ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে ৬১ হিজরির ১০ই মুহাররম (আশুরা) এক গভীর শোকাবহ দিন। এদিন কারবালা প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) প্রিয় দৌহিত্র এবং হযরত আলী ও হযরত ফাতিমার (আ.) সন্তান ইমাম হোসেন (আ.) এবং তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর উমাইয়া শাসক ‘ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার’ প্রতিক্রিয়া ইতিহাসে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে, ইমাম হোসেনের (আ.) শাহাদাতের পর ইয়াযিদের আনন্দ, উল্লাস এবং বিজয়োৎসবের বর্ণনা বহু প্রাচীন ইসলামী ইতিহাসগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণনার তারতম্যও রয়েছে। তাই এ বিষয়টি ঐতিহাসিক সূত্র, বর্ণনাকারীদের অবস্থান এবং গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পর্যালোচনা করা জরুরি।
কারবালা ট্র্যাজেডি
ইয়াযিদ ক্ষমতায় আরোহণের পর মুসলিম সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট থেকে জোরপূর্বক আনুগত্য (বাইআত) গ্রহণ করতে চায়। অন্যরা তার আকাঙ্খা পূরণ করলেও হযরত ইমাম হোসেন (আ.) ইয়াজিদের অন্যায় ও অবৈধ শাসনের প্রতি সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানান। আর এরই ফলস্বরূপ তিনি মদীনা থেকে মক্কা হয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা করেন। কিন্তু কারবালায় তাঁকে অবরুদ্ধ করা হয় এবং অবশেষে ১০ই মুহাররমে তাঁকে ও তাঁর অল্পসংখ্যক সঙ্গীকে শহীদ করা হয়।
শাহাদাতের সংবাদ দামেস্কে পৌঁছানো
কারবালার যুদ্ধের পর শহীদদের মাথা এবং বন্দী আহলে বাইতকে (আ.) দামেস্কে ইয়াযিদের দরবারে পাঠানো হয়। বহু ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, ইয়াযিদ এ সংবাদে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং বিজয়ের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন আচরণ করে।
ইয়াযিদের আনন্দ প্রকাশের ধরন ও বর্ণনা
বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ইমাম হোসেনের (আ.) পবিত্র মস্তক ইয়াযিদের সামনে নিয়ে যাওয়া হলে সে একটি বেতের লাঠি কিংবা ছড়ি দিয়ে ইমামের (আ.) ঠোঁট ও দাঁতে আঘাত করতে থাকে। উপস্থিত সাহাবিদের কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করেন। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রসুলের (সা.) সাহাবি হযরত আবু বারযা আসলামি ইয়াযিদকে বলেন: “আমি নিজ চোখে দেখেছি, আল্লাহর রসুল (সা.) হোসেনের ঠোঁটে চুম্বন করেছেন। তাহলে তুমি কীভাবে সেখানে লাঠির আঘাত করছ বা মারছ?!”
আরও বর্ণিত আছে যে, হযরত আনাস ইবনে মালেকও একই ধরনের আপত্তি জানান।
অনেক প্রাচীন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ইয়াযিদ তখন (ইমাম হোসেনের দাঁতে-ঠোঁটে আঘাতকালে) জাহেলি যুগের কবি ইবনে যেবা’রা রচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করছিল যার অর্থ এরূপ:
“বদরের যুদ্ধে নিহত আমার পূর্বপুরুষরা যদি আজ উপস্থিত থাকত তাহলে তারা আনন্দে উল্লাস করত এবং বলত, হে ইয়াযিদ! তোমার হাত ধন্য।”
এ কবিতার আরও একটি বিখ্যাত অংশ এরূপ:
“বানু হাশিম ক্ষমতা নিয়ে খেলেছেন; কোনো ওহি অবতীর্ণ হয়নি, কোনো সংবাদও আসেনি।
বানি আহমাদ যা করেছেন তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে না পারলে আমি খিন্দিফ বংশের লোকই নই!!”
এই পংক্তিগুলোর মাধ্যমে ইয়াযিদের অন্তর্নিহিত মানসিকতা ও তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটেছে। তার পূর্বপুরুষরা কাফির-মুশরিক থাকা অবস্থায় আল্লাহর রসুলের (সা.) বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিহত হয়েছিল, কিন্তু সে বাহ্যিকভাবে একজন মুসলিম ঘরের সন্তান হয়েও ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির পদে বসে বলছে যে, তার পূর্বপুরুষদের বদলা নেবে! একইভাবে সে আল্লাহর রসুলের (সা.) রেসালত তথা নবুওতকে অস্বীকার করছে!! কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়ার পরও সে এটিকে অস্বীকার করছে!!! তাহলে আপনি কি তাকে মুসলিম বলতে পারেন?!
তার দরবারে আনন্দোৎসব
বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ হয়েছে, দামেস্কে বিজয়োৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। শহর সাজানো হয়, লোকজনকে অভিনন্দন জানাতে আহ্বান করা হয় এবং বন্দীদের জনসমক্ষে আনা হয়। তবে এসব বিবরণের বিশদ বর্ণনা সব ঐতিহাসিক গ্রন্থে সমানভাবে পাওয়া যায় না। এসবের জন্যে ‘মাক্তাল’ বিষয়ক বইগুলিও দেখা যেতে পারে।
পরে ইয়াযিদের অবস্থান
অল্প পরেই জনমতের প্রতিক্রিয়া দেখে ইয়াযিদ প্রকাশ্যে কারবালার হত্যাকা-ের দায় ‘উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের’ উপর চাপানোর চেষ্টা করে এবং দাবি করে যে, সে এতদূর পরিস্থিতি গড়াতে চায়নি। তবে বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন, যেহেতু ইবনে যিয়াদ ইয়াযিদের নিযুক্ত গভর্নর ছিল এবং তাঁর নির্দেশনাতেই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তাই রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় ইয়াযিদের উপরই বর্তায়।
ঐতিহাসিক সূত্রসমূহ
ইয়াযিদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন গ্রন্থের উপর নির্ভর করেন। এর মধ্যে নিম্নোক্তগুলো উল্লেখযোগ্য:
তাবারী প্রণীত তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলুক।
ইবনুল আসীর প্রণীত আল কামিল ফিত্তারীখ।
বালাযুরী প্রণীত আনসাবুল আশরাফ।
ইবনে কাসীর প্রণীত আল বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া।
ইবনুল জাওযী প্রণীত আর-রাদ্দু আলা আল-মুতাআসসিব আল-আনিদ প্রভৃতি।
উল্লেখ্য, এসব গ্রন্থে ঘটনাবলির উপস্থাপনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো সূত্র ইয়াযিদের আনন্দ প্রকাশের বর্ণনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, আবার কোনো কোনো সূত্র তার পরবর্তী অনুশোচনার দাবিও করেছে। আধুনিক ইতিহাস গবেষণায় তাই বর্ণনাগুলোর সনদ, প্রেক্ষাপট ও পারস্পরিক তুলনামূলক বিশ্লেষণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মুসলিম উম্মাহর প্রতিক্রিয়া
কারবালার ঘটনা মুসলিম সমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেক সাহাবি, তাবেয়ী এবং পরবর্তী আলেম এই হত্যাকা-কে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নিন্দনীয় বলে অভিহিত করেছেন। পরবর্তীকালে মদিনাবাসীর বিদ্রোহ (হাররার ঘটনা), মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইরের প্রতিরোধ এবং উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনের পেছনেও কারবালার ঘটনার গভীর প্রভাব ছিল।
উপসংহার
ইমাম হোসেনের (আ.) শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে সত্য, ন্যায় ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ইয়াযিদের আনন্দ প্রকাশ, বিজয়সূচক কবিতা আবৃত্তি এবং দরবারে তার আচরণ সম্পর্কে বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণনা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কিছু সূত্রে পরবর্তী সময়ে তার অনুশোচনার দাবিও লিপিবদ্ধ হয়েছে। ইতিহাসের এই অধ্যায় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎসের নির্ভরযোগ্যতা, সনদ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে মুসলিম ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ একমত যে, কারবালার ঘটনা ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি যার স্মৃতি যুগে যুগে ন্যায়, সত্য ও আত্মত্যাগের অনন্য শিক্ষা বহন করে আসছে।
32
আগের পোস্ট
