হযরত ইমাম সাজ্জাদের (আ.) সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনব্যবস্থা

অনুবাদে: মল্লিক শিহাব ইকবাল।

by Syed Yesin Mehedi

শিয়াদের দৃষ্টিতে চতুর্থ ইমাম হচ্ছেন হযরত হোসাইন তনয় সাজ্জাদ (আ.)। তিনি ৬৫৭ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭১৩ খৃস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এমন এক সময় জন্মগ্রহণ করেন যখন তাঁর পিতামহ হযরত ইমাম আলী (আ.) খলিফা ছিলেন এবং মুয়াবিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি উত্তরোত্তর বড় হন।
আল্লাহ্পাক ৬৮০ খৃস্টাব্দে আশুরার দিন হযরত ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদতের পর হযরত সাজ্জাদকে (আ.) মুসলমানদের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁকে ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া, আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াযীদ, মারওয়ান ইবনে হাকাম, আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ইবনে হাকাম ও ওয়ালিদ ইবনে আব্দিল মালিকের শাসনামল সহ্য করতে হয়।
ইয়াযীদ সিংহাসনে আরোহণের পর আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের নতুন খলিফার হাতে বায়াত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মক্কায় পালিয়ে যান। কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ.) শহীদ হওয়ার পর আব্দুল্লাহ মক্কার লোকদের একত্রিত করে, তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তার বক্তৃতা দানের পর মক্কার লোকেরা ঘোষণা করে যে, কেউ তার চেয়ে অধিক খিলাফতের যোগ্য নয় এবং এরপর তারা তার আনুগত্যের অঙ্গীকার করে। এ কথা শুনে ইয়াযীদ রুপার একখানা চেইন তৈরী করে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরকে গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যে ওয়ালিদ ইবনে উতবাহ্কে মক্কায় প্রেরণ করে। কিন্তু বহু বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তার বিদ্রোহের অবসান ঘটে।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কারবালার দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। কুফা ও এরপর সিরিয়ায় নেওয়া অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর মধ্যে তিনিও ছিলেন। শামের (সিরিয়া) পথে তিনি আশুরা বিদ্রোহের সমর্থনে বক্তৃতা দেন। বিতর্কের পর উবাইদ ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে যিয়াদ উত্তেজিত হয়ে তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়। জবাবে তিনি বলেন: “আপনি কি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন? আপনি কি জানেন না যে, মৃত্যু এমন এক বিষয় যার সঙ্গে আমরা পরিচিত এবং শাহাদাত আমাদের জন্যে এক মর্যাদা ও পুণ্য?” (মাক্তালে খারেযমী)
এক বিতর্কের পর ইয়াযীদ কর্তৃক ইমামকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হলে জবাবে তিনি বলেন, “উমাইয়াদের মত মুক্তকৃত দাসরা কখনই নবী ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের হত্যার আদেশ দিতে পারে না যদি না তারা এর পূর্বে ইসলাম ত্যাগ করে থাকে! কিন্তু আপনি যদি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তাহলে আমার কাছে নির্ভরযোগ্য কাউকে নিয়ে আসেন যাতে আমি তাকে প্রশাসনের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারি।” (ধরিআত আল-নাজাত???)
হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কখনই ইয়াযীদের নিকট করুণা চাননি এবং তিনি তাকে শুধুমাত্র বন্দীদের মদিনায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে নির্ভরযোগ্য কাউকে নিয়োগ করতে বলেছিলেন।
দামেস্ক মসজিদে তাঁর ভাষণ:
ইমাম (আ.) ইয়াযীদের প্রতি নিছক তিরস্কার করেন এমনটি নয়। বরং এক সাধারণ সমাবেশে তিনি উমাইয়াদের দুর্নীতিগ্রস্ত আচরণ সকলকে দেখানোর উদ্দেশ্যে উন্মোচিত করেন। তিনি দামেস্ক মসজিদে এক জ্বালাময়ী খুতবা প্রদান করেন এবং ইয়াযীদকে উৎখাত করার জন্যে সিরিয়ার জনগণকে আহব্বান জানান। তাঁর খুতবাটি ইয়াযীদ ও তার অনুসারীদের জন্যে এক জুমার নামাযের খুতবা অনুসরণ করে। তিনি (আ.) বলেন: “তুমি ভাড়াটে! তুমি মানুষের সুখ বিক্রি করেছ এবং আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়েছ। তোমার স্থান জাহান্নাম!”
ইমাম (আ.) ইয়াযীদকে মঞ্চে নিয়ে এমনভাবে কথা বলতে বলেন যাতে আল্লাহ খুশি হন। ইয়াযীদ তা করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং যখন সিরীয়ার লোকেরা ইমামকে (আ.) কথা বলতে বলে তখন ইয়াযীদ বলে: “তারা শৈশব থেকেই দুধের ন্যায় সচ্ছ জ্ঞানাহরণ করেছেন। যদি তারা মিম্বরে বসেন তাহলে আমাকে ও আবু সুফিয়ানের পরিবারকে অপমান না করা পর্যন্ত সেখানেই থাকবেন।”
ইমাম অবশেষে বক্তৃতা দিতে রাজি হন। তিনি স্বীয় বক্তব্য শুরু করেন আল্লাহর প্রশংসা ও নবীর প্রতি দরুদের মাধ্যমে। এরপর তিনি উমাইয়াদের পঁচিশ বছরের রাজক্ষমতার বর্ণনা দেয়ার পাশাপাশি স্বীয় বংশের কথা বলতে শুরু করেন: “আমি তাঁর সন্তান যিনি নিজের রক্তে রঞ্জিত হয়ে পিপাসার্ত ঠোঁটে শাহাদতবরণ করেছেন।”
এই বাক্য শুনে সকল শ্রোতা উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে। ইয়াযীদ ভয় পেয়ে গিয়ে তাঁর (আ.) কথা কাটার জন্যে নামাযের আযান দিতে বলে। নামাযের আযানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ইমাম স্বীয় বক্তব্য বন্ধ করে দেন। যখন মুয়াজ্জিন বলে: “আশহাদু আন্না মুহাম্মার্দা রাসুলুল্লাহ”, অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, তখন ইমাম (আ.) উমাইয়াদের গতি স্তব্ধ করে দেন। তিনি মুয়াজ্জিনের দিকে ফিরে বলেন: “মুহাম্মদের (সা.) প্রতি অনুগ্রহ করে একটু অপেক্ষা করুন!”
তারপর ইয়াযীদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন: “ইয়াযীদ! নবী (সা.) কি আপনার দাদা নাকি আমার? আপনি যদি বলেন যে, তিনি আপনার দাদা, তাহলে আপনি মিথ্যা বলবেন এবং যদি আমার হন, তাহলে আপনি কেন তাঁর সন্তানদের হত্যা ও তাঁর কন্যাদের বন্দী করলেন? কেন? কেন?”
ইমামের (আ.) কথায় হতাশ হয়ে ইয়াযীদ মসজিদ ত্যাগ করে! (বাহাই, কামিল।)
মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর ইমাম (আ.) সেখানকার শাসক আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হন। তিনি শুধুমাত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন; কিন্তু তারপরও ১৭০জন সাহাবীকে প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হন (তুসী, রিজাল) যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুহাম্মদ ইবনে জুবায়ের, ইয়াহ্ইয়া ইবনে উম্মে তা’ভিল, আবু খালিদ কাবুলী ও আবু হামযাহ্ শুমালী।
এ ধরনের সাহাবীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইমাম (আ.) ইসলামী সমাজে ও উমাইয়া শাসকদের দৃষ্টির সামনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। হজ্বযাত্রার সময় তিনি আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে সালাম দিতে অস্বীকার করেন, এমনকি তাকে ভ্রুকুটিও করেন। এই আচরণে উত্তেজিত হয়ে আব্দুল মালিক তাঁর হাত ধরে বলেন: “আমার দিকে তাকান! আমি আব্দুল মালিক, আপনার পিতার হত্যাকারী নই।” ইমাম উত্তর দেন: “আমার বাবার হত্যাকারী স্বীয় পরকাল ধ্বংস করে দিয়েছে। তুমি কি আমার বাবার খুনীর অনুসরণ করতে চাও? ঠিক আছে!”
“আমি এমন কিছু করতে চাই না। তবে আমি আশা করি, আপনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন ও উদারতা থেকে উপকৃত হবেন”, আব্দুল মালিক বলেন। ইমাম বলেন: “আপনার পৃথিবী বা আপনার সম্পত্তির আমার কোনো প্রয়োজন নেই।” (বিহারুল আনওয়ার।)
নবীর (সা.) পরিবারের সঙ্গে উমাইয়াদের জঘন্য আচরণ, পরবর্তী প্রজন্মের মর্যাদাকে আরও বাড়িয়ে দেয় ও উন্নত করে। এক হজ্বযাত্রায় হিশাম ইবনে আব্দিল মালিক কাবাগৃহের কালো পাথর স্পর্শ করতে চান কিন্তু হজ্বযাত্রীদের ভিড়ের ফলে তিনি সেখানে পৌঁছতে ব্যর্থ হন। তাই এক কোণায় বসে দৃশ্য দেখতে থাকেন। আর এমনই সময় এক সুদর্শন ও হালকা-পাতলা লোক, পাথরটির দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যান এবং উপস্থিত জনতা তাঁর সম্মুখ থেকে সরে দাঁড়ায়।
হিশামের আশেপাশে থাকা সিরিয়ার লোকেরা তাকে জিজ্ঞাসা করে যে, লোকটি কে? হিশাম, ইমামকে (আ.) ভালোভাবে চিনা সত্তে¡ও দাবি করেন: “আমি তাঁকে চিনি না!” এই মুহূর্তেই বিখ্যাত আরবীয় কবি ফারাযদাক যিনি দলবলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, ইমামের (আ.) প্রশংসায় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি শুরু করেন: “এই এমনই এক মানুষ যার পদচিহ্ন মরুভূমি চিনে। কাবা ও এর আশপাশ তাঁর পরিচিত। তিনি ধার্মিক, পরিষ্কার ও বিখ্যাত। কালো পাথরখানা তাঁর পায়ে চুমু খেতে খেতে মাটিতে পড়ে যেত, কে ছুঁবে তা জানত। হিশাম! আপনি যখন দাবি করেন যে, আপনি তাঁকে চেনেন না তখন এটি মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আরব-অনারব সবাই তাঁকে ভালোভাবেই জানে।” (কিতাবুল আগানী।)
ফারাযদাকের কবিতা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, হিশাম ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে আটকের নির্দেশ দেন। ইমাম তখন কবির প্রতি সমবেদনার বার্তা পাঠান। যদিও তিনি উমাইয়া শাসকদের ঘৃণা করতেন তবুও কখনও তাদেরকে সুপথ দেখানোর সুযোগ হাতছাড়া করেননি। আব্দুল মালিকের শাসনামলে খ্রীস্টান ত্রিত্ববাদ (Trinity) সর্বত্র দৃশ্যমান ছিল; এমনকি মুসলিম অঞ্চল মিশরে বুননকৃত কাপড়ে ত্রিত্বসত্তা ছাপানো হয়। মুসলিমরা এই প্রথায় আপত্তি জানায় এবং আব্দুল মালিককে একত্ববাদের প্রতীক প্রতিস্থাপন করতে বলে।
রোমান স¤্রাট এই অনুরোধের সংবাদ শুনতে পেয়ে আব্দুল মালিককে মিশরের বুননকৃত কাপড়ে কোনোরূপ পরিবর্তনের অনুমতি না দেয়ার দাবি জানায় এবং হুমকি দেয় যে, তারা যদি তা করে তবে নবীর (সা.) অপমানজনক চিত্র সহকারে মুদ্রা তৈরী করবে। সেই সময় সমগ্র ইসলামী বিশ্বে রোমান মুদ্রিত মুদ্রা ব্যবহৃত হত। আব্দুল মালিক ইমামের (আ.) নিকট সাহায্য চান এবং ইমাম পরামর্শ দেন যে, তারা যেন ইসলামী স্লোগান সম্বলিত তাদের নিজস্ব মুদ্রা তৈরী করে। অতঃপর “আশহাদু আন্ লাইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ্”; অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, বাক্যটি খোদাইকৃত ইসলামী মুদ্রা ছাপানো হয় এবং এর ফলে রোমান সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রভাব হ্রাস পায়।
ইমামের দোয়া:
সহীফায়ে সাজ্জাদিয়ায় ৫৪টি দুয়া রয়েছে যার সবই চতুর্থ ইমাম (আ.) থেকে বর্ণিত। এই বইয়ে বিশ্বাসের এক বিস্তৃত অধ্যায় রয়েছে। মত প্রকাশের সীমাবদ্ধ স্বাধীনতার কারণে তাঁকে (আ.) প্রার্থনার মাধ্যমে সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনধারা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করতে হয়। প্রখ্যাত মিশরীয় ব্যাখ্যাকার তানতাভী বলেন: “সহীফায়ে সাজ্জাদিয়া অনন্য এক শিক্ষার বই। মিশরীয়রা এই অমূল্য ম্যানুয়ালটির মূল্য বুঝতে পারেনি – ইত্যাদি।”
“হে খোদা! মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গকে বরকত দান করুন। যে আমার প্রতি জুলুম করে তার বিরুদ্ধে আমার একখানা হাত, যে আমার সঙ্গে বিবাদ করে তার বিরুদ্ধে এক জিহ্বা এবং যে আমাকে একগুঁয়ে প্রতিরোধ করে তার বিরুদ্ধে আমাকে বিজয়ী করুন!” (সহীফায়ে সাজ্জাদিয়াহ্, ২০তম দুয়া।)
সহীফায় বর্ণিত কতক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যা বিশ্ববাসী জানত না:
“প্রভু! তুমিই জানো অন্ধকার ও আলোর ওজন। তুমিই ছায়া ও বাতাসের ওজন সম্পর্কে অবগত …।” (সহীফায়ে সাজ্জাদিয়াহ্, ৫১তম দুয়া।)
২৭তম দুয়ায় ইমাম (আ.) আল্লাহর শত্রুদের অভিশাপ দেন এভাবে: “হে আল্লাহ! তাদের পানিকে মহামারীর সঙ্গে এং খাবারকে রোগের সঙ্গে মিশ্রিত কর। তাদের শহরগুলোকে ধ্বংস ও তাদেরকে ঝাঁকুনি দিয়ে হয়রান কর! খরার মাধ্যমে তাদের রসদপত্রকে তাদের থেকে দূরে রাখ! তাদের দূর্গ থেকে তাদের বাধা দাও এবং তাদের অবিরাম ক্ষুধা ও বেদনাদায়ক অসুস্থতায় আঘাত কর!” (সূত্র : শাফাকনা, অনুবাদে: মল্লিক শিহাব ইকবাল।)

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔