আয়াতুল্লাহ শহীদ মোতাহারী (রহঃ)

by Rashed Hossain

একই ব্যক্তির মধ্যে বহুমুখী প্রতিভা, সততা ও ধার্মিকতা, যুগের চিন্তাগত এবং আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের যোগ্যতা খুব কমই দেখা যায়। যুগান্তকারী ইসলামী চিন্তাবিদ আয়াতুল্লাহ শহীদ মূর্তাজা মোতাহারী (রহঃ) ছিলেন এমনই একজন মহান আলেম এবং বিরল প্রতিভাসম্পন্ন মুসলিম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। উদ্ভাবনী ধারার আলেম, চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং গভীর অথচ সৃজনশীল বিশ্লেষক ও আধুনিক গবেষকদের জন্য তাকে পূর্ণাঙ্গ আদর্শ বলা যেতে পারে। অধ্যাপক মোতাহারী ছিলেন অসাধারণ মনীষাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ, ধার্মিক বা খোদাভীরু হাকিম বা বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, আল্লাহপ্রেমিক আরেফ এবং উঁচু পর্যায়ের দার্শনিক। তার লেখনীতেই এইসব মহান গুণ স্পষ্ট। আসলে আয়াতুল্লাহ শহীদ মূর্তাজা মোতাহারী (রহঃ)’ লেখনী ও বক্তৃতায় ঝরে পড়তো জ্ঞান, প্রজ্ঞা, খোদাপ্রেম ও ধর্মের প্রতি গভীর আন্তরিকতা বা মমত্ববোধ এবং নির্ভরযোগ্য, আকর্ষণীয় ও বিচিত্র তথ্যের অমূল্য মণি-মুক্তারাশি। তিনি নিজেই বলেছিলেন যে ইসলামী বিষয়গুলোর প্রতি তার গভীর আকর্ষণ ও মমত্ববোধ সৃষ্টি হয়েছিল ১৩ বছর বয়সে।

মানুষের মুক্তি বা সৌভাগ্য লাভের উপায় এবং ধর্মকে সঠিকভাবে চেনার প্রতি আল্লামা মোতাহারী (রহঃ)’র ব্যাপক গুরুত্ব তার লেখনী থেকেই স্পষ্ট। ইসলাম যে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত জীবন বা প্রকৃত প্রাণ সঞ্চার করে তা তিনি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও যুক্তিসহ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনের সূরা আনফালের ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আহ্বানে সাড়া দাও, যখন সে তোমাদের নবজীবনের দিকে আহ্বান করে… … ।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের প্রকৃত জীবন তথা সৌভাগ্য রয়েছে ইসলামকে জীবনের সবক্ষেত্রে বাস্তবায়নের মধ্যে। ইসলাম যে সৌভাগ্যের পথ দেখায় সেটাই স্থায়ী সৌভাগ্য। এ জন্যই আয়াতুল্লাহ শহীদ মূর্তাজা মোতাহারী (রহঃ) বলেছেন, ইসলামের সূর্য কখনও অস্তমিত হবে না। তার মতে, সৌভাগ্য ও প্রকৃত জীবনকে পেতে হলে মানুষের চিন্তা ও কাজে ইসলামকে বাস্তবায়িত করতে হবে। আল্লামা মোতাহারী (রহঃ)’র শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ সংক্রান্ত তার বক্তৃতার কিছু অংশের অনুবাদ আমরা এখানে তুলে ধরছিঃ

সামাজিক বিষয়গুলো অব্যাহত রাখার জন্য মানুষের ইচ্ছেগুলো বাস্তবায়িত হওয়া জরুরী। মানুষের ইচ্ছে বা চাহিদাগুলো দু ধরনেরহঃ প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক। যেমন, গবেষণা ও জ্ঞান অন্বেষণ মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা। চা ও ধুমপান একটি অস্বাভাবিক অভ্যাস এবং ইচ্ছে করলে মানুষ এ ধরনের অভ্যাস বা চাহিদা ত্যাগ করতে পারে। চিন্তাবিদ ও গবেষকরা মনে করেন, কেবল প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বিষয়গুলোই টিকে থাকে। তাই ইসলাম বা যে কোনো ধর্মকে টিকে থাকতে হলে এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বা চাহিদা থাকতে হবে, অথবা মানুষের চাহিদাগুলো পুরণের যোগ্যতা বা ক্ষমতা থাকতে হবে ধর্মের মধ্যে। ধর্ম যদি এ ব্যাপারে ব্যর্থ হয় তাহলে মানুষ এ ব্যাপারে বিকল্প কোনো আদর্শ বা ব্যবস্থাকে বেছে নেবে। মানুষের অগ্রগতির পথে পরিস্থিতি বা পরিবেশ বদলে গেলে এ কারণে অনেক কিছুই বদলে যায়। যেমন, বিদ্যুৎ আবিষ্কৃত হওয়ায় মানুষ মোমবাতি ও চেরাগ আর ব্যবহার করছে না। কিন্তু কোনো কোনো বিষয় কখনও পরিবর্তিত হয় না। ধর্ম হল এমনই এক বিষয়। কারণ, ধর্ম মানুষের এমন এক প্রকৃতিগত চাহিদা যে অন্য কোনো কিছুই এর স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প হতে পারে না। পবিত্র কোরআনের সূরা রূমে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, তুমি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ধর্মের প্রতি মনোনিবেশ কর বা ইসলাম ধর্মের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কর। এটা হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতি এবং তিনি মানুষকে এই প্রকৃতি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন।

আয়াতুল্লাহ শহীদ মূর্তাজা মোতাহারী (রহঃ) একই প্রসঙ্গে আরো বলেছেন, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন ভয় ও অজ্ঞতার কারণেই ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে। কারো কারে মতে ন্যায়বিচার ও শৃংখলার প্রতি আগ্রহই এর কারণ। অনেকে বলতেন, বিজ্ঞানের আরো উন্নতি ঘটতে থাকলে ধর্ম ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির পরও ধর্ম বিলুপ্ত হয় নি। বরং ধর্মের ভূমিকা ও অবদান এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং মানুষ বুঝতে পেরেছে যে ধর্ম বিলুপ্ত হবার মত বিষয় নয়। পশ্চিমা মনোবিজ্ঞানী ইয়ং ধর্মকে মানুষের জন্মগত বা সহজাত প্রকৃতির অংশ বলে অভিহিত করেছেন এবং মানুষ নিজের অজান্তেই ধর্মমুখী। “ধর্ম ও মন” শীর্ষক বইয়ে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেছেন, “আমাদের অনেক ইচ্ছা বা চাহিদা অবস্তুগত এবং ধর্মের মধ্যে রয়েছে নম্রতা, ভালবাসা, আন্তরিকতা, দয়া, ত্যাগ প্রভৃতি অবস্তুগত বিষয়। ধর্মীয়-মনোবৃত্তিগুলোর সাথে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না।”

ফরাসী লেখক ও চিকিৎসক এ্যালেক্সিস কার্ল প্রার্থনা বা এবাদত শীর্ষক বইয়ে মানুষের বিবেকের কথা উল্লেখ করেছেন যা মানুষকে নিজের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয় এবং মানুষকে ভুল-পথ ও সংকীর্ণ চিন্তা থেকে দূরে রাখে।

আল্লামা শহীদ মোতাহারী (রহঃ)’র মতে মানুষ ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকে ধর্মের মুখাপেক্ষী। রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয়কে যখন প্রশ্ন করা হয় ঈমান বা বিশ্বাস কি? তখন তিনি বলেছেন, বিশ্বাস হচ্ছে তা যা নিয়ে মানুষ জীবন যাপন করে এবং ঈমানই মানুষের জীবনের পুঁজি।
মানুষ তার কল্পনায় অসীমত্ব বা স্থায়ীত্ব নিয়ে ভাবে। মানুষ নিজেকে ও নিজের নামকে চিরস্থায়ী করতে চায়। যুদ্ধ ও অপরাধযজ্ঞগুলোর পেছনেও এ চিন্তা সক্রিয়। ধর্মই মানুষের অনুভূতিতে ভারসাম্য আনতে পারে এবং তাকে সঠিক পথ দেখাতে পারে। ভিক্টর হুগোর মতে,মানুষ যদি মনে করে যে এ জীবনের পর আর কোনো জীবন নেই, তাহলে জীবন তার কাছে অর্থহীন মনে হবে। ধর্ম মানুষকে এ অর্থহীনতা থেকে মুক্তি দেয়, তার দৃষ্টিকে করে প্রসারিত ও কাজে-কর্মে দেয় আনন্দ।

আয়াতুল্লাহ শহীদ মূর্তাজা মোতাহারী (রহঃ)’র মতে, ধর্মই আইন ও নৈতিকতার পৃষ্ঠপোষক। ধর্মবিহীন নৈতিকতার কোনো দৃঢ় ভিত্তি নেই বলে তিনি মনে করতেন। ন্যায়বিচার, সাম্য বা সমতা, মানবতা, সহমর্মিতা- এসবের ভিত্তি যদি ধর্ম না হয় তাহলে তা বাস্তবায়িত হবে না বলে আল্লামা শহীদ মোতাহারী (রহঃ) উল্লেখ করেছেন। এ্যালেক্সিস কার্লও এ বাস্তবতা স্বীকার করে বলেছেন, “বর্তমানে মানুষের মগজ বা বুদ্ধি অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার মন বা অন্তর দূর্বল হয়ে পড়েছে। একমাত্র ঈমানই অন্তরকে শক্তিশালী করে।”

উইল ডুরান্ট বলেছেন, ধর্মের রয়েছে শত প্রাণ। অন্য যে কোনো বিষয় একবার মরে গেলে তা চিরতরে বিলুপ্ত হয়। কিন্তু ধর্ম শত বার মারা গেলেও আবারও জীবন্ত হয়। এ কারণেই আল্লামা শহীদ মোতাহারী (রহঃ) বলেছেন, ধর্মের সূর্য কখনও নির্বাপিত হবে না। তার মতে, ধর্মের নামে কূসংস্কার ও অযৌক্তিক বিষয় চালু হলে ধর্মের অবনতি ঘটতে পারে। কিন্তু, পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষ ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারলে তারা দলে দলে এতে দীক্ষিত হবে।

সুত্রঃ (রেডিও তেহরান)

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔