সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র জাহানের অধিপতি আর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক আমার মাতামহ ও সকল ঐশী পয়গম্বরের শেষ মোহর তাঁর উপর।
“হে এজিদ, আল্লাহ যা বলেন সত্য বলেন যে: ‘তারপর যারা মন্দ কাজ করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছে মন্দ; কারণ তারা আল্লাহর আয়াতসমূহে মিথ্যা আরোপ করতো এবং তা নিয়ে বিদ্রুপ করতো।’ (আয়াত নং ১০, সুরা রুম)।”
“হে এজিদ, এটাই কি তোমার বিশ্বাস তুমি সফলভাবে আসমানে ও জমিনে সকল পথ অবরুদ্ধ করেছো আমাদের জন্য কারণ তোমার দরবারে সারিবদ্ধ অবস্থায় বন্দী হয়ে এসেছি তাই?
এটাও কি তোমার বিশ্বাস আল্লাহ আমাদের তিরস্কার ও অপমানিত করেছেন আর তোমাকে মান ও সম্মানে ভূষিত করেছেন? এই জাহেরি বিজয়লাভে তুমি অহংকার বোধ করছো তাই এই প্রতিপত্তি ও সম্মান লাভ করে নিজেকে আনন্দিত ও গর্বিত মনে করছো। তুমি ভাবছো এই দুনিয়া তোমার হাসিল হয়েছে কারণ আমাদের উপর শাসন প্রতিষ্ঠিত করে তুমি ভারসাম্যে উপনীত হয়েছো। ক্ষনিকের জন্য সবুর করো। উল্লাস করো না। আল্লাহর বাণী ভুলে গেছো: “কাফেরগণ যেন কিছুতেই মনে না করে যে, আমরা অবকাশ দেই তাদের মঙ্গলের জন্য; আমরা অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়। আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” আয়াত ১৭৮, সুরা আলে ইমরান।
“হে মুক্তিপ্রাপ্ত দাসীর সন্তান-সন্ততি, এটাই কি তোমাদের বিচার নিজ মা ও বোনদেরকে হিজাবে আচ্ছাদিত করে রেখেছো আর পয়গম্বরের কন্যারা রাস্তায় রাস্তায় একস্থান হতে অন্যস্থানে হিজাবহীন নগ্ন-মস্তক করে প্রদর্শন করাচ্ছো?! হিজাবে থাকা মুখমন্ডল উন্মোচিত করে তুমি আমাদের ইজ্জত ভূলন্ঠিত করেছো। এক শহর থেকে আরেক শহরে কি পাহাড়ে বা কি সাগরপাড়ে সকল মানুষ আমাদের এভাবে দেখেছে। কাছের হোক বা দূরের, ধনী বা গরীব, নীচু কিংবা উঁচু সকলেই আমাদের উপর দৃষ্টিপাত করেছে আর এমন অসহায় এক অবস্থায় যখন পরিবারের কোন পুরুষই নেই যে আমাদের সাহায্য করবে।”
“হে এজিদ, তোমার ঘৃণিত এই কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে তুমি খোদাদ্রোহী, তুমি নবী (সা.) আনীত কিতাব ও সুন্নাহকে অস্বীকারকারী। তবে এতে অবাক হবার কিছুই নেই কারণ যাদের পূর্বসূরীরা শহীদের রক্ত ও মাংস এবং কলিজা ভক্ষন করেছে, পয়গম্বরকূলের নেতার বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে, সকলকে একত্রিত করে তাঁর বিপক্ষে যুদ্ধে প্রেরণ করেছে, তাঁকে হত্যার জন্য তলোয়ার অবারিত করেছে, তারাই তো সমগ্র আরবে আল্লাহ ও তাঁর নবীর বিরুদ্ধাচারীতায় শ্রেষ্ঠতর হবে, আল্লাহর নবীকে ঘৃণা করতে, কুফরে ও পাপে এবং সীমার লঙ্ঘনে।” “মনে রেখো এই দুষ্কর্ম ও গুণাহ’র নেপথ্যে তোমার কুফরি আকিদা ও বিদ্বেষপূর্ণতা কাজ করেছে যার উৎস বদরে তোমার পূর্বসূরীদের নিহত হওয়া ব্যক্তিগণ।”
“শত্রুতাসাধনে তারা পিছিয়ে নেই যারা আমাদের সাথে বৈরীভাব, বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রদর্শন করে। সে নিজেই তার কুফরী আকিদার প্রমাণ দেয়, ঘোষণা দেয় এই বলে যে: ‘আমি আল্লাহর নবীর সন্তানদের হত্যা করে পরিবারকে বন্দী বানিয়েছি; তার অগ্রজ প্রজন্ম আজ বর্তমান থাকলে উল্লসিত হয়ে বলতো, ‘হে এজিদ, তোমার হাত শক্তিশালী হোক, তুমি আমাদের পক্ষ হয়ে কি প্রতিশোধই না নিয়েছো।”
“হে এজিদ, জনসম্মুখে তুমি ইমাম হোসাইনের সেই ঠোঁট মুবারকে বেত্রাঘাত করেছো যে ঠোঁটে নবীজি চুম্বন করতো, আর এ কথা অবগত হয়েও তোমার চেহারায় সুখ ও আনন্দ প্রতিফলিত হচ্ছে।”
“জানের শপথ, বেহেশতে যুবাদের মনিব, আরবপতির সন্তান এবং আব্দুল মুত্তালিব উত্তরসূরীকূলের দেদীপ্যমান সূর্য তাকে হত্যা ও গভীর ক্ষতের সাধনসহ তুমি সমুলে আমাদের বিনাশ করেছো।”
“হোসাইন (আ)-এর হত্যাকা- তোমাকে তোমার কাফের বাপদাদার নৈকট্যলাভে সহায়তা করেছে। তোমার এই দুষ্কর্ম নিয়ে তুমি গর্ববোধ করছো আর তোমার পূর্বসূরীগণ তোমাকে আজ দেখলে উৎসাহ দিতো আর এই দুয়া করতো আল্লাহ তোমার হাতকে যেনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত না করেন।”
“হে এজিদ, সেই মারেফত যদি তোমার থাকতো তুমি এই জঘন্য কান্ডের হিসাব যদি অনুধাবন করতে তবে নিজেই এই দুয়া চাইতে আল্লাহ যেনো তোমাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে এই হাতকে ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং তোমার পিতামাতা তোমাকে যদি জন্মই না দিতো কারণ তুমি জেনেছো আল্লাহ তোমার উপর চরম অসন্তুষ্ট হয়েছেন। ইয়া আল্লাহ আমাদের হক আমাদের প্রদান করুন আর জুলুমকারীদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করুন।”
“হে এজিদ, তাই তুমি করেছো যা তুমি চেয়েছো, তবে মনে রেখো নিজ চর্ম ও মাংসকেই তুমি কেটে টুকরো করেছো। শীঘ্রই রাসুলুল্লাহর সামনে তুমি হাজির হবে। তাঁর পবিত্র পরিবারকে হত্যা ও অসম্মানের দায়ভারের ওজন তুমি বহন করবে। এইস্থানে তোমাকে নবীপরিবারের সম্মুখে উপস্থাপন করা হবে। মজলুম সকলে জুলুমের প্রতিশোধ একে একে নিবে আর শত্রুদের উপর বিধাতার শাস্তি বাস্তবায়িত হবে।”
“হে এজিদ, তুমি যে সুখে আপ্লুত হচ্ছো কিন্তু কোন মাকামই হাসিল হয়নি নবীপরিবারকে হত্যা করে। ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছ থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পিছনে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি তাদের জন্য আনন্দ প্রকাশ করে যে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ আয়াত ১৬৯-১৭০, সুরা আলে ইমরান।” আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট তোমার মোকাবিলায়। আল্লাহর নবী তোমার প্রতিপক্ষ এবং জিবরাইল (আ.) তোমার বিপক্ষে আমাদের সাহায্য ও সহায়তাকারী।”
“তোমাকে যারা রাষ্ট্রের প্রধান করেছে মুসলমানদের জীবনকে তোমার নেতৃত্ব দিয়ে দুর্বিষহ করেছে শীঘ্রই তারা তাদের জন্য কি অপেক্ষায় আছে তা দেখতে পাবে। অত্যাচারীর পরিণতি হচ্ছে নিদারুণ যন্ত্রণা।”
“হে এজিদ, তোমাকে আমি আল্লাহর ভয় এই বলে দেখাচ্ছি না যে তুমি অনুতপ্ত হও কারণ তুমি তাদের অন্যতম আল্লাহ যাদের অন্তরকে বোধহীন করেছেন, আত্মাকে বিদ্রোহী করেছেন আর যাদের শরীর সদাই আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় নিয়োজিত আর আল্লাহর পয়গম্বরের অভিশাপে যারা নিমজ্জিত। শয়তান যার অন্তরে আবাস করে নিত্য বংশধারার জন্ম দিচ্ছে তুমি তাদেরই একজন।”
“কি বিস্ময়কর এই পবিত্র আত্মাগণ, ঐশী পয়গম্বর ও তাঁর উত্তরসুরীর সন্তান মুক্তিকৃত দাসীদের পাপিষ্ঠ ও দুরাচারী সন্তানের হাতে নিহত হয়। আমাদের রক্তে রঞ্জিত তাদের হাত আমাদের দেহাবশেষ তাদের খাদ্য। যুদ্ধ ময়দানে আপনজনের শতশত তীর বিদ্ধ দেহের কাফন-দাফন নেই বলে আমাদের মনে আজ তীব্র শোক।”
“হে এজিদ, আমাদের পরাজয় যদি তোমার সফলতা হয় তবে অবশ্যই তুমি এর মূল্য পরিশোধ করবে। আল্লাহ তার বান্দাদের উপর করা অত্যাচার মেনে নেন না। আমরা কেবল আল্লাহর উপরেই আস্থাজ্ঞাপন করি। তিনিই আমাদের জন্য একমাত্র মুক্তিদাতা ও আশ্রয়দাতা, কেবল আল্লাহর নিকটেই আমরা আশা ব্যক্ত করি। আল্লাহর শপথ যিনি ওহীর মাধ্যমে, কিতাবের মাধ্যমে ও নব্যুওয়াতের মাধ্যমে আমাদের মর্যাদামন্ডিত করেছেন, তুমি কখনোই আমাদের মোকাম হাসিল করতে পারবে না আর না পারবে আমাদের স্মরণ হতে বিচ্যুতি ঘটাতে, নিজেও লজ্জা ও অসম্মানের ভাগ্য হতে পরিত্রাণ পাবে না আমাদের উপর করা অবর্ণনীয় জুলুমের কারণে। তোমার হুকুমের দিন শেষ হতে চলেছে আর সেই দিন বেশী দূরে নয়। হুশিয়ার হয়ে যাও যেদিন আহ্বানকারী আল্লাহর অভিশাপ জালিমদের উপর আহবান করবে।”
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য তিনি তাঁর বন্ধুদের পরিণতি অতি উত্তম করেছেন, তুমি নিজেকে যখন শয়তানি ও দুষ্কর্ম্মের মাঝে নিমজ্জিত হয়ে আল্লাহর বন্ধুদের বিরুদ্ধে জুলুমে লিপ্ত হয়েছিলে তখনি আল্লাহ তাঁর বন্ধুদের উদ্দেশ্যকে সাফল্যম-িত করেছেন এবং তাঁর করুনা-রহমত-শান্তির দিকে তাদের ফিরিয়ে এনেছেন, আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা জালিমদের মাধ্যমে আমাদের ক্ষতিপূরণ দিবেন এবং খিলাফত ও ইমামতের পরম উপকার প্রাপ্তি আমাদেরই হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মাখলুকের বিষয়ে পরম করুনাময় ও অত্যন্ত দয়ালু।”(ভাষান্তর: তানভীর হোসেন, তথ্যসূত্র: : HISTORICAL SERMONS, islamicmobility.com )###
