পবিত্র কুরআনে যেসব দাম্ভিকতা ও অহংবোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তম্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধন-সম্পদ ও পদমর্যাদার দাম্ভিকতা। অতীতকাল থেকেই একশ্রেণীর সম্পদশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্থদের সম্মুখে নিজেদের প্রাচুর্যের দম্ভ প্রকাশ করত। এ কারণে আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই যে, যখন নিঃস্ব ও পীড়িতরা নবী-রাসূলগণের (আ.) রেসালত ও মতাদর্শের মধ্যে নিজেদের সম্মান ও অধিকার ফিরে পেত, তখন তারা তাঁদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত। পক্ষান্তরে, ধন-সম্পদ ও পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিরা দাম্ভিকতার বশবর্তী হয়ে এবং নিজেদের গোঁড়ামি মানসিকতার কারণে নবী-রাসূলদের (আ.) প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা তো দূরের কথা বরং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করত। যেমনভাবে হযরত নূহের (আ.) সময় তাঁর গোত্রের দাম্ভিক ব্যক্তিরা এহেন মানসিকতার বশবর্তী হয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, “তারা বলল, ‘আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব যেক্ষেত্রে কেবল হীন ও নিম্নশ্রেণীর লোকেরাই তোমার অনুসরণ করছে?’ সে (নূহ) বলল, ‘আমি কি জানি তারা কী করত? তাদের হিসাব-নিকাশ তো কেবল আমার প্রতিপালকের দায়িত্বে; যদি তোমরা বোঝ! আমি তো মু’মিনদের বিতাড়নকারী নই। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।” (সূরা শুয়ারা : ১১১-১১৫)
আল্লাহর নবী এখানে তাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, মানুষের ধন-সম্পদ কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি আমার নিকট কোন গুরুত্ব রাখে না; বরং সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তাদের তীব্র আকাংখাই এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কাজেই তাদেরকে আমি কোন অবস্থাতে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারব না। কেননা, আমার রেসালতের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি আহব্বান জানান এবং এ লক্ষ্যে তাদেরকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দান করা।
আরও এক ধরনের গোঁড়ামি মানসিকতা হচ্ছে নিজের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত অহংবোধের বশবর্তী হওয়া; মানুষ যখন নিজের মধ্যে উত্তরোত্তর শক্তি ও ক্ষমতা অনুভব করে তখন সে নিজেকে এক অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতাবান হিসেবে মনে করতে শুরু করে। যেমনভাবে পবিত্র কুরআনে ফিরাউন সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, “ফিরাউন তার সম্প্রদায়কে আহব্বান করে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমিই কি মিশরের এবং এই নদীগুলোর যা আমার পাদদেশে প্রবাহিত মালিক নই? তোমরা কি দেখ না?” (সূরা যুখরুফ : ৫১) অর্থাৎ, আমি মিশর এবং মিশরে বিদ্যমান যাবতীয় ধন-সম্পত্তির একচ্ছত্র অধিপতি। অতঃপর ফেরাউন হযরত মূসার (আ.) তুলনায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে তাচ্ছিল্য ও দম্ভোক্তির স্বরে বলে: “আমি কি সে ব্যক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নই যে নিম্ন শ্রেণীর মানুষ? এবং সে স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে না?” (প্রাগুক্ত : ৫২) এখানে ফিরাউন নিজের প্রাচুর্য ও ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ করে হযরত মূসাকে (আ.) নিঃস্ব ও নি¤œশ্রেণীর অভিহিত করেছে। ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত মূসার (আ.) বাচনভঙ্গি স্পষ্ট ছিল না। এ কারণে আল্লাহ যখন তাকে ফিরাউনের সাথে কথোপকথনের আদেশ দেন, তখন তিনি নিজ ভ্রাতা হযরত হারুনকে সহায়তাকারী হিসেবে সাথে রাখার আবেদন প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, “আমার ভাই হারূন আমার অপেক্ষা অধিক সাবলিল ভাষার অধিকারী। সুতরাং, তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে আমার সঙ্গে প্রেরণ কর।” (সূরা কাসাস : ৩৪)
ফিরাউন হযরত মূসাকে (আ.) হেয় করার উদ্দেশ্যে আরও বলে: “তবে কেন তার ওপর স্বর্ণ-বলয় অবতীর্ণ করা হয় নি অথবা তার সাথে কেন দলবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণ এল না?” (সূরা যুখরুফ : ৫৩) যেহেতু প্রভাব-প্রতিপত্তি আর পার্থিব ধন-সম্পদ ছিল ফিরাউনের নিকট যোগ্যতা ও ক্ষমতার মানদন্ড, সেহেতু সে সব কিছুকেই এ মানদন্ড বিচার করেছে। আর এভাবেই সে নিজের গোত্রকে প্ররোচিত ও বিভ্রান্ত করেছে। সে তাদেরকে নিজের আনুগত্য ও দাসত্ব স্বীকার করতে বাধ্য করেছে। ফিরাউনের প্রতি তাদের আনুগত্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা তাকে প্রভূ হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কুরআনের ভাষায়, “বস্তুত ফিরাউন তার সম্প্রদায়কে হতবুদ্ধি করে দিল, ফলে তারা তার আনুগত্য স্বীকার করে নিল। নিশ্চয় তারা অবাধ্য সম্প্রদায় ছিল।” (প্রাগুক্ত : ৫৪)
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ফিরাউন হযরত মূসার (আ.) সাথে নিজের তুলনার ক্ষেত্রে জ্ঞান, বিচক্ষণতা, মহানুভবতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা কিংবা অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলিকে আদৌ মানদÐ হিসেবে তুলে ধরে নি; বরং সে শুধুমাত্র পার্থিব ধন-সম্পদ এবং বাহ্যিক চাকচিক্য ও ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার দাপটের দম্ভ দেখিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করেছে। যা তার দাম্ভিকতা, অহংবোধ এবং গোঁড়ামি মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আর তাই পরিণতিতে এহেন একগুঁয়েমি মানসিকতার কারণেই তার লজ্জাজনক পতন ঘটেছিল। কাজেই ইসলাম মানুষকে সর্বাবস্থায় আত্মঅহমিকা ও গোঁড়ামি মনোভাব পরিহার এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য ও ন্যায়কে গ্রহণের আদেশ দিয়েছে।
অবশ্য আমাদের প্রচলিত সমাজেও এমন নজির অহরহ দেখা যায়। এমন অনেক ধনাঢ্য, প্রতিপত্তি, ক্ষমতাবান ও তথাকথিত নেতা রয়েছেন, যারা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাবের চাকচিক্যে আত্মনিবিষ্ট হয়ে অহংকারে ফুসে ওঠে। আর এ অহংকারের বশবর্তী হয়ে তারা চারিপাশের মানুষদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং নিজেদের গোঁড়ামি মানসিকতার প্রকাশ ঘটায়। তারা নিজেদের মধ্যে কোনরূপ শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা মানবিক ও নৈতিক বৈশিষ্ট্যাবলির লেশমাত্র না থাকা সত্তে ও শুধুমাত্র প্রভাব ও প্রতিপত্তির কারণে একদিকে অন্যদের উপর খবরদারি করে এবং অপরদিকে আশা করে সমাজের লোকেরা তাদেরকে প্রতিনিয়ত সমীহ করে চলবে।
663
