মুহাম্মাদি নূরের শুভ জন্মদিন

by Syed Tayeem Hossain

বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.)’র শুভ জন্মদিন। এই মহান ইমামের উদ্দেশে পেশ করছি অসংখ্য দরুদ ও সালাম। ইসলামী আইনসহ এই মহান ধর্মের নানা দিক ও জ্ঞানের সব শাখা বিকশিত হয়েছিল মহান ইমাম হযরত ইমাম জাফর আস সাদিক (আ.)’র মাধ্যমে। তাঁর হাজার হাজার উচ্চ-শিক্ষিত ছাত্রের মধ্যে অনেক উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতনামা বিজ্ঞানীও ছিলেন। রসায়ন বিজ্ঞানের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান ছিলেন তাঁর ছাত্র। ইমাম আবু হানিফাসহ সুন্নি মাজহাবের কয়েকজন বড় ইমাম ছিলেন এই নিষ্পাপ ইমামের ছাত্র। ইসলামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ও এ ধর্মকে সাংস্কৃতিক বা চিন্তাগত হামলাসহ সার্বিক ক্ষতিকর দিক থেকে সুরক্ষার জন্য যা যা করার দরকার তার সবই তিনি করেছিলেন।
তিনি ৮৩ হিজরির ১৭ ই রবিউল আউয়াল মদীনায় ভূমিষ্ঠ হন। ৩৪ বছর ধরে মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব দেয়ার পর ১৪৭ হিজরির ২৫ শে শাওয়াল শাহাদতবরণ করেন। আব্বাসিয় শাসক মনসুর দাওয়ানিকি বিষ প্রয়োগ করে এই মহান ইমামকে শহীদ করে। ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) যে অভাবনীয় ও অতুল জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তা ছিল নবুওতী জ্ঞানেরই উত্তরাধিকার। আর এ ধরনের জ্ঞান আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের পক্ষে অর্জন অকল্পনীয় বা অসম্ভব। আর এ জন্যেই ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলতেন, আমার বক্তব্য আমার পিতা তথা ইমাম বাকের (আঃ)’র বক্তব্য, আমার পিতার বক্তব্য আমার দাদা তথা ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ)’র বক্তব্য, আমার দাদার বক্তব্য হচ্ছে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)’র বক্তব্য এবং তাঁর বক্তব্য হচ্ছে রাসূল (সাঃ)’রই বক্তব্য, আর রাসূল (সাঃ)’র বক্তব্য হচ্ছে মহান আল্লাহরই বক্তব্য।
ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেন, আমাদের তথা রাসূল (সাঃ)’র আহলে বাইতের কাছে রয়েছে ভবিষ্যতের জ্ঞান, অতীতের জ্ঞান, অন্তরে অনুপ্রাণিত বা সঞ্চারিত জ্ঞান, ফেরেশতাদের বাণী যা আমরা শুনতে পাই, আমাদের কাছে রয়েছে রাসূল (সাঃ)’র অস্ত্রসমূহ এবং আহলে বাইতের সদস্য ইমাম মাহদী (আঃ)’র কাছে না পৌঁছা পর্যন্ত সেগুলো আমাদের হাতছাড়া হবে না। আমাদের কাছে রয়েছে হযরত মূসা (আঃ)’র তৌরাত, হযরত ঈসা (আঃ)’র ইঞ্জিল, হযরত দাউদ (আঃ)’র যাবুর এবং মহান আল্লাহর পাঠানো অন্যান্য আসমানী কিতাব।
এ ছাড়াও আমাদের কাছে রয়েছে হযরত ফাতেমা (সঃ)’র সহিফা যাতে রয়েছে সমস্ত ভবিষ্যৎ ঘটনার বিবরণ এবং পৃথিবীর শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত সমস্ত শাসকের নাম তাতে লেখা আছে। আমাদের কাছে রয়েছে আল জামী নামের দলীল, সত্তর গজ দীর্ঘ ঐ দলীলে লেখা রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)’র নিজ মুখের উচ্চারিত ও নির্দেশিত বাণী এবং ঐসব বাণী আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ) নিজ হাতে লিখেছিলেন। আল্লাহর শপথ! এতে রয়েছে মানুষের জন্যে কিয়ামত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সবকিছু।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যরা সব সময়ই অন্য যে কোনো ব্যক্তিত্ব বা শাসকদের চেয়ে মানুষের বেশী শ্রদ্ধা ও গভীর ভালবাসার পাত্র ছিলেন। আর এ জন্যে কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীন শাসকরা এই মহাপুরুষগণকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন এবং ইমাম জাফর
সাদিক (আঃ)ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। আব্বাসীয় খলিফা আল মানসুর ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)’র ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও প্রভাব প্রতিপত্তি দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তারই নির্দেশে ১৪৮ হিজরীর ২৫শে শাওয়াল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে শহীদ করা হয় নবী বংশ তথা আহলে বাইতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)কে। কিন্তু বস্তুবাদী শাসকচক্রের অন্ধ স্বার্থপরতার সীমানা পেরিয়ে অন্য অনেক মহান ইমামের মতোই ধার্মিক মানুষের অন্তরের রাজ্যে আজও ক্ষমতাসীন হয়ে আছেন হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)।
নবী বংশের যোগ্য উত্তরসূরি ও ইমামতের আকাশে অন্যতম প্রদীপ্ত সূর্য হযরত ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) খোদায়ী জ্ঞানের মাধ্যমে ইসলামকে এমন আলোকময় করেছেন ঠিক যেভাবে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর প্রোজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, বীরত্ব ও রক্ত দিয়ে ইসলামকে পবিত্র রেখেছিলেন। কেউ যদি মুহাম্মাদী ইসলামের বা প্রকৃত ইসলামের খাঁটি শিক্ষাগুলোর নির্মল ঝর্ণায় অবগাহন করতে চায় তাহলে হযরত ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র রেখে-যাওয়া ইসলামী শিক্ষার অমূল্য বিদ্যানিকেতনে তাকে প্রবেশ করতেই হবে। মুমিনদের ওপর তিনি ঠিক সেরকম অধিকার রাখেন যেমনিভাবে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)’র জিহাদ, হযরত হাসান (আ.)’র সন্ধি-চুক্তি, হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র শাহাদতের রক্ত, খাতুনে জান্নাত মা ফাতিমা ও যেইনাব (সা.)’র অশ্রুজল আমাদের ওপর অধিকার রাখে।
মহান ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র জ্ঞান বিষয়ক আন্দোলন ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষার দিগন্তকে এত উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল যে, উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকদের কোনো অপচেষ্টাই তাঁর প্রস্ফুটিত অন্তর্দৃষ্টির নূরের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র জ্ঞান বিষয়ক আন্দোলন এতটা সুদূরপ্রসারী হয়েছিল যে কারাবালায় নবীবংশের ওপর জালেম শাসকচক্রের চরম দমন-পীড়ন সত্ত্বেও এর প্রায় শতবর্ষ পর সেই একই বংশের তথা মহানবী(সা.)’র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম আলী বিন মূসা রেজা (আ.) যখন ইরানের নিশাপুরে আসেন তখন সেখানে আহলে বাইতের প্রেমিক হাজার হাজার মানুষ নীরব অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর বক্তব্য শুনতে। ইতিহাসে এসেছে চব্বিশ হাজার মানুষ ইমামের কথাগুলো হাদীস হিসেবে লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল সেদিন।
ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) মুসলমানদের সব মাজহাবের কাছেই বরেণ্য ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তাঁর আদর্শ হতে পারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সূত্র। চারজন সুন্নি ইমামের মধ্যে একজন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র এবং আরো দুই জন সুন্নি ইমাম তাঁর পরোক্ষ ছাত্র ছিলেন। উল্লেখ্য শিয়া মাযহাব ইমাম জাফর সাদিক (আ) এর জ্ঞান থেকে বিরতিহীনভাবে গ্রহণ করে হৃষ্টপুষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়েছে, যে কারণে শিয়া মাযহাব ‘জাফরি মাজহাব’ হিসেবেও খ্যাত।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রথম ইমাম আবু হানিফা ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র কাছে দুই বছর শিক্ষা অর্জন করায় নিজেকে গর্বিত মনে করতেন। তিনি এই দুই বছরকে ফিকাহ শাস্ত্রের ওপর তার জ্ঞান অর্জনের মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করতেন। এ প্রসঙ্গে আবু হানিফা বলেছেন, যদি ওই দুই বছর না থাকত তবে নোমান তথা আবু হানিফা ধ্বংস হয়ে যেত।
তিনি আরো বলেছেন, “আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদের (তথা ইমাম জা’ফর আস সাদিক আ.) চেয়ে বড় কোনো ফকিহ বা ইসলামী আইনবিদ ও জ্ঞানী ব্যক্তি দেখিনি। তিনি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি।”
মালিকি মাজহাবের ইমাম মালেক বিন আনাস ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহর শপথ! মানুষের কোনো চোখ সংযম সাধনা, জ্ঞান, ফজিলত ও ইবাদতের ক্ষেত্রে জা’ফর ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে বড় কাউকে দেখেনি, কোনো কান এসব ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বড় কারো কথা শুনেনি এবং কোনো হৃদয়ও তা কল্পনা করেনি।
ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র ইবাদত-বন্দেগি সম্পর্কে মালেক বিন আনাস বলেছেন, তিনি হয় সর্বদা রোজা রাখতেন, অথবা নামাজ পড়তেন অথবা আল্লাহর জিকির করতেন। প্রচুর হাদিস বলতেন ও বৈঠকের কর্ণধার ছিলেন। ইমামের সামনে বিশ্বনবী (সা.)’র নাম উচ্চারিত হলে তাঁর চেহারার রং পাল্টে যেত। একবার তাঁর সঙ্গে হজ্ব করতে গিয়েছিলাম। ইহরাম বাঁধার পর ইমাম আল্লাহর ভয়ে এতটা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন যে, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক শীর্ষক তালবিয়া উচ্চারণকে ঔদ্ধত্য বলে মনে করছিলেন।
ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র কয়েকটি অমূল্য বাণী তুলে ধরে শেষ করব আলোচনা:
যারা নামাজকে গুরুত্বহীন মনে করবে আমাদের তথা বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের শাফায়াত তাদের ভাগ্যে জুটবে না।
ইমাম বলেছেন, কোনো বান্দাই পরিপূর্ণভাবে প্রকৃত ঈমানে পৌঁছাতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য অর্জিত হবে: পুরোপুরি ধর্মকে বুঝতে পারা, সঠিক পদ্ধতিতে জীবন যাপন করা এবং দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা।
তিনটি বিষয়ের পরিচয় পাওয়া যায় এ তিন ক্ষেত্রে: রাগের মুহূর্তে ধৈর্যের পরিচয়, যুদ্ধের সময় বীরত্বের পরিচয় ও অভাবের সময় ভাইয়ের পরিচয়।
সবশেষে আবারও সবাইকে জানাচ্ছি অশেষ মুবারকবাদ, মহান আল্লাহর প্রতি জানাচ্ছি অশেষ শুকরিয়া এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি পেশ করছি অশেষ দরুদ ও সালাম। ###

সূত্র : bishorgo.com

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔