লেখকঃ কে এম দেলাওয়ার হোসেন
ইমাম হোসেন (আ.) কারবালায় পৌঁছে সেখানকার বাসিন্দা বানু আসাদ গোত্রের লোকদের ডেকে পাঠান। তাদের কাছ থেকে এই কারবালার জমি কিনতে চান। তখন তারা বলল যে, হুজুর এই জায়গা কিনবেন না। প্রয়োজন বোধে আপনাকে আমরা এমনিতেই দিয়ে দেবো। কারণ আমরা আমাদের বাপ-দাদার মুখে শুনেছি, এই জমিতে কেউই দাঁড়াতে পারেনি। অনেক নবীগণ এখানে এসে বিপদে পড়েছিলেন। উত্তরে ইমাম হোসেন (আ.) বললেন, এখানে যুদ্ধ হবে এবং আমরা সবাই মারা যাব। আমাদের কবর দেয়া হবে এ জায়গায়। তাই আমি এ জায়গা কিনে নিতে চাই। আলোচনার পর ৬০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে ইমাম (আ.) এই কারবালার জমি কিনে নেন। কারবালার সীমা পূর্বে থেকে পশ্চিমে ৪ মাইল, উত্তর-দক্ষিণে ৪ মাইল। ইমাম হোসেন (আ.) কর্তৃক কারবালার জমি খরিদ করার পেছনে সম্ভবতঃ দু’টি কারণ থাকতে পারে।
প্রথমতঃ ইমাম হোসেন (আ.) শাহাদাতের পর তিনি ও তাঁর আত্মীয়স্বজন সংঙ্গী-সাথিরা নিজস্ব কিনা জমিতে দাফন হতে চান কারণ ভবিষ্যতে কেউ যেনো অন্যের দান করা জমির অযুহাতে মাযার গুলোকে উচ্ছেদ করে দিতে না পারে। তাঁদের শাহাদাতের পর বিশ্ব থেকে তাঁর লক্ষ কোটি অনুসারী ভক্তরা এই কারবালাতে জিয়ারতের জন্যে আসতে থাকবেন। কেউ যেন তাদের বাধা দান করতে না পারে, সে পথ তিনি চিরতরে বন্ধ করে দিলেন।
দ্বিতীয়তঃ তিনি ও তাঁর পরিবার, সংঙ্গী-সাথিরা নিজস্ব জমিতে অবস্থান করছিলেন, কেউ যদি সেই জমিতে প্রবেশ করে তাহলে সে অন্যায়কারী সীমালঙ্ঘনকারী আগ্রাসী জালিম হিসেবে চিহ্নিত হবে।
নবীর সন্তান কারবালার জমি কিনে যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে গেছেন কুলাঙ্গার এজিদ (লা.) ও তার পাপিষ্ঠ সেনাপতি তা বুঝতে পারেনি। তিনটি শর্তের বিনিময়ে তাদেরকে আবার হেবা দলিল করে ফেরৎ দিয়ে দেন। ১ম শর্ত-যেসব স্থানে আমাদের কবর হবে সে সকল স্থানে কোন চাষাবাদ করতে পারবে না। ২য় শর্ত- আমাদের কেউ বেঁচে থাকবে না তোমরাই আমাদের কবরস্থ করবে। ৩য় শর্ত-আমাদের মারা যাবার পর যারা আমাদের কবর দর্শনে (জেয়ারত) আসবে তাদেরকে তিন দিন অতিথি হিসেবে রাখবে। এই বলে তাদেরকে বিদায় করে দিলেন। যাবার সময় বলে দিলেন, তোমাদের মহিলাদের পাঠিয়ে দাও। যখন বানু আসাদের মহিলারা আসলেন ইমাম হোসেন (আ.) তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, যদি তোমাদের পুরুষ শত্রুর ভয়ে আমাদেরকে কবরস্থ করতে ভয় পায় তবে তোমরা তাদেরকে একটু সাহস যুগিয়ো যাতে তারা যেন আমাদেরকে কবর দেয়। তারপর তাদেরকে ফেরত পাঠালেন এবং বলে দিলেন তাদের শিশুদের যেন পাঠিয়ে দেয়। যখন শিশুরা আসে তখন ইমাম হোসেন (আ.) শিশুদের বললেন, তোমাদের মা বাবারা যদি শত্রুর ভয়ে আমাদেরকে কবর দিতে না আসে, তবে তোমরা এখানে খেলার ছলে এসে আমাদের দেহের উপর এক মুঠ করে মাটি দিয়ে যাবে। যাতে ইহা কবরে পরিণত হয়ে যায়। এই বলে তাদেরকে বিদায় দিয়ে দিলেন। ১১ই মহররম এজিদ (লা) বাহিনী তাদের মৃত সেনাদের কবর দিয়ে চলে যায়। এজিদের সেনাবাহিনী কারবালা ত্যাগ করার পর বানু আসাদের লোকেরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। শত্রুর ভয়ে শহীদদের লাশের নিকট আসতে ভয় পাচ্ছিল। অনেক চিন্তার পর তারা শহীদের লাশের নিকট আসে। কিন্তু লাশের নিকট এসেও তারা অন্য এক মহা-সমস্যায় পড়ে। কারণ, কোন লাশের মাথা ছিলনা। কোনটা কার দেহ সনাক্ত করা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। এই নিয়ে যখন তারা ভাবছিল, তখন তারা দূর থেকে কাউকে আসতে দেখে ভয় পেয়ে সরে যায়। কিছুক্ষণ পর তারা দেখতে পায় একজন লোক ঘোড়ায় চড়ে কারবালার মাঠে এসেছেন এবং তাদেরকে (বানু আসাদ) ডেকে বলতে লাগলেন-এটি অমুকের দেহ, এটি অমুকের দেহ এই বলে তিনি লাশের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন এবং দাফন করাচ্ছিলেন। যখন সবার লাশ দাফন হয়ে যায়। তখন শুধু একটি দেহ বাকি থাকে সেটা ছিল হযরত মা ফাতেমার নয়নমনি ও বেহেস্তের যুবকদের সরদার ইমাম হোসেন (আ.) এর। তখন তিনি (আগন্তুক) তাদেরকে বললেন, এ লাশটিকে তোমরা ধর; আমাকে চাটাই এনে দাও। তারপর তিনি নিজে সে দেহকে দাফন করলেন। যখন দাফন কাজ সম্পন্ন হয়ে যায় এবং আগন্তুক যখন ফিরে যেতে লাগলেন তখন বানু আসাদের লোকেরা আগন্তুককে ঘিরে ধরে। আপনি কে? আপনার পরিচয় আমরা জানতে পারিনি এবং লাশগুলোকে কিভাবে আপনি সনাক্ত করেছেন। অজানা লোকের পক্ষে এটি অসম্ভব। তাই দোহাই এ শহীদদের, আপনি আপনার পরিচয় আমাদেরকে জানান। আগন্তক তখন নিরুপায় হয়ে নিজের নাম প্রকাশ করে বললেন, আমি ইমাম হোসেনের সন্তান জয়নুল আবেদীন। আমি শুধু এই কাজকে সমাধা করার জন্য মৌজেজার (অলৌকিক) দ্বারা এখানে এসেছি। তারা (বনু আসাদ) ইমাম জয়নুল আবেদীনকে ফিরে যেতে দিচ্ছিল না। ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) বললেন, তোমরা আমাকে বাধা দিওনা। আমাকে এখন অনেক কাজ করতে হবে। বাবার পরীক্ষা আশুরার দিন শেষ হয়েছে। এখন থেকে আমাদের পরীক্ষার পালা। সেটাকে নির্বিঘে সমাধান করতে দাও, বাধা দিওনা। এই বলে তিনি তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন।
পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, বনু আসাদ গোত্রের লোকেরা এখনও সেদিনের কবরস্থ করার স্মৃতির স্মরণে কোদাল, বেলচা, ঝুড়ি ও অন্যান্য সামগ্রীসহ কারবালায় এসে মহড়া দিয়ে যায়।###
