ফাতেমা (সা.আ.)-এর শেষ ইচ্ছা
ন্যায্যতা, নৈতিকতা ও মুসলিম ঐক্যের শিক্ষা
আহলে বাইত (আ.)-এর অমূল্য রত্ন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) শুধু ত্যাগ, ঈমান ও পবিত্রতার প্রতীকই নন, বরং ইসলামি সমাজব্যবস্থার এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি যে ওসিয়তসমূহ প্রদান করেন, তাতে ফুটে ওঠে ইসলামী মূল্যবোধ, ন্যায়ের চেতনা ও আখলাকে ফজিলতপূর্ণ জীবনবোধ।
তাঁর ওসিয়ত মূলত তিনটি দিক নিয়ে বিভক্ত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ওসিয়ত।
২. অর্থনৈতিক ওসিয়ত
রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবিত অবস্থায় হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-কে কিছু সম্পদ উপহার দেন। রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর তিনি হজরত আলি (আ.)-কে ওসিয়ত করেন, যেন তাঁর মৃত্যুর পর ঐ সম্পদসমূহ মুমিন ও মুমিনাদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।
(ক) হাতিয়ানে সাবআ
এটি ছিল চারিদিকে প্রাচীরঘেরা সাতটি বাগানের সমষ্টি। হজরত ফাতেমা (সা.আ.) ওসিয়ত করেন, যেন ঐ বাগানের আয় জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।
ইমাম বাকের (আ.) বলেন: “হজরত ফাতেমা (সা.আ.) হজরত আলি (আ.)-কে ওসিয়ত করেন, তিনি যেন ঐ বাগানের আয় দ্বারা সমাজকল্যাণের কাজ সম্পাদন করেন।” (ফুরু’ আল-কাফি, খন্ড৭, পৃ. ৪৮; বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৩, পৃ. ২৩৫)
(খ) উম্মুল আয়াল
এটি ছিল হজরত ফাতেমা (সা.আ.)-এর আরেকটি দান, যেখানে প্রায় ২০ হাজার খেজুরগাছসহ লেবু, কমলালেবু প্রভৃতি ফলের গাছ ছিল। তিনি এই সম্পদ ফকির ও তাদের সন্তানদের জন্য দান করেন। এলাকাটিতে পানির উৎসও ছিল, যা জনকল্যাণে ব্যবহৃত হতো। (মুআজাম মাআলিমুল হিজায, খন্ড ৬, পৃ. ১৯৪)
(গ) অন্যায়কারীদের বর্জন
তিনি হজরত আলি (আ.)-কে ওসিয়ত করেন: “যারা আমার ওপর অত্যাচার করেছে এবং আমার অধিকার হরণ করেছে, তারা যেন আমার জানাযায় অংশগ্রহণ না করে। তারা শুধু আমার শত্রু নয়, বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এরও শত্রু।”
৩. রাজনৈতিক ওসিয়ত
হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) জীবনের শেষ সময় হজরত আলি (আ.)-কে মৌখিক ও লিখিতভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওসিয়ত করে যান। এগুলোর মধ্যে প্রধান দিকগুলো হলো:
(ক) মৃত্যুর পর সাক্ষাৎ ও কবর যিয়ারত
তিনি বলেন: “হে আবাল হাসান! আমি শিগগিরই তোমাদের থেকে বিদায় নেব। তখন তুমি আমার কণ্ঠ শুনতে পাবে না। তবে আমার মৃত্যুর পর অবশ্যই আমার কবর যিয়ারত করবে।” (কওকাবে দুররি, খন্ড ১, পৃ. ২৫৩)
(খ) কুরআন তেলাওয়াত
“যখন আমি মৃত্যুবরণ করব, তখন আপনি আমাকে গোসল দেবেন, কাফন দেবেন, জানাজা পড়াবেন এবং দাফনের পর আমার কবরের পাশে বসে কুরআন তেলাওয়াত ও দোয়া করবেন। আমার সন্তানদের খেয়াল রাখবেন।” (বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৭৯, পৃ. ২৭)
(ঘ) গোপন দাফন
তিনি বলেন: “আমার গোসল, কাফন ও দাফনের কাজ আপনি করবেন। বনি সাকিফার ষড়যন্ত্রকারীরা যেন আমার জানাযায় অংশগ্রহণ না করে।” (কাশফুল গুম্মা, খন্ড ২, পৃ. ৬৮)
(ঙ) সীমিত উপস্থিতি
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বর্ণনা করেন যে, ফাতেমা (সা.আ.) ওসিয়ত করেন “আমার মৃত্যু সম্পর্কে শুধু উম্মে সালমা, উম্মে আয়মন, আমার দাসি ফিজ্জা, হাসান ও হুসাইন (আ.), আব্বাস, সালমান, আম্মার, মিকদাদ, আবু যার ও হুযাইফা (রা.) ছাড়া কাউকে অবগত করবেন না।” (দালায়েলুল ইমামা, পৃ. ৪৪; বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৭৮, পৃ. ৩১০)
(চ) গোসলের নির্দেশ
তিনি আসমা বিনতে উমাইসকে বলেন: “তুমি এবং আলি (আ.) তোমরা দু’জনেই আমাকে গোসল দেবে। অন্য কাউকে এতে অংশ নিতে দেবে না।” (যাখায়েরুল উকবা, পৃ. ৫৩)
৪. ব্যক্তিগত ওসিয়ত
হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদতের পর হজরত আলি (আ.) ঘরে কাপড়ে মোড়ানো এক বস্তু দেখতে পান, যার মধ্যে ছিল তাঁর লিখিত ওসিয়তনামা।
তিনি তাতে লিখেছিলেন: “শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছিÑআল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, এবং হজরত মোহাম্মদ (সা.) তাঁর রাসুল। জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, কেয়ামত সংঘটিত হবে, এবং আল্লাহ মৃতদের পুনরুজ্জীবিত করবেন।
হে আলি! আমি মোহাম্মদের কন্যা ফাতেমা। আল্লাহ আপনাকে আমার স্বামী করেছেন যেন আমি দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার সঙ্গী হই। আমার দৃষ্টিতে আপনি সবার চেয়ে উত্তম।
আমার মৃত্যুর পর আপনি আমাকে গোসল, হুনুত, কাফন ও দাফন করবেন। আমার দেহকে রাতের অন্ধকারে দাফন করবেন এবং জানাযার নামাজ আপনি পড়াবেন। আমার মৃত্যু সম্পর্কে কাউকে অবগত করবেন না। কেয়ামত পর্যন্ত আমার সন্তানদের কাছে আমার সালাম পৌঁছে দেবেন।”**
(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৩, পৃ. ২১৪)
হজরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর ওসিয়ত কেবল ব্যক্তিগত দিকনির্দেশনা নয়, বরং ইসলামি সমাজ, ন্যায়বিচার, ঈমান ও আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি। তাঁর প্রতিটি নির্দেশনা মুসলমানদের জন্য শিক্ষা, ধৈর্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাকার প্রেরণা
