লেখক : মোহাম্মাদ নাজির হোসাইন, গবেষক ও বিশ্লেষক
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা:) : “নিশ্চয়ই হোসেইন হেদায়াতের নূর ও নাজাতের তরী।”
[মীযান আল-হিকমাহ, হাদীস-৪৩৩, সাফিনাতুল বিহার, খন্ড-১, মদিনাতুল মায়াজিয, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-৫২, খাসায়িসুল হোসেইনিয়া, পৃষ্ঠা-৪৫, নাসিখুত্ তাওয়ারিখ, পৃষ্ঠা-৫৭]
পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “আর তোমাদের মধ্যে এমন এক দল থাকা আবশ্যক যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে, এরাই হল সফলকাম।” (সূরা-আলে-ইমরান, আয়াত-১০৪)
পবিত্র কোরআনের ঘোষণাঃ “কোন মোমিনকে যে ব্যক্তি জেনেশুনে হত্যা করবে তার শাস্তি জাহান্নাম সে সেখানে চিরস্থায়ী হবে তার উপর আল্লাহর লা‘নত (অভিসম্পাত) এবং তার জন্য বড় ধরনের আযাব তৈরি করে রেখেছেন।” (সূরা-নিসা, আয়াত-৯৩)
আরো এরশাদ হচ্ছেঃ “কেউ কাউকে প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ কিংবা দুনিয়ায় ফ্যাসাদ সৃষ্টি করার কারণ ছাড়া হত্যা করলো সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করলো, আর যে কেউ কারো জীবন রক্ষা করলো সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করলো।” (সূরা-মায়দা, আয়াত-৩২)
কেন ইমাম হোসাইন (আঃ) সম্পর্কে আমাদের জানা দরকার? কারবালার যুদ্ধ সম্পর্কে জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ? ইমাম হোসাইন (আঃ) কেবলমাত্র মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং বিশ্বমানবতার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, কারণ তিনি সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উম্মতই, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সন্তানকে হত্যা করলো (!)? এ জিজ্ঞাসা সব যুগের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের। আর এ ধরনের প্রশ্ন জাগাটাও খুব স্বাভাবিক। কারণ, ইমাম হোসাইনের (আঃ) মর্মান্তিক শাহাদাত এক বিষাদময় ঘটনা কিংবা আল্লাহর পথে চরম আত্মত্যাগের এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্তই শুধু নয়, এ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে বড়ই অদ্ভুত মনে হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর তিরোধানের মাত্র ৫০ বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই এ হত্যাকান্ড চালানো হয়!।
কুরআন-হাদীসের আলোকে হযরত ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াজিদের শাসনের সূচনালগ্ন থেকেই এই অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। তাই ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম বলেন : আমি ক্ষমতা বা যশের লোভে কিংবা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য বিদ্রোহ করছি না। আমি আমার নানার উন্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই। আমি চাই সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং অসৎ কাজে বাধা দিতে, সর্বোপরি, আমার নানা এবং পিতা ইমাম আলী আলাইহিস সালাম যে পথে চলেছেন সে পথেই চলতে চাই (মাকতালু খাওয়ারেযমী ১/১৮৮)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের মাত্র ৫০ বছর পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাহাবীর জীবদ্দশায় কিভাবে ইয়াজিদ লানাতুল্লাহি আলাইহি’র বিচ্যুত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো? কিভাবেই বা মহানবীর প্রিয় দৌহিত্র নির্মমভাবে শহীদ হলেন। কেনই বা এই মহামানবের এতো বড় আত্মত্যাগের ঘটনাটির ওপর নানা ধুম্রজাল তৈরি করে আজো তাঁকে মজলুম করে রাখা হয়েছে?
‘কারবালা’ হক্ব ও বাতিলের উভয়ের মধ্যে একটি রেখা টেনে দিয়েছে। কারবালার ঘটনা ধনী-দরিদ্র বংশীয় পদমর্যাদা, দেশী-বিদেশী, ছোট বড় সবাইকে মানবতার মানদন্ডে পরিমাপ করে দেখিয়েছে। কারবালা জুলুমের বিষদাত ভাঙার মাধ্যমে জালিমরা কেয়ামত পর্যন্ত অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তার রণকৌশলের আয়োজন অর্থ, অস্ত্র কিংবা মানুষজনকে জমা করে নেননি।
ইমাম হোসেইন আলাইহিস সালামের বিপ্লব কোন দেশ, এলাকা, ভূখন্ড কিংবা কোন মাজহাব দল বা গোষ্ঠির জন্য ছিল না, মূলত: ছিল, বিশ্বের সকল স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য হোক সে মুসলিম, হিন্দু, শিখ বা খৃষ্টান। বরং তাঁর সংগ্রাম ছিল ন্যায়নীতি সত্যের অনুশীলন, সত্যের অনুশাসন ও মানবতার ঐক্য প্রতিষ্ঠা বিশ্বের সকল ‘মজলুমের হোসেইন’, যাদের অন্তরে বিন্দু পরিমাণ মানবতা আছে, তারা ইমাম হোসেইন আলাইহিস সালামের পক্ষে কথা বলবেন আর ইমাম হোসেইন আলাইহিস সালামের দুঃখে দুঃখিত হবেন আর জালিম বনি উম্মাইয়ার জারজ সন্তান ইয়াজিদের জালিম বাহিনীর উপর অভিসম্পাত পাঠাবে, আর যাদের মনে মানবতা নাই তারা জালিম ইয়াজিদের দালালি করবেন এটাই স্বাভাবিক। ইমাম হোসেইন আলাইহিস সালাম হচ্ছেন জান্নাতের সর্দার, আর ইয়াজিদ হচ্ছে জান্নাতের সর্দারের হত্যাকারী জাহান্নামের ইন্ধন, এখন আপনি কাকে ভালবাসবেন ও অনুসরণ করবেন? জান্নাত কে? নাকি জাহান্নাম কে? আপনার ইচ্ছা!
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন : ‘একদিকে মা ফাতেমার বীর দুলাল হোসাইনী সেনা আর এক দিকে যত তখত বিলাসি লোভী ইয়াজিদের কেনা”।
দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আজও সেই মাবিয়া ইয়াজিদের কোরআন ও ইসলাম বিরোধী রাজতন্ত্রী তখত বিলাসি লোভী নাসিবী (অর্থাৎ আহলে বাইত-বিদ্বেষী) রাজতন্ত্রী দরবারী মুল্লারা আল্লাহর মসজিদে বসে আল্লাহর দুষমন তাদের রাজতন্ত্রী নেতা ইয়াজিদকে নির্দোষ প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন! রাজতন্ত্র কে হালাল করার জন্য।
“রাজা-বাদশারা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন তারা সে জনপদকে বিনাশ করে দেয় এবং সেখানকার সম্মানিত অধিবাসীদের অপদস্ত করে এবং এরাও এরূপই করবে।” (সূরা-নামল, আয়াত-৩৪)
“আর তাদের অধিকাংশ সত্যকে অপছন্দ করে।” (সূরা-মুমিনুন, আয়াত-৭০);
“আর তাদের মধ্যে একদল সত্যকে জেনেও গোপন করে।” (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৪৬);
“তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনে শুনে সত্যকে গোপন করো না।” (সূরা-বাকারা, আয়াত-৪২)
“আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করে তারাই হবে জাহান্নামী, সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে”। (সূরা-বাকারা, আয়াত-৩৯)
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন : ন্যায়বিচার ও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে অস্ত্র ছাড়াই বিজয় আসতে পারে, জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে ঠিক যেভাবে ইমাম হোসাইন মানবতার নেতা, ইমাম হোসাইন শীতলতম হৃদয়কেও উষ্ণ করেন। ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ আধ্যাত্মিক স্বাধীনতাকে তুলে ধরে।
বিশ্ব বিখ্যাত আলেম আল্লামা শাহ আব্দুল আজিজ মোহাদ্দেসে দেহ্লাভী (রহ:) তার গ্রন্থ সিররুস শাহাদাতাইন-এ লিখেছেন: “জাহির তো ইয়ে কাতলে ইবনে বাতুল হে” “পার গওর কিজিয়ে তো ইয়ে কাতলে রাসুল হে”
অর্থাৎ (কারবালার ময়দানে আশুরার দিন এজিদী মুনাফেকরা) খাতুনে জান্নাতের সন্তান, ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম কে শহিদ করেনি, যদি অন্তরের মানবতার চোখ দিয়ে দেখলে সত্যিকার অর্থে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম কেই শহিদ করা হয়েছে।
ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম বিশ্বের মানবতার নেতা ও ঐক্যের প্রতিক তার বড় প্রমাণ হচ্ছে: আমরা যখন কোন দেশে ভ্রমণ করি তখন সেই দেশের একটা পতাকা থাকে সেই পতাকা আমরা আমাদের দেশে ব্যবহার করি না কিন্তু হোসাইনী পতাকা আপনি যে কোন দেশে উত্তোলন করতে পারেন, আর এই হোসাইনী পতাকার ছায়ায় একটু বিশ্রাম নিয়ে দেখুন না ঐশ্বরীক ও আত্মিক পবিত্রতা সাধিত হবে এবং শীতলতম হৃদয়কেও উষ্ণ করবে। এবং এমন এক আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রবেশ করবেন তখন আপনি নিজেকে প্রশ্ন করবেন আমি কে? আমি কেন এই পৃথিবিতে এসেছি? আমার দায়িত্ব কি? আমি কি পেলাম, এটা উদ্দেশ্য নয়, আমি কি দিলাম, এটাই উদ্দেশ্য। নিজেকে জানো ! ! ! তুমি কে?
সত্য মিথ্যার এ দ্বন্দ্ব চিরন্তন।
আদিকাল হতে অদ্যাবধি সংঘটিত যত ঘটনা আমাদেরকে ব্যথিত করে তম্মধ্যে কারবালায় আশুরার ঘটনা সবচেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক। এ ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ’তাআলা একদলকে জান্নাতের সর্দার বানিয়েছেন এবং অন্যদলকে জাহান্নামের হকদার করেছেন। সত্য মিথ্যার এ দ্বন্দ্ব চিরন্তন। এভাবে সত্যের বিজয় ও মিথ্যার পরাজয়ও চিরন্তন। এছাড়া এ ঘটনা ভবিষ্যত সকলের জন্য একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়েছে যে, মুখে কালিমা শাহাদাত পড়া আর অন্তরে মহানবী (সাঃ) ও তাঁর বংশধর আহলে বাইতের সাথে বিদ্বেষ রাখা মুসলমানের পরিচয় বহন করে না। মহানবী (সাঃ)’র বংশধর আহলে বাইতের ওপর কোন উম্মত এভাবে নিষ্ঠুর বর্বর আচরণ করতে পারে তা কল্পনা করতেও বুক কেঁপে উঠে। সম্মানিত পাঠক! ৬১ হিজরীতে মহানবী (সাঃ)’র বংশধর আহলে বাইতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে বনি উম্মাইয়ার (আবু সুফিয়ান, মাবিয়ার) বংশধর ইয়াযিদ এবং তার দল পৃথিবীর ঘৃণিত মানুষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ১৪ শত বছর পরে আমরা এখনও এমন নামধারী মুসলমান দেখছি যারা কেবল মহানবী (সাঃ)’র বংশধর আহলে বাইতের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে ক্ষান্ত নয় বরং তারা স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার শান মান নিয়ে কটাক্ষ করতে দ্বিধাবোধ করে না। কারা একাজ করে কাউকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, এখন দু‘ভাগে বিভক্ত এক দল মহানবী (সাঃ) ও তাঁর বংশধর আহলে বাইতের স্মরণে সদা লিপ্ত। আরেক দল যারা মহানবী (সাঃ) ও তাঁর আহলে বাইতের সম্মানের কথা শুনলে ভ্রƒকুঞ্চিত করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্যিকার হোসাইনী ইসলামে কাদের অন্তর সমৃদ্ধ এবং কাদের অন্তর ইয়াযিদী ইসলামে ভরপুর অন্তরের চোখ খুলে তাকালেই দেখতে পাবেন। সময় এসেছে সঠিকভাবে যাচাই করে যারা হোসাইনী ইসলাম চর্চা করেন তাদের পক্ষ অবলম্বন করা। আল্লাহ আমাদের হোসাইনী পথে থাকার তাউফিক দান করুন।
মহানবী (সাঃ) এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি দুনিয়াতে যাকে ভালোবাসবে বা অনুসরণ করবে তার সাথে তার হাশর হবে”। সূত্রঃ-সহীহ্ মুসলিম, খঃ-৭, হাঃ-৬৪৭০, (ই, ফাঃ);
হযরত রাসূল (সাঃ) বলেন, “(শেষ বিচারের দিবসে) আমার শাফায়াত হবে মুসলিম উন্মাহর মধ্যে তাদের জন্য যারা আমার আহলে বাইতকে (অনুসরণ) মহব্বত করবে”। সূত্রঃ-খতীব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খঃ-২, পৃঃ-১৪৬; কানযুল উন্মাল, খঃ-৬, পৃঃ-২১৭; আল্লামা সুয়্যূতী, ইয়াহইয়া আল মাইয়্যিত, পৃঃ-৩৭।
কার সাথে নিজের হাশর করাতে চান?
হযরত রাসূল (সাঃ) ও তাঁর বংশধর আহলে বাইতের সাথে?
নাকি
আবু সুফিয়ান ও তার বংশধর ইয়াযিদের সাথে?
যার সাথে হাশরের ময়দানে থাকতে চান, তার দালালী করতে হবে ভাই।
কার দালালী করছেন আপনি? একটু ভেবে দেখেছেন কি?
সত্য খুঁজি, মিথ্যা বেচি, মিথ্যাই পুঁজি
আমরা সবাই সত্য খোঁজার চেষ্টা করি। অন্তত মুখে তাই বলি। সন্তানদের উপদেশ দিই মিথ্যা না বলতে। কিন্তু সত্য কোনটা? মিথ্যাই বা কোনটা? সত্যরূপী মিথ্যা কি আমরা চিহ্নিত করতে পারি? বৈশ্বিক প্রবণতা ও নানা বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা কিন্তু বলছে, আমাদের সত্য-মিথ্যা মাপার থার্মোমিটারে গলদ আছে। আমরা প্রকাশ্যে খুঁজি সত্য, গোপনে বেচি মিথ্যা। তাই হারিয়ে যাই সেই মিথ্যার রাজত্বেই।
যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে অতঃপর যা উত্তম তার অনুসরণ করে এরাই তারা যাদের আল্লাহ্ হেদায়েত করেছেন তারাই বুদ্ধিমান”। (সূরা-যুমার, আয়াত-১৮)
পরিশেষে এটাই আবেদন করতে চাই যদি পৃথিবীর সকল সম্প্রদায় ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম-এর নীতিকে গ্রহণ করে নেয় এবং এর উপর আমল করে তাহলে বিশ্বমানবতার সকল ঝগড়া ফ্যাসাদের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। ####
