মাওলানা মোঃ শহীদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা
আয়াতসমূহঃ
- কুরআনের দৃষ্টিতে পৃথিবীঃ “এ পার্থিব জীবন আমোদ-প্রমোদ ও ক্রীড়া-কৌতুক ভিন্ন কিছুই নয় এবং নিশ্চয় পরকালের গৃহই হল প্রকৃত জীবন যদি তারা জানত।” (সূরা আনকাবুতঃ ৬৪)
- পৃথিবী পরীক্ষার স্থানঃ “নিঃসন্দেহে আমি পৃথিবীস্থ সব কিছুকে পৃথিবীর জন্যে শোভা করেছি, যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভাল কাজ করে।” (সূরা কাহফঃ ৭)
- পৃথিবীর পুরস্কারঃ “যে কেউ দুনিয়ার কল্যাণ কামনা করবে, তার জেনে রাখা প্রয়োজন যে, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ আল্লাহরই নিকট রয়েছে। আর আল্লাহ সব কিছু শোনেন ও দেখেন।” (সূরা নিসাঃ ১৩৪)
- পৃথিবীকে ভালবাসাঃ “কখনও না, বরং তোমরা পার্থিব জীবনকে ভালবাস এবং পরকালকে উপেক্ষা কর।” (সূরা কিয়ামাহঃ ২০, ২১)
- পৃথিবীর জন্যে গর্ব করাঃ “তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক, সাজ-সজ্জা, পারস্পরিক অহমিকা এবং ধন ও জনের প্রাচুর্য ব্যতীত আর কিছু নয়, যেমন এক বৃষ্টির অবস্থা, যার সবুজ ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, এরপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণ দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটা হয়ে যায়। আর পরকালে আছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ বৈ কিছু নয়।” (সূরা হাদীদঃ ২০)
হাদীসসমূহঃ
- পৃথিবীকে ভালবাসাঃ ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “সকল খারাপ কাজের মূল হল পৃথিবীকে ভালবাসা।” (বিহারুল আনোয়ার, খন্ড ৭০, পৃ. ৭০)
- পৃথিবী অতিক্রমের স্থানঃ হযরত ঈসা (আ.) বলেছেনঃ “নিঃসন্দেহ দুনিয়া একটি সাঁকো সুতরাং ইহা অতিক্রম কর এবং তাকে সমৃদ্ধ কর না।” (খেসাল, পৃ. ৩৫)
- পৃথিবী মুমিনদের জন্য কারাগারঃ হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) বলেছেনঃ “পৃথিবী মুমিনদের জন্য কারাগার এবং মৃত্যু তার জন্য উপহার আর বেহেশত তার ঠিকানা।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১ পৃ. ৪৬৩)
- পৃথিবী ছায়া ও নিদ্রার ন্যায়ঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “পৃথিবী মেঘের ছায়া এবং একটি নিদ্রার ন্যায়।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১, পৃ. ৪৬৪)
- সুবিধা ভোগীঃ হযরত আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) বলেছেনঃ “সুবিধা ভোগী সে, যে পৃথিবীকে পরকালের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১, পৃ. ৪৬৫)
বিশ্লেষণঃ পৃথিবী ও তার অস্থায়িত্ব সম্পর্কে অসংখ্য উক্তি দেখা যায় এবং কুরআন মজীদ থেকে শুরু করে বিজ্ঞ চিন্তাবিদ পর্যন্ত সকলেই এর অস্থায়িত্ব ও আস্থাহীনতা সম্পর্কে আলোচনা করেছে। তবে আফসোসের ব্যাপার হল ইহা যত অবিশ্বস্ত লোকজন তত তারা তার জন্য পাগল। আর ইহা যত লোকজন থেকে দূরত্ব বজায় রাখে তত তার নিকটবর্তী হয়। মাওলায়ে কায়েনাত আলী (আ.) দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণ সতর্ক করেছেন এবং মানুষকে এর বিপদ সম্পর্কে অবগত করেছেন। দুনিয়ার উদাহরণ সাপের অনুরূপ ইহার বাইরের শরীর কোমল ও সূক্ষ্ম কিন্তু তার ভিতরে হত্যাকারীর এক বিষের ভান্ডার অবস্থিত। বিষয়টা হল এমন যে, এর প্রতি ভালবাসা তার মধ্যে থেকে সৃষ্টি হয় যা সাধারণতঃ প্রকাশ্য বিষয়ের উপর ত্যাগ করে থাকে তবে যিনি প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হবে সে কোন মূল্যেই তার প্রতি দৃষ্টি দিবে না। দুনিয়া একটি অস্তগমনোম্মুখ ছায়া। ছায়ার মধ্যে মানুষের নিরবতা প্রতিফলিত হয় কিন্তু ছায়ার মধ্যে কখনো স্থায়িত্ব হয় না। দুনিয়া ধোকাবাজ এবং ক্ষতিকারকও। দুনিয়া পরিবর্তনকারী এবং ক্ষণস্থায়ীও। দুনিয়ার সমাপ্তও ঘটে এবং ধ্বংসেও পরিণত হয়। দুনিয়া তৈরীকারী এবং বিধ্বস্তকারীও। যে শুধুমাত্র দুনিয়াকেই সবকিছু মনে করে সে ধ্বংস হলো আর যে দুনিয়ার মাধ্যমে পরকালকে চেনে এবং দুনিয়ায় থেকে সবকিছু পরকালের জন্যে করে সে সফলকাম ও ভাগ্যবান হবে।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি মুহাম্মাদ ও আলে মুহাম্মাদ (স.)-এর অসিলায় আমাদেরকে এই দুনিয়ায় নেক আমল করার তৌফিক দান করেন। (আমিন)
ঘটনাবলী:
১-হাতের মধ্যে রহস্যঃ জুলকারনাইন সেকেন্দার মৃত্যুকালে অসিয়ত করেছিল যখন আমার জানাজা উঠানো হবে তখন আমার দুই হাত কাফনের বাইরে রেখে দিবে, যারা দেখবে দেখুক। তার মৃত্যুর পর তার অসিয়ত অনুযায়ী আমল করে তার দুই হাত কাফনের বাইরে রেখে দেয়া হল। তার জানাজায় উপস্থিত সব লোকজন এ ব্যাপারে একে অপরের কাছে জিজ্ঞেস করছিল কিন্তু কারও জানা ছিল না এর কারণ কি? একজন বিজ্ঞ ও জ্ঞানী লোকের কাছে জিজ্ঞেস করা হলে, সে এর রহস্য উন্মোচন করে বললোঃ এই অসিয়তের উদ্দেশ্য হল আমাদের সবাইকে একথা জানতে হবে যে, মনোযোগ সহকারে দেখ সেকেন্দারের মত বিশাল সাম্রাজ্যের বাদশাও এই দুনিয়া থেকে শূন্য হাতে চলে যাচ্ছে, সে এই দুনিয়ার ধন-সম্পদ থেকে কিছুই নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছে না। (মাওজুয়ী দস্তানী, পৃ. ১৭৫)
২-হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথে সূঁচঃ যখন হযরত ঈসা (আ.)কে আসমানে তুেল নেওয়া হল, তখন তিনি হযরত জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে রওনা হয়েছিলেন। যখন তিনি প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসমান অতিক্রম করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন জিব্রাইল (আ.)-এর নিকট বার্তা পৌঁছালো। হযরত ঈসা (আ.)কে ওখানেই থামিয়ে দাও, সে এর থেকে ওপরে যেতে পারবে না। তাঁকে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করা দরকার, কারণ দুনিয়ার মালপত্র ও সম্পদ থেকে সে কিছু জিনিস সাথে নিয়ে যাচ্ছে। যখন পরীক্ষা করা হল তখন দেখা গেল তার জামার কলারের সাথে লাগানো ছিল একটি সূঁচ।
তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করা হলঃ আপনি এই সূঁচ কেন আপনার সাথে নিয়ে এসেছেন?
হযরত ঈসা (আ.) বললেনঃ আমি যখন এই সফরের জন্য রওনা হয়েছিলাম তখন আমি ভেবেছিলাম এমন না হয় রাস্তার মধ্যে আমার পোশাকের কোথাও ছিঁড়ে গেল আর আমি ছেঁড়া পোশাকসহ আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হব। এ কারণে সূঁচ সাথে নিয়ে এসেছি।
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বার্তা আসলোঃ আমার পয়গম্বার (আ.) যেহেতু একটি সূঁচ পরিমাণ দুনিয়ার ওপর ভরসা করেছে, এ কারণে তাকে ওপরের দিকে যেতে বাধা দেয়া হয়েছে এবং এই চতুর্থ আসমানে তাকে রাখা হবে। যদি সে এই সূঁচ সাথে না নিয়ে আসতো তাহলে তাঁর স্থান আল্লাহর আরশে হত। (মাওজুয়ী দস্তানী, পৃ. ১৮৩)###
