তোমরা অত্যাচারীদের শত্রু এবং অত্যাচারিতের বন্ধু ও সাহায্যকারী হও
ইসলাম ধর্মের বক্তব্য হচ্ছে, অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো এবং অত্যাচারিতদের সাহায্য কর। ক্ষমা ও মানুষের ছোট-খাটো দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা এমন সব গুণের অন্তর্ভুক্ত যা এ পার্থিব জগৎ এবং আখেরাতে সফলতা ও সৌভাগ্যের জামানতদার।
অত্যাচারিতদের সাহায্য করা, ক্ষমা ও উদারতা, পবিত্র কোরআন, হাদিস, মুত্তাকী বান্দাদের বৈশিষ্ট্য।
ইসলাম এমন এক জাতির মধ্যে আবির্ভূত হয়েছিল যেখানে অন্য সকল নৈতিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি জুলুম পূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করত। শক্তিধর, অভিজাত ও শাসক সম্প্রদায় সমাজের সাধারণ, নিরীহ ও দুর্বল জনগণের ওপর যত জুলুম করতে পারত তারা ততই জুলুম করত এবং তাদেরকে নিজেদের সামনে অবনত থাকতে বাধ্য করত। আবার কিছুসংখ্যক লোক ভয়-ভীতি ও অন্যান্য কারণে নীরব থাকত এবং তাদের এ নীরবতা প্রকৃতপক্ষে ঐ সব জালেমের কার্যকলাপের সমর্থন বলেই গণ্য হতো।
ইসলাম ধর্ম জালেমদের তিরষ্কার ও নিন্দা করা, তাদের ওপর অভিশাপ দেয়া এবং তাদের মহান আল্লাহর রহমত থেকে দূরে বলে গণ্য করা ছাড়াও যারা অন্যায়-অত্যাচারের সামনে প্রতিবাদ না করে নীরব থেকেছে, অথচ জালেমদের সাহায্যও করে নি তাদের কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেছে এবং মহান আল্লাহর কঠিন শাস্তির ভয় দেখিয়েছে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করবে মহান আল্লাহ্ তার জন্য কিয়ামত দিবসে একজন ফেরেশতা প্রেরণ করবেন যে তাকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবে।” (জামেউস্ সাআদাত, ২য় খন্ড পৃ. ২২১।)
ইমাম জাফর সাদেক (আ.) বলেছেন, “যখন কোন মুসলিম শক্তি ও সামর্থ্য রাখা সত্তে¡ও নিজের মুসলিম ভাইকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে তখন মহান আল্লাহ্ও দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকবেন।” (বিহারুল আনওয়ার, ১৫শ খন্ড, কিতাবুল ইশরাহ্, পৃ. ১৩১)
ইসলাম ধর্মের বক্তব্য হচ্ছে, অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করো এবং অত্যাচারিতদের সাহায্য কর।
আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, “তোমরা অত্যাচারীদের শত্রু এবং অত্যাচারিতের বন্ধু ও সাহায্যকারী হও।” (নাহজুল বালাগাহ্, পৃ. ৯৬৮)
ইমাম সাদেক বলেছেন, “যখন কোন মুমিন কোন অত্যাচারিত মুমিনকে সাহায্য করে তখন তার এ কাজটি এক মাস রোযা রাখা এবং মসজিদুল হারামে ই’তিকাফ করার চেয়েও উত্তম।” (বিহারুল আনওয়ার, ১৫শ খন্ড, কিতাবুল ইশরাহ্, পৃ. ১২৩)
ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন, “একজন ঈমানদার লোক এক জালেম বাদশার রাজ্যে বাস করত। ঐ বাদশাহ্ মুমিন অধিবাসীদের অশেষ কষ্ট দিত। মুমিন ব্যক্তি ঐ অত্যাচারী বাদশার রাজ্য থেকে পালিয়ে একটি কাফের দেশে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় এবং ঐ দেশে এক কাফেরের ঘরে বসবাস করতে থাকে। আশ্রয়দাতা মুশরিক ব্যক্তি তাকে অনেক সম্মান দিতে থাকে এবং তাকে লুকিয়ে রাখে। ঐ আশ্রয়দাতা কাফেরের মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হলে মহান আল্লাহ্ তার কাছে ইলহাম করে বললেন : আমি আমার সম্মান ও মহত্তের শপথ করে বলছি! বেহেশ্তে যদি কাফেরদের স্থান থাকত তাহলে আমি তোমাকে সেখানে স্থান দিতাম, কিন্তু কাফেরদের জন্য বেহেশ্ত হারাম। তাই হে দোযখের আগুন! একে ধর কিন্তু কষ্ট দিও না।” (উসূলে কাফী, পৃ. ৪০৩)
ইমাম সাদেক (আ.) অপর এক বাণীতে অত্যাচারিতদের সাহায্য করার ব্যাপারে স্পষ্ট বলেছেন, “(জালেমের মোকাবিলায়) অত্যাচারিত মুসলমানকে সাহায্য করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয।” (বিহারুল আনওয়ার, ১৫শ খন্ড, কিতাবুল ইশরাহ্, পৃ. ১২৩)
ক্ষমা ও উদারতা:
কিছু সংখ্যক ব্যক্তি নিজেদের শত্রু ও বিরোধীদের দমন এবং তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য যে কোন ধরনের উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম ব্যবহার করতে কুণ্ঠাবোধ করে না এবং মন্দ আচরণের প্রত্যুত্তর মন্দ আচরণ দিয়েই দিয়ে থাকে। তবে ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, “নিজ ভাইকে উপকার ও মহানুভবতা দিয়ে সাজা দাও এবং তার অনিষ্ট ও অমঙ্গলকে তার ওপর অনুগ্রহ প্রদর্শনের মাধ্যমে বিদূরিত করে দাও।” (নাহজুল বালাগাহ্, পৃ. ১১৫৫)
অর্থাৎ কারো স্খলন ও দোষত্রুটি ক্ষমা করা আসলে ঐ দোষ ও স্খলনটির বারবার সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দানের সর্বোত্তম পন্থা। তাই পবিত্র কোরআনে মুত্তাকী বান্দাদের বৈশিষ্ট্যসমূহের ব্যাপারে বলা হয়েছে:
“যারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় দান করে, নিজেদের ক্রোধ সম্বরণ করে এবং মানুষের দোষ-ত্রুটি ও স্খলন ক্ষমা করে দেয়। আর নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ সৎ কর্মশীল ও পরোপকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪)
পবিত্র কোরআনে মুসলমানদের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে : “এবং যেন তারা ক্ষমা করে দেয় এবং উপেক্ষা করে (ছোটখাটো দোষ-ত্রুটি যেন না ধরে), তোমরা কি এটি পছন্দ করো না যে, মহান আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করে দিন। মহান আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”(সূরা নূর : ২২)
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে : “অতঃপর যে ব্যক্তি ক্ষমা করবে এবং সন্ধি করবে তার এ কাজের প্রতিদান তো মহান আল্লাহর কাছে আছে (অর্থাৎ এ কাজের প্রতিদান ও পুরস্কার মহান আল্লাহ্ প্রদান করবেন)”…। (সূরা শুরা : ৪০)
ক্ষমা ও মানুষের ছোট-খাটো দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা এমন সব গুণের অন্তর্ভুক্ত যা এ পার্থিব জগৎ এবং আখেরাতে সফলতা ও সৌভাগ্যের জামানতদার।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সর্বোত্তম মঙ্গল ও কল্যাণের সন্ধান দেব? যে তোমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করবে তাকে তুমি প্রদান করবে এবং যে তোমার ওপর অত্যাচার করবে তাকে তুমি ক্ষমা করবে।”
ইমাম জাফর সাদেক বলেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন : “তোমাদের উচিত ক্ষমা করা। কারণ ক্ষমা কেবল বান্দার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে; তাই তোমরা পরস্পরকে ক্ষমা করে দাও, তাহলে মহান আল্লাহ্ও তোমাদের সম্মানিত করবেন।”
আর একটি বিষয় এখানে স্মরণ রাখা উচিত যে, ক্ষমা ঐ সময় গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যমন্ডিত হবে যখন প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা ও শক্তি অর্জিত হবে। আর ঐ ব্যক্তি ক্ষমা করতে সক্ষম যে (প্রতিশোধ গ্রহণের) শক্তি ও সামর্থ্য রাখে।
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, “যখন তুমি তোমার শত্রুর ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে তখন তার ওপর (প্রতিশোধ গ্রহণের) শক্তি ও ক্ষমতা অর্জনের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাকে ক্ষমা করে দাও।” (নাহজুল বালাগাহ্, পৃ. ১০৮২।)
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, “ঐ ব্যক্তি ক্ষমা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত যে শান্তি প্রদান করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সামর্থ্যবান।”(নাহজুল বালাগাহ্, পৃ. ১১০২)
ইমাম সাদেক (আ.)-এর নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে আমরা ক্ষমা করার অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমরা মহানবীর আহলে বাইত এমন এক পরিবার, যারা আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে তাদের ক্ষমা করে দেয়াই হচ্ছে আমাদের বৈশিষ্ট্য।” (ওয়াসাইলুশ শিয়া, ২য় খন্ড, পৃ, ২২৪)
ইমাম সাদেক বলেছেন, “(প্রতিশোধ গ্রহণের) ক্ষমতা ও শক্তি থাকা সত্তেও ক্ষমা করে দেয়া হচ্ছে মহান নবী ও মুত্তাকী বান্দাদের সুন্নাহ্।” (সাফীনাতুন বিহার সাফীনাতুল বিহার, ২য় খন্ড, পৃ. ২০৭।
670
আগের পোস্ট
