধের শিকার না করে। অর্থাৎ তিনি সাথে সাথে একটি সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর ব্যাধিসমূহের অন্যতম সেদিকে ইশারা করেছেন। সমাজের পথপ্রদর্শকের করণীয় হচ্ছে মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করা এবং সমাজের মানুষ যেন এক্ষেত্রে মোটেও উদ্বিগ্ন ও মনঃক্ষুণ না হয় যে, সমাজের নেতা ও পথপ্রদর্শক তাদের দোষ-ত্রুটিগুলোকে ধরে দিচ্ছেন এবং তাদেরকে দূর্বলতা ও বিচ্যুতির অতল গহবর থেকে সাবধান ও সতর্ক করছেন; বরং এজন্য তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। কেননা একজন রাহবার বা পথপ্রদর্শকের অপরিহার্য দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের মানুষের হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে তাদের দোষ-ত্রুটি ও দূর্বলতাসমূহকে যথাযথভাবে তাদের সম্মুখে তুলে ধরা। এ কারণে আলোচ্য আয়াতে মু’মিনদের প্রতি সম্বোধন করা হয়েছে ও সেখানে তাদের দূর্বলতাসমূহকে তুলে ধরা হয়েছে এবং অনুরূপ ধারাবাহিকতায় সূরার সমাপ্তি ঘটেছে।
