কোরআন ও হাদিসের আলোকে নৈতিক চরিত্র

by Rashed Hossain

অনুবাদঃ মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।

আয়াতসমূহঃ

  • ১- উত্তম চরিত্রঃ “আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী” (সূরা আল-কলমঃ ৪)
  • ২- উত্তম কথাঃ “আমার বান্দাদেরকে বলে দিন, তারা যেন যা উত্তম এমন কথাই বলে” (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ৫৩)
  • ৩- উত্তম জবাবঃ “আর তোমাদেরকে যদি কেউ দোয়া করে, তাহলে তোমরাও তার জন্য দোয়া কর, তার চেয়ে উত্তম দোয়া অথবা তারই মত ফিরিয়ে বল।” (সূরা আন্-নিসাঃ ৮৬)
  • ৪- ঐ কথা বল যা তুমি নিজে আমল করঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা তা বল না, যা সম্পাদন কর না” (সূরা আছ-ছাফ্: ২)
  • ৫- নৈতিক চরিত্র বান্দাদের গুণঃ “এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন মান রক্ষার্থে ভদ্রভাবে চলে যায়।” (সূরা আল-ফুরকানঃ ৭২)

হাদীসসমূহঃ

  • ১- পরিপূর্ণতা ঈমানের চিহ্নহ্নঃ হযরত ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (আ.) বলেছেনঃ “নিঃসন্দেহে যার চরিত্র উত্তম তার ঈমানও পরিপূর্ণ।” (উসুলে কাফি, খন্ড ২, পৃ. ৯৯)
  • ২- উত্তম সৌন্দর্যঃ ইমাম হাসান (আ.) বলেছেনঃ “সৌন্দর্য হল উত্তম ও দয়ার্দ্রতা হল উত্তম চরিত্র।” (খিসাল, পৃ. ২৯, ওসায়েল, খন্ড ১২, পৃ. ১৫৩)
  • ৩- শ্রেষ্ঠ কর্মঃ নবী করীম (সা.) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন পরিমাপের সময় কারো কোন কর্ম উত্তম চরিত্রের অধিক শ্রেষ্ঠ হবে না।” (উসূলে কাফি, খন্ড ২, পৃ. ৯৯)
  • ৪- দীর্ঘায়ুর কারণঃ হযরত ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন ঃ “দয়ার্দ্রতা ও উত্তম চরিত্র নগরসমূহকে সমৃদ্ধশালী করে এবং আয়ু বৃদ্ধি করে।”(উসূলে কাফি, খন্ড ২, পৃ. ১০০)
  • ৫- সর্বোত্তম বন্ধুঃ হযরত আমিরুল মুমিনিন (আ.) বলেছেনঃ “উত্তম চরিত্রের মত শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও সাথী নেই।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১, পৃ. ৪২০)

বিশ্লেষণঃ মানুষকে তার নৈতিক চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে চেনা যায়। যার নৈতিক চরিত্র উত্তম হবে তার বন্ধু ও সাথী অধিক হবে। একারণে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে হেদায়েতের জন্য যেসব পথপ্রদর্শক পাঠিয়েছেন, তাঁদের সকলের নৈতিক চরিত্র ছিল সর্বোত্তম পর্যায়ের এবং মানুষ স্বীয় নৈতিক চরিত্রের মাধ্যমেই উচ্চ আসন পেয়ে থাকেন। আর উত্তম চরিত্র হল তার রিযিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ুর কারণ। অনর্থক ও বাজে কথা বলা ত্যাগ কর ও উত্তম চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হও, কারণ উত্তম সাথী হল নৈতিক চরিত্র। প্রত্যেক জায়গায় নৈতিক চরিত্রবান ব্যক্তিদেরকে মানুষ পছন্দ করেন।

আমাদের উচিৎ সর্বদা উত্তম চরিত্রের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা যেন তিনি মুহাম্মাদ (সা.) ও আলে মুহাম্মাদ (আ.)-এর অসিলায় আমাদেরকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তৌফিক দান করেন। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- ইমাম মুসা কাজেম (আ.)-এর নৈতিক চরিত্রঃ

শেখ মুফিদ (রহ.) ও কিছু আলেম উল্লেখ করেছেন যে, মদীনা শরীফে এক ব্যক্তি যে দ্বিতীয় খলিফার সন্তানদেরই কেউ ছিল, সে সর্বদা ইমাম মুসা কাজেম (আ.)কে কষ্ট দিত ও তাঁর সম্পর্কে কটুক্তি করত, আর যখন ইমাম (আ.) কে দেখত তখন হযরত আমিরুল মু‘মিনিন আলী (আ.)কে গালি দিত। এ কারণে ইমাম (আ.)-এর পরিবারের কিছু লোক বলল, আমাদেরকে অনুমতি দিলে ঐ পাপীকে হত্যা করতাম।

ইমাম (আ.) তাদেরকে কঠোরভাবে এ কাজ করতে নিষেধ করলেন এবং তাঁদেরকে ধমক দিয়ে প্রশ্ন করলেন ঐ ব্যক্তি কোথায়? বলা হল মদীনার অমুক দিকে ক্ষেতে কাজ করছে। হযরত (আ.) ঘোড়ায় চড়লেন এবং মদীনা থেকে তাকে দেখার জন্য রওনা হলেন।

যখন হযরত পৌঁছালেন তখন সে তার ক্ষেতে দাঁড়িয়ে ছিল। হযরত (আ.) ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় তার ক্ষেতের মধ্যে প্রবেশ করলেন। সে চিৎকার করে বলল, আমার ক্ষেত নষ্ট কর না আর এ পথ দিয়ে এসো না। হযরত (আ.) যেভাবে যাচ্ছিলেন যেতে লাগলেন, ঠিক তার নিকটে গিয়ে থেমে গেলেন এবং স্বাভাবিক অবস্থার নম্রতার সাথে কথা বললেন ও তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এই ক্ষেতে কত ব্যয় করেছ? সে বলল, একশ’ স্বর্ণমূদ্রা। ইমাম (আ.) বললেন, এ ক্ষেত থেকে কত আয় করবে বলে আশা কর? সে বলল, আমি অদৃশ্য সম্পর্কে জানি না। ইমাম (আ.) বললেন, আমি বলছি তুমি কত মুনাফার আশা করছ, সে বলল, আমি আশা করি দু’শত স্বর্ণমূদ্রার পরিমাণ।

অতঃপর ইমাম (আ.) একটি স্বর্ণমূদ্রার থলি বের করলেন যার মধ্যে তিনশ স্বর্ণমূদ্রা ছিল, সেগুলো তাকে প্রদান করলেন এবং বললেন, এগুলো নাও এবং তোমার ক্ষেতের ফসলগুলোও তোমার, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ঐ পরিমাণ রুজি দিবে যে পরিমাণ তুমি আশা করছ। ঐ ব্যক্তি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ইমাম (আ.)-এর কপালে চুক্ষা দিল এবং হযরত (আ.)কে অনুতাপের সাথে বলল, আমি আমার অপরাধের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। হযরত (আ.) মুচকি হেসে প্রত্যাবর্তন করলেন। পরে ঐ ব্যক্তিকে মসজিদে উপস্থিত লোকজন দেখল, যখন ঐ ব্যক্তির দৃষ্টি হযরত (আ.)এর ওপর পড়ল তখন সে বলতে লাগল, ‘আল্লাহ ভাল জানেন তিনি তাঁর রেসালাত তথা দায়িত্ব কাকে অর্পণ করবেন।’ তার সাথীরা তাকে বলল, তোমার কি হয়েছে, পূর্বে তো অন্য কিছু বলতে। বলল, তোমরা কি শুনেছ আমি যা বলেছি, তাহলে আবার শোন। এরপর সে ইমাম (আ.) কে দোয়া দিতে শুরু করল। তার সাথীরা তার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হল সেও তাদের সাথে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ল। অতঃপর হযরত (আ.) তাঁর সাথীদেরকে বললেন, কোন্ পন্থা উত্তম, যা তোমরা চেয়েছিলে সেটা না-কি আমি যে পন্থা অবলম্বন করেছি সেটা? আমি আমার দয়ার্দ্রতা ও উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে তাকে সংশোধন করেছি ও তার দোষ-ত্রুটি দূর করেছি। (ইহসানুল মাকাল, খন্ড ২, পৃ. ১৯)

২- মালেক আশতার (রহ.)-এর নৈতিক চরিত্রঃ

কথিত আছে যে, একদিন মালেক আশতার (রহ.) সাধারণ পোশাক পড়ে কুফার বাজার অতিক্রম করছিলেন। এক দোকানদার যখন তাঁকে দেখল তুচ্ছ ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল এবং ঘৃণায় তাঁর দিকে এক টুকরা পাথর নিক্ষেপ করল। মালেক আশতার (রহ.) ঐদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই করলেন না। কেউ এই দোকানদারকে বলল, হায়! তুমি এ কি করলে? তুমি কি জান কার দিকে পাথর নিক্ষেপ করেছো? সে বলল, না! লোকটি বলল, তিনি মালেক আশতার (রহ.), হযরত আমিরুল মু‘মিনিন (আ.)-এর এক ঘনিষ্ঠ সাহাবী।

ঐ দোকানদারের শরীর কেঁপে উঠল, সে মালেক আশতার (রহ.)-এর নিকট ক্ষমা চাওয়ার জন্য রওনা হল। সে দেখল, মালেক আশতার (রহ.) মসজিদে নামায পড়ছেন। যখন মালেক আশতার (রহ.) নামায সমাপ্ত করলেন তখন ঐ দোকানদার মালেক আশতার (রহ.)-এর পায়ে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে লাগল। মালেক আশতার (রহ.) বললেন, কোন সমস্যা নেই (ভয় পেয়ো না) আল্লাহর কসম! আমি মসজিদে শুধু তোমার জন্য এসেছি এবং আল্লাহর কাছে তোমার জন্যই ক্ষমা চেয়ে দোয়া করেছি। (আমালুল ওয়ায়েজিন, খন্ড ১, পৃ. ১২৩)।########

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔