লেখকঃ মাওলানা আব্দুল লতিফ
উদ্দেশ্য: কোরআন বোধগম্য, এর তফসীর করা বৈধ এবং কোরআনের বোধগম্যতা ও বৈধ তফসীরের আয়তনের সীমারেখার বিষয়ে উভয় মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক পর্যালোচন।
ভূমিকা: কোরআনের বোধগম্যতা ও তার তফসীরের সীমারেখার ব্যাপারে উভয় মাযহাবের বহু অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এক সামগ্রিক বিভক্তিকরণ অনুসারে, উভয় মাযহাবেই প্রধান দুইটি দল পাওয়া যায়: একটি দল মনে করে, কোরআন হতে তাত্ত্বিক আহ্কাম বা বিধি-বিধান ইস্তেম্বাত করা [অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাকে পারিভাষিক তফসীর বলা হয়] মাসুম বা নিষ্পাপ ব্যক্তিগণ [শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে], কিংবা আল্লাহর রসূল (সা.) এবং যে সাহাবী ওহী নাজিলের সরাসরি সাক্ষী ছিলেন ও যেসব তাবেঈ তাদের নিকট হতে গ্রহণ করেছেন [আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে], তাঁদের জন্যে নিদৃষ্ট। আর এ প্রেক্ষাপট হতেই এই দলটি বলেন: তফসীরের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হাদিসের উপরই যথেষ্ট মনে করতে হবে, অন্যথা মোফাস্সির ব্যক্তি হারাম কাজে জড়িয়ে যাবেন।
দ্বিতীয় দলটি যেটি অধিকাংশ শিয়া-সুন্নি কোরআন গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত, তারা বলেন: তফসীর করা বৈধ এবং যে কোনো ব্যক্তিই, আল্লাহর আয়াত বোঝার ও তফসীর করার আবশ্যকীয় শর্তাদী ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করার পর,-যদি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে তার বোধটি অগ্রাহ্য ও অনির্ভরযোগ্য না হয়-[তফসীরের অবস্থাগত বৈধতা], কিংবা কোনো হারামকাজে জড়িত না হয় [তফসীরের দায়িত্ব-কর্তব্যগত বৈধতা] তাহলে সে তফসীর করতে পারে।
তফসীরের পরিভাষা পরিচিতি
“তফসীরে’র” আভিধানিক অর্থ : “তফসীর” কথাটি বাবে তাফঈলে’র মাসদার এবং এর মূল হচ্ছে ف س رগ্ধ । আর “ফাস্র” কথাটির আভিধানিক অর্থ: বর্ণনা করা,( ইসমাঈল জৌহারি, আস্সিহাহ্; ইবনে মাঞ্জুর, মোহাম্মাদ ইবনে মোর্কারাম, লিসানুল আরাব; ফাখরুদ্দিন, মাজমাউল বাহরাইন (ফাস্র দ্রষ্টব্য)।) স্পষ্ট করা, (মাজদুদ্দিন ফিরোজাবাদি, আল্ কামুসুল মুহিত; মোহাম্মদ মোর্তাজা জুবাইদি, তাজুল আরুস (ফার্স দ্রষ্টব্য) পৃথক করা (আব্দুর রহিম সাফিপূর, মুন্তাহাল আরাব (ফার্স ধাতু দ্রষ্টব্য।) গোপন বিষয়কে প্রকাশ ও স্পষ্ট করা, (লিসানুল আরাব; আল্ কামুসুল মুহিত; তাজুল আরুস (ফাস্র ধাতু দ্রষ্টব্য।) গ্রহণযোগ্য অর্থ ব্যক্ত করা “হুসাইন রাগেব ইস্ফাহানি, মুফরাদাত, পৃ. ৩৮০।” প্রভৃতি।
কতক অভিধানবেত্তা তফসীরকে “ফাসরে’র” ন্যায় এবং কতিপয় ব্যক্তি এটিকে “ফাসরে’র” অর্থে আধিক্যতা দানকারী, জ্ঞান করেছেন। “মোহাম্মাদ ইবনে দোরাইদ, জামহারাতুল্ লোগাহ্, ২য় খ-, পৃ. ৭১৮; লিসানুল আরাব; আল্ কামুসুল মুহিত; তাজুল আরুস (ফার্স দ্রষ্টব্য)।
উপরোক্ত অর্থসমূহে যে বিষয়টি যৌথ স্থান পেয়েছে তা হচ্ছে “প্রকাশ ও স্পষ্ট করা”। আর “পৃথক করা” ও তৎসদৃশ অর্থ করা হয়ে থাকলেও, সূক্ষ্মদৃষ্টিতে তা ঐ অর্থের প্রতিই প্রত্যাবর্তন করে। উদহারস্বরূপ: “পৃথক করার” মাঝেও একপ্রকারের “স্পষ্টকরণ ও আবিষ্কারকরণ” নিহিত রয়েছে। “তফসীর” শব্দটির প্রকৃত ব্যবহার নিছক কোরআনের সঙ্গেই বিশেষায়িত নয়। বরং নিরঙ্কুশ বাণী ও কথা এবং বিভিন্ন শব্দের অর্থ ও তাৎপর্যের সঙ্গেও বিশেষায়িত নয়;- যদিও বহুল ব্যবহারের প্রভাবে, যখনই কোনো শর্ত ও নিদর্শন ছাড়া ব্যবহৃহ হয় তখনই তা হতে “কোরআনের তফসীরই” সবার আগে মেধায় জাগরিত হয়।
কোরআনে “তফসীর” কথাটির ব্যবহার : তফসীর কথাটি পবিত্র কোরআনে শুধু একবারই ব্যবহার হয়েছে যেখানে মহান আল্লাহ্, তদীয় রসূলের (সা.) সম্মুখে কাফেরদের কতক টাল-বাহানা ও আপত্তি বর্ণনা এবং তার উত্তরদানের পর, বলছেন: وَلا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلاَّ جِئْناكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسيراً.গ্ধ “ওরা তোমার সামনে কোনো উদাহরণ বা সাদৃশ্য আনে না, নিছক আমরা যা তোমার নিমিত্তে সত্য সহ আনয়ন করেছি ও উত্তম তফসীর, তা ছাড়া।” (সূরা: ফুরকান, ৩৩তম আয়াত।) এই মহিমান্বিত আয়াতে ব্যবহৃত তফসীর শব্দের অর্থের ব্যাপারে মোফসসিরগণের বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। (প্রয়োজনে মনে করলে দেখে নিবেন: ইবনে জারির, জামেউল বায়ান, ১১তম খ-, পৃ. ১১; ফজল তাবারসি, মাজমাউল বায়ান, ৭ম খ-, পৃ. ২৬৬; মাহমুদ আলুসি, রুহুল মা’আনি, ১৯তম খ-, পৃ. ১৬ ইত্যাদি।)তাদের অনেকেই বলেন: “এখানে তফসীর কথাটির অর্থ, তার আভিধানিক অর্থের অনুরূপই; অর্থাৎ বর্ণনা করা ও স্পষ্ট করা।(আব্দুল্লাহ্ নাসাফি, তফসীরে নাসাফি, ২য় খ-, পৃ. ৬৮৪; আবুল ফুতুহ্, রওজুল জেনান ওয়া রহুল জেনান, ৪র্থ খ-, পৃ. ৭৭; হুসাইন বাগাভি, মা’য়ালিমুত্ তান্জিল, ২য় খ-, পৃ. ৩৬৮।)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তাদের উদাহরণের বিপরীতে, এমন এক উত্তরদান করেন যা সত্য এবং নবি করিমের (সা.) সত্যতা স্পষ্টকরণ ও বর্ণনাকরণের ক্ষেত্রেও শ্রেয়তর ও উন্নততর।
উভয় মাযহাবের পরিভাষায় “তফসীর” কথাটির ব্যবহার ও অর্থ : উভয় মাযহাবের কতিপয় মোফাসসির “তফসীর” শব্দের কোনো সংজ্ঞা উপস্থাপন করেন নি। হয়তো তারা সেটিকে সমাজে প্রচলিত স্পষ্ট অর্থের উপরই অর্পণ করেছেন।(যেমন জামেউল বায়ানে ইবনে জারির তাবারি; তিবইয়ানে শেইখ তুসি ও কাশ্শাফে জামাখশারি প্রভৃতি।) অনেকেই আবার কোরআনের তফসীরের সংজ্ঞা দান করেছেন এরূপে: “শানে নুজুল ও তৎসম্পর্কিত গল্প-কাহিনি সম্পর্কে কথা বলা” “মা’য়ালিমুত্ তানজিল, ১ম খ-, পৃ. ৩৪।”
“[কোরআনের] বাণীসমূহের অর্থ ও তার অর্থপ্রবর্তন নিয়ে আলোচনা করা” “ফাখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গাইব, ২৪তম খ-, পৃ. ৮০।” “যে জ্ঞান-বিজ্ঞান মহান আল্লাহর ইচ্ছা-উদ্দেশ্য নির্দেশকল্পে [তারই] বাণী ও শব্দসমূহের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে।” এ উক্তিটিকে তাফতাজানির প্রতি সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং হাজ্জি খলিফা “কাশফুজ্ জুনুন, ১ম খ-, পৃ. ৪২৭।” তার নাম উল্লেখ করেছেন। “কোরআনের সমস্যাপূর্ণ শব্দের ইচ্ছা-উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করা”। “মাজমা’উল বায়ান, ১ম খ-, পৃ. ৩৯।”
‘তফসীর’ অর্থ উদ্ঘাটন করা বা খোলা। পরিভাষায় ইল্মে তফসীর বলতে সেই ইলমকে বোঝায়, যার মধ্যে কোরআন মজীদের অর্থসমূহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহকারে বর্ণনা করা হয় এবং কোরআনের আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত সকল জ্ঞাতব্য বিষয় ও জ্ঞান-রহস্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা’আলা মহানবিকে (সা.) লক্ষ্য করে বলছেন: “আমি আপনার নিকট উপদেশগ্রন্থ (কোরআন) এ জন্যই অবতীর্ণ করেছি যেন আপনি মানুষের সামনে তাদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ বাণীসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন।
পবিত্র কোরআনে আরও উল্লেখ হয়েছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদের প্রতি এটা বড় অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদের (অন্তরকে নাফরমানীর পঙ্কিলতা থেকে) পবিত্র করেন এবং তাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও প্রজ্ঞাপূর্ণ তত্ত্বসমূহ শিক্ষা দেন।” তফসীরে মা’রেফুল কোরআন, প্রথম খ-, পৃ. ৪৭।
“কোরআনের অর্থ উদ্ঘাটন করা এবং মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য বর্ণনা করা [চায় তা সমস্যাপূর্ণ শব্দই হোক কিংবা আসানই হোক, কিংবা তার বাহ্যিক অর্থের আলোকেই হোক অথবা এতদ্ব্যতীত অন্য কিছু হোক]” “জালাল উদ্দিন সোয়ুতির বর্ণনা অনুসারে [আল ইতকান, ৪র্থ খ-, পৃ. ১৬৮] এটি রাগেব ইস্ফাহানির উক্তি।” “আরবি ব্যাকরণ ও অভিধানের উপর ভিত্তি করে কোরআনের আয়াতসমূহের বাহ্যিক অর্থ করা” “শেইখ আগা বুজুর্গ তেহরানি, আজ্জারিয়্যাহ্, ৪র্থ খ-, পৃ. ২৩২।” “কোরআন মাজিদের আয়াতসমূহের অর্থ বর্ণনা করা এবং সেসবের বিভিন্ন উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য উদ্ঘাটন করা”- প্রভৃতি। “মোহাম্মাদ হোসাইন তাবাতাবাঈ, আল্ মিজান, ১ম খ-, পৃ. ৪।”
উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, উভয় মাযহাবের মনীষীগণ তফসীরের ব্যাপারে একই ধরনের অর্থ উপস্থাপন করেন নি। বরং উভয় মাযহাবের দৃষ্টিকোণ হতে তফসীরের অর্থের ক্ষেত্রে [নুন্যতঃ তার প্রচলিত অর্থের ক্ষেত্রে] যে যৌথ বিষয়গুলি উল্লেখ করা যেতে পারে এবং যেটিকে তফসীরের অন্যতম সূচক হিসেবে নামকরণ করা যেতে পারে তা হচ্ছে নিন্মরুপ:
১. তফসীর হচ্ছে মহান আল্লাহর লক্ষ-উদ্দেশ্য উপলব্ধির নিমিত্তে কোরআনের বাহ্যিক বাক্য ও শব্দসমূহের আওতাভুক্ত বিষয়।
তফসীর কথাটি ঐ স্থানেই প্রযোজ্য হয় যেখানে [আল্লাহর] বাণী বা বক্তব্যের মাঝে কোনো প্রকারের অস্পষ্টতা ও গুপ্ততা থাকে এবং মোফাসসির ব্যক্তি, পর্দা উন্মোচন করতঃ মহান আল্লাহর লক্ষ-উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন। সুতরাং, যে বাণীর অর্থ দ্রুত বুঝে আসে এবং যেখানে মহান আল্লাহর লক্ষ-উদ্দেশ্য স্পষ্ট সেখানে পারিভাষিক তফসীর কথাটি প্রযোজ্য হয় না। কেননা যে, এরূপ কোনো স্থানে মোফাসসির না কোনো আবিষ্কার করেন এবং না কোনো পর্দা উন্মোচন করেন। “প্রয়োজনে দেখতে পারেন: সাইয়্যেদ হাসান আমিন, দায়েরাতুল মাআরিফ আল্ ইসলামিয়াহ্ আশ্ শিয়াহ, ৩য় খ-, পৃ. ৪৭, মাক্বালাতুত্ তাফসির; শেইখ মোহাম্মাদ হোসাইন ইস্ফাহানি, মাজদাল বায়ান, পৃ. ৪৩-৪৪; রাভেশ শেনাসিয়ে তফসীরে কোরআন, মাহমুদ রাজাভির তত্ত্বাবধানে, পৃ. ১২-২৩।” সুতরাং তফসীরে, ইস্তেম্বাত ও লুক্কায়িত অর্থ উদ্ঘাটন করার আলোচনা আসে এবং এতে আকল্ তথা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। (উদাহরণস্বরূপ নিম্ন প্রশ্নগুলিতে মনোনিবেশ করেন: সূরা নাহলের ১২৮তম আয়াত إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذينَ اتَّقَوْا وَ الَّذينَ هُمْ مُحْسِنُون [আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে রয়েছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল।] এখানে সঙ্গত্ব দ্বারা কোন্ ধরনের সঙ্গত্ব বুঝানো হয়েছে? এ দ্বারা কি…هُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ ما كُنْتُمْ…গ্ধ [তোমরা যেখানেই অবস্থান কর না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গেই আছেন। সূরা: হাদিদ, ৪র্থ আয়াত] এই আয়াতে উল্লেখিত সঙ্গত্বকে বুঝানো হয়েছে?)
যাতে মহান আল্লাহর ইচ্ছা-উদ্দেশ্য উপলব্ধি করা যায়। এ কারণেই একজন মোফাসসিরকে অবশ্যই [কোরআনের] বাণীর যাবতীয় দৃষ্টান্ত এবং ভিতর-বাইরেরসমূহ নিদর্শনের প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে। আর প্রতিটি বিষয়কেই তার স্ব-স্ব স্থানে অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করতে হবে যাতে আল্লাহর লক্ষ-উদ্দেশ্য বুঝার ক্ষেত্রে তিনি ভুলে পর্যবশিত না হন।
আর এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, কেন উভয় মাযহাবের কতিপয় ব্যক্তি, কোরআনের তফসীরকরণকে অবৈধ জ্ঞান করতঃ একে “তফসীর র্বিরায়” [মনগড়া ব্যাখ্যা] আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন: এ স্তরে [মহান আল্লাহর ইচ্ছা-উদ্দেশ্য ইস্তেম্বাত করা ও লুক্কায়িত অর্থ আবিষ্কার করা] কোরআন বুঝার বিষয়টি কতিপয় বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে বিশেষায়িত। চলবে…#####
