১। মানুষের সাধারণ বিবেক তাকে বাধ্যবাধকতায় বিশ্বাস করতে বাধা দেয় : যদিও ঐশী দার্শনিক ও পণ্ডিতগণ মানুষের ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা সম্পর্কে অনেক আলোচনা ও দলিল উপস্থাপন করেছেন, তথাপি বিষয়টিকে সহজ করার জন্য স্পষ্ট দলিলকে বেছে নেয়া হয়েছে। আর তা হচ্ছে বিশ্বের সকল জ্ঞানী মানুষের সাধারণ বিবেক। ব্যাথা হল: আমরা যত কিছুই অস্বীকার করি না কেন এ বিষয়টিকে কোনক্রমেই অস্বীকার করতে পারি না যে, প্রতিটি মনুষ্যসমাজে, আর সে সমাজ একত্ববাদী সমাজ হোক আর বজ্রবাদী সমাজই হোক না কেন সেখানে অবশ্যই আইন প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আর আমাদের সাধারণ বিবেক বলে দেয় যে, প্রত্যেকেরই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া দরকার। সুতরাং, যদি কেউ আইন অমান্য করে তাহলে তাকে অবশ্যই শান্তি ভোগ করতে হবে। মোটকথা, আইনের শাসনে জনগণের নৈতিক এবং সার্বিক দায়িত্ব হচ্ছে আইন মেনে চলা। অনুরূপভাবে যারা আইন অমান্য করবে তাদেরকে উপযুক্ত শান্তি দেয়া। এ নিয়ম সকল সভ্য সমাজেই বিদ্যমান। শুধুমাত্র হিংস্র জাতিরা এ আইনকে অমান্য করত। এ বিষয়টিকেই বিশ্বের মানুষের সার্বিক বিবেক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটাই প্রমাণ করে যে, মানুষের ইচ্ছা এবং স্বাধীনতা রয়েছে। এটা কি সম্ভব যে, মানুষ তার ইচ্ছা এবং কাজের ক্ষেত্রে বাধ্য থাকবে এবং কোনপ্রকার স্বাধীনতা থাকবে না, অথচ সে আইনের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবে? আর যখন সে কোন আইন লঙ্ঘন করবে তখন তাকে বিচারের কাঠগড়ায় পাড় করানো হবে এবং বলা হবে কেন এটা করনি? আর কেন ওটা করেছ? এভাবে তার অবাধ্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হবে অথবা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। এটা ঠিক ঐ রকম যে, আমরা পাহাড় থেকে খসে পড়া পাথরে বেধে দুর্ঘটনার স্বীকার হয়ে মৃত মানুষদের জন্য দায়ি হিসেবে পাথরকে আদালতে নিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো। কেননা পাথর একটি জড়বস্তু এবং তার কোন স্বাধীনতা এবং ইচ্ছাশক্তি থাকে না। এটা সত্য যে, পাথরের সাথে মানুষের অনেক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি মানুষের কাছ থেকে তার ইচ্ছাশক্তিকে কেড়ে নেই তাহলে এদিক থেকে তার সাথে পাথরের আর কোন পার্থক্য থাকে না। আর এ দু’টোই অন্য কোন শক্তির। দ্বারা পরিচালিত হয়ে কোন কিছু ঘটিয়ে বসে। পাথর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে পাহাড় থেকে খসে নীচে পড়ে যায়। আর মানুষ বাধ্য হয়ে কোন অঘটন ঘটায়। সুতরাং দু’জনই নিজের ইচ্ছার বাইরে এ কাজ করেছে। অতএব, একজনকে শাস্তি দেয়া হবে আর একজনকে ছেড়ে দেয়া হবে এটাতো ঠিক নয়? আমরা এখন দুই রাস্তার মোড়ে অবস্থান করছি। এ জন্য হয় আমাদেরকে বিশ্বের সকল বিবেকবান মানুষের সার্বিক বিবেক ও বিশ্বে প্রচলিত আইন-কানুন পদ্ধতি ও বিচারবিভাগকে অস্বীকার করতে হবে। নতুবা বাধ্যবাধকতায় বিশ্বাসীদের আকিদাকে অস্বীকার করতে হবে। আমাদের সুস্থ বিবেক এটাই বলে যে, দ্বিতীয়টাকে অস্বীকার করতে হবে। আশ্চর্যের বিষয় হল যারা বাধ্যবাধকতায় বিশ্বাসী তারা নিজেরাও যখন বাস্তব জীবনে প্রবেশ করে তখন তারাও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে যায়। কেননা, যখনই কেউ তাদের কোন ক্ষতি করে বা তার অধিকার খর্ব করে তখন সে তার উপর রাগান্বিত হয় এবং তার বিরুদ্ধে আদালাতে নালিশ করে। দোষীকে শাস্তি না দেয়া পর্যন্ত সে কিন্তু তর্জন-গর্জন করতেই থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের যদি কোন স্বাধীনতা না-ই থাকবে তাহলে কেন আমরা তার বিরুদ্ধে নালিশ করি, কেন তাকে তিরস্কার করি, আর কেনই বা এত তর্জন-গর্জন করি?। হ্যাঁ, বিশ্বের এই সার্বিক বিবেকই সবথেকে বড় ও জলন্ত প্রমাণ যে, মানুষ তার নিজের ভিতরেও ইচ্ছাশক্তি এবং স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। আর এ বিশ্বাসের প্রতি অনুগত আছে আর এটাকে না মেনে সে একটি দিনও জীবনযাপন করতে পারে না।
২। বাধ্যবাধকতার যুক্তির সাথে মাজহাবের যুক্তির দ্বন্দ্ব : উপরোক্ত আলোচনায় আমরা বাধ্যবাধকতার সাথে বিশ্বের জ্ঞানীদের সাধারণ বিবেকের দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। তার মধ্যে যারা ধর্মে বিশ্বাস করে তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিল আর যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না তারাও অন্তর্ভুক্ত আছে। কিন্তু ধর্মীয় চিন্তাধারার দৃষ্টিকোন থেকেও যে বাধ্যবাধকতায় বিশ্বাস একটি ভ্রান্ত ধারণা তা প্রমাণিত হয়। কেননা, বাধ্যবাধকতায় বিশ্বাসের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের কোন মিল নেই। আর যদি এ মতবাদকে মেনে নেয়া হয় তাহলে ইসলামের সকল কর্মসূচী বাতিল বলে গণ্য হবে। কারণ এটা কোনভাবেই সম্ভব নয় যে, আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতায় বিশ্বাস রাখব আবার বাধ্যবাধকতায়ও বিশ্বাস করব। এটা কিভাবে সম্ভব যে, আল্লাহ নিজেই আমাদেরকে কোন খারাপ কাজ করতে বাধ্য করবেন, আবার সেই খারাপ কাজ করার জন্য আমাদেরকে শাস্তি দেবেন এবং বলবেন কেন এমন কাজ করলে? এটা কোন যুক্তিই মেনে নিতে পারে না এবং তা কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। সুতরাং, বাধ্যবাধকতাকে মেনে নিলে সওয়াব, পুরস্কার, শান্তি, আযাব, বেহেশত, দোযখ এগুলোর কোন মানেই থাকে না। অনুরূপভাবে কিয়ামতের ময়দানে আমলনামা, প্রশ্ন, হিসেব এবং মন্দ লোকদের তিরস্কার আর ভাল লোকদের প্রশংসারও কোন অর্থ থাকে না। কেননা, এ বিশ্বাস অনুযায়ী যারা ভাল কাজ করে তারা স্বইচ্ছায় করে না আর যারা খারাপ কাজ করে তারাও স্বইচ্ছায় করে না। সুতরাং পুরস্কার ও তিরস্কারের কোন মানেই হয় না।
এছাড়াও আমরা ধর্মীয় আলোচনার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দায়িত্বশীলতার কথা বলি। আর যে বিশ্বাসে কোন প্রকার স্বাধীনতা এবং ইচ্ছাশক্তি নেই সেখানে দায়িত্বশীলতা ও দায়িত্ববোধের কোন মানেই হয় না। সুতরাং, যার হাত এমনিতেই কাঁপে তাকে কি বলা যায় যে, ভাই তোমার হাত কাঁপিও না? অনুরূপভাবে, যে উপর থেকে নিচের দিকে দ্রুত গতিতে পড়ে যাচ্ছে তাকে কি বলা যায় যে, থাম? আর একারণেই আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন: বাধ্যবাধকতায় বিশ্বাসীরা এবং মুর্তিপুজারিরা হচ্ছে শয়তানের দল। এটা হচ্ছে শয়তানের ভাই, আল্লাহর দুশমন এবং শয়তানের দলের কথা। (উসূলে কাফি ১ম খণ্ড, পৃঃ ১১৯)
