বিশ্ব মানবতার নেতা ইমাম হোসাইন ও কারবালা

by Rashed Hossain

মোহাম্মাদ নাজির হোসাইন
লেখক ও গবেষক

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম বলেন : ‘নিশ্চয়ই হোসাইন হেদায়েতের প্রদীপ ও মুক্তির কান্ডারী’ (নাসিখুত্ তাওয়ারিখ-পৃ: ৫৭)
কোন সমাজের সত্য পথের পথিকরা যখন আলোকিত মানুষের কথা বলেন, ন্যায়-ইনসাফপূর্ণ সমাজের কথা ভাবেন তখন তাঁরা মানবেতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল উত্থানের মাঝে উপমা দেখতে চান। আর তা থেকে শিক্ষা নিতে চান। ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনগুলোর মধ্যে শীর্ষে যে আন্দোলনের অবস্থান তার অন্যতম হলো শহীদদের নেতা ইবনে আলী আল-ইমাম আল হোসাইন আলাইহিস সালাম-এর আন্দোলন যার বহুমাত্রিক আবেদন এই আন্দোলনকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
৬১ হিজরীর ১০ই মুহররম পূণ্যভূমি কারবালাতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম’র দৌহিত্র, বেহেশতের যুবকদের নেতা, ইমাম হোসাইন ইবনে আলী আলাইহিমাস সালাম’র এই মহান ত্যাগ ও কোরবানী কি পূর্বাপর সম্পর্কহীন নিছক একটি দুর্ঘটনা? না ভাগ্যের অপব্যাখ্যাকারী পাপিষ্ঠ এজিদের ভাষায় অদৃষ্টের লিখন? না বেহেশতের লোভে লোভাতুর ও শহীদের মর্যাদা পিয়াসী একদল আত্মহুতিদানকারীর কর্মকৌশলবিহীন আত্মদান? না খ্রিষ্টবাদের ইসলামী সংস্করণবাদিদের মত অনুযায়ী ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম তাঁর আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর প্রেমিকদের পাপ মোচন করে দিয়েছেন? তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি কি সত্যিই কাহিনীকারদের কাহিনীর মত পথ ভুলতে ভুলতে কারবালা প্রান্তরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন? আর সত্যিই কি দু’দল মুসলমানের ভুল বোঝাবোঝির মাঝেই কারবালার মহাদুর্ঘটনার পটভূমি লুকায়িত? ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম কি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্যই এজিদের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছিলেন? এজিদ, ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামকে বাইয়াত বা আনুগত্যের জন্য চাপ দিচ্ছিল এজন্যই কি ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন?
বাইয়াতের জন্য চাপ দেয়ার পূর্বে কি ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াজিদী লানাতুল্লাহি আলাইহি শাসন সম্পর্কে কিছু না বলে চুপচাপ ইবাদতে মশগুল ছিলেন? কি কারণেই বা তিনি আসন্ন হজ্বের মাত্র কিছু দিন পূর্বে মক্কা ত্যাগ করে কুফা অভিমূখে রওয়ানা হলেন? সর্বোপরি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের মাত্র ৫০ বছর পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাহাবীর জীবদ্দশায় কিভাবে ইয়াজিদ লানাতুল্লাহি আলাইহি’র বিচ্যুত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো? কিভাবেই বা মহানবীর প্রিয় দৌহিত্র নির্মমভাবে শহীদ হলেন। কেনই বা এই মহামানবের এতো বড় আত্মত্যাগের ঘটনাটির ওপর নানা ধুম্রজাল তৈরি করে আজো তাকে মজলুম করে রাখা হয়েছে?
কারবালার মহাবিপ্লবকে ধামাচাপা দেয়ার ইয়াজিদী লানাতুল্লাহি আলাইহি অপকৌশল ও অপপ্রচার এসব হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রশ্নের বিশ্লেষণধর্মী জবাব পেতে হলে আমাদের জানতে হবে ইমাম হোসাইন কে ছিলেন? তাঁর বংশধারা কি ছিল? তাঁর দাদা-দাদী, নানা-নানী, বাবা-মার ইতিহাস কি ছিল? ঠিক তেমনি ইয়াজিদ লানাতুল্লাহি আলাইহি কে ছিল? তার বংশধারা কি ছিল? তার দাদা-দাদী, নানা-নানী, বাবা-মার সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। জানতে হবে তৎকালীন সমাজ-পরিস্থিতি ও ঐ সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। কারবালা ট্র্যাজেডির ঘটনাপ্রবাহ। আশুরার পূর্বের ও পরের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব। আর পরবর্তী প্রজন্মের সাথে এ ঘটনার সম্পর্ক। আলোকিত সমাজ বিনির্মাণকারীদের জন্য প্রয়োজন এই মহাবিপ্লবের নেতা ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম-এর প্রকৃত জীবনের প্রামাণ্য সূত্রভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ জীবন ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া। মূলতঃ ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম-এর আন্দোলনের সবচেয়ে মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা প্রেরণার উৎস ছিলো। “আমার বিল মারূফ ও নাহী আনিল মুনকার।” ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ।’ ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম কারবালার তপ্ত মরুভূমিতে এমন এক অসাধারণ বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন যাকে নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। এই বিপ্লবকে পৃথিবীর মানুষ কারবালা নামে স্মরণ করে। এই বিপ্লবের ঘটনাবলী মানব বিশ্বের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছিল যার আলোচনা প্রায় সকল ভাষা ও সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। কারবালার ঘটনায় জীবনের সমস্যা ও তার সমাধানের দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়। কারবালার ছত্রছায়ায় মানবতার উৎকর্ষতা বৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়। দুর্বল নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষকে কারবালা জীবনের এক নতুন দিগন্তের প্রতি ধাবিত করেছে।
কারবালা বিশ্বমানবতাকে একটি নতুন ইতিহাস দান করেছে এবং সত্যপন্থীদের দান করেছে বিপ্লবী চিন্তা চেতনা। কারবালা সঠিক বিপ্লবের সঠিক পথ দেখিয়েছে, কারবালা নির্যাতিতদের একটি উত্তম অস্ত্রদান করেছে। কারবালা ধৈর্য্য ও সংকল্প সহিষ্ণুতা ও প্রশান্তি, বিনয় ও শৃঙ্খলা বোধের নাম।
কারবালার ঘটনাবলী রাষ্ট্র পরিচালকদের ন্যায়নীতি শিক্ষা দেয়। কারবালা মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনের পথ দেখায়। কারবালা নারীদের নতুন জীবন দান করেছে। কারবালা একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধানের বাস্তব নমুনা। কারবালা একক ও সামাজিক জীবন বিধানের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরের প্রতিচ্ছবি। কারবালা পিতা-পূত্র, ভগ্নি-স্ত্রী, স্বামী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের দায়িত্ব পালনের একটি অনন্য আয়না স্বরূপ উপস্থাপন করেছে। কারবালা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের প্রকৃত পথ প্রদর্শন করে। কারবালার বিপ্লবে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলীর সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীর বুকে অসংখ্য বিপ্লব ঘটেছে। ইতিহাসের পাতা এ ধরনের ঘটনায় পরিপূর্ণ। আমরা যদি এ সকল ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখা যাবে এ সকল ঘটনাবলী নির্দৃষ্টগন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন আন্দোলন ও বিপ্লবের ঘটনাবলীর প্রভাব নির্দ্দিষ্ট এলাকা, অঞ্চল, গোত্র, কিংবা সমাজ ও নির্দ্দষ্ট ভৌগলিক সীমানা অতিক্রম করতে পারেনি, না বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করতে পেরেছে। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের সঙ্গী-সাথী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নারী-পুরুষ যেভাবে নির্ভীক চিত্তে অগণিত শত্রুসৈন্যদের মুখোমুখি বাধার প্রাচীর হয়ে দন্ডায়মান ছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোন ভূখন্ডে এমন কোন একটি ছোট্ট বাহিনী এরূপ সংকল্প ও প্রত্যয় নিয়ে নির্ভীক চিত্তে একটি বিরাট মানবতা বিরোধী সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি।
নিশ্চিত মৃত্যু অনিবার্য তারপরও হাসিমুখে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ার নজীরবিহীন ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে দুর্লভ। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম’র সংক্ষিপ্ত বাহিনীতে মনোবল এটাই প্রমাণ করছিল যে, এর পেছনে একটি মহান উদ্দেশ্য আছে। “জাতীয় ঐক্য” জাতীয় ঐক্যের জন্য জরুরি হলো এ ধরনের বৈপ্লবিক ঘটনা এবং দৃষ্টিভঙ্গী অনুসন্ধান করা; যার মধ্যে মানবতা ভ্রাতৃত্ববোধ, প্রেম-প্রীতি ও সহানুভূতির পাশাপাশি জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা অর্থনৈতিক, সামাজিক সংস্কৃতিক তাহজীব তামাদ্দুনের শিক্ষা পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিপ্লব এমন হওয়া উচিৎ যার মধ্যেই সত্য ও ন্যায়, ত্যাগ-তিতীক্ষা এবং ন্যায়-নীতির বাস্তব চিত্র পরিস্ফুটিত হয়। বিশ্বমানবকে কারবালা এমন এক দুর্লভ ও অসাধারণ শিক্ষা দিয়েছে যার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না।
‘কারবালা’ হক্ব ও বাতিলের উভয়ের মধ্যে একটি রেখা টেনে দিয়েছে। কারবালার ঘটনা ধনী-দরিদ্র বংশীয় পদমর্যাদা, দেশী-বিদেশী, ছোট বড় সবাইকে মানবতার মানদন্ডে পরিমাপ করে দেখিয়েছে। কারবালা জুলুমের বিষদাঁত ভাঙার মাধ্যমে জালিমরা কেয়ামত পর্যন্ত অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তার রণকৌশলের আয়োজন অর্থ, অস্ত্র কিংবা মানুষজনকে জমা করে নেননি।
ইমাম হোসেইন আলাইহিস সালামের বিপ্লব কোন দেশ, এলাকা, ভূখন্ড কিংবা কোন মাজহাব দল বা গোষ্ঠির জন্য ছিল না, মূলত: ছিল, বিশ্বের সকল স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য, হোক সে হিন্দু, শিখ, খৃষ্টান বা মুসলিম। বরং তার সংগ্রাম ছিল ন্যায়নীতি সত্যের অনুশীলন, সত্যের অনুশাসন ও মানবতার ঐক্য প্রতিষ্ঠা বিশ্বের সকল ‘মজলুমের হোসেইন’।
জাতীয় ঐক্য তখনই হতে পারে যেখানে কোন মত পার্থক্য থাকে না। যেখানে লোভ, হিংসা এবং অহঙ্কার থাকে না যেখানে ‘আমি এবং আমার’ বলতে কিছু থাকে না, যেখানে অন্যের সবকিছু দখল করে অন্যের জীবন কেড়ে নিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করা নয়, যেখানে নিজের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছার কাছে বিলীন করে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানবতার জীবন রক্ষা করা হয় তাকে বলে মানবতার নেতা।
কারবালায় দুঃখজনক ঘটনা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তাদের সুষমামন্ডিত আচরণ ও ন্যায় নিষ্ঠা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল প্রশ্নাতীত।
কারবালার বিপ্লব মানবতা ও জাতীয় ঐক্যকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। পৃথিবীর সকল সম্প্রদায় কারবালার ধ্বংসযজ্ঞের কথা স্বীকার করেছেন। পৃথিবীর অনেক বড় বড় নেতা তার স্বীয় জাতিকে কারবালার ঘটনা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে এবং হৃদয়ে এই ঘটনাকে সতেজ রাখায় তাকিদ করেছেন। আমাদের এই উপমহাদেশ বহু জাতিতে ও বিভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে গঠিত। এই ভূখন্ডে কারবালার বিপ্লবের একটি সুগভীর প্রভাব পড়েছে যে কারণে সকল মাযহাব ও সম্প্রদায়ের লোক নিজ ভাষায় কারবালার ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং খুবই সম্মান মর্যাদার সাথে ঘটনাকে স্মরণ করেন। আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, এই মহান শাহাদাতের ঘটনা জাতীয় ঐক্যের এক অনুপম উপমা সৃষ্টি করেছে। হিন্দু, শিখ ও মুসলমানদের মধ্যে অসংখ্য কবি জন্ম নিয়েছেন যারা কারবালার লোমহর্ষক ও মর্মস্পর্শী ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে তাদের কাব্যিক চেতনাকে উৎকর্ষতার চরম সীমানায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। কারবালা বিপ্লবকে কেন্দ্র করে হিন্দী কবি রাম রাও সিওয়া একটি মসনবী রচনা করেন এবং রওজাতুশ শোহাদা গ্রন্থের ছান্দিক তরজমা করেন। এ ছাড়া সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা যেমন পাঞ্জাবী, গুজরাটি, বাংলা, মারাঠা ইত্যাদি ভাষায় লিখিত কবিতায় কারবালার ঘটনা একটি বিশেষ স্থান জুড়ে আছে যার দ্বারা জাতীয় ঐক্যের উপমা সৃষ্টি হয়। এ উপমহাদেশের প্রায় সকল জাতি ও সম্প্রদায় মুহররম মাসে ইমাম হোসেইন আলাইহিস সালামের শোক পালন করে। যার ভিতর দিয়ে জাতীয় ঐক্যের একটি নমুনা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের হিন্দু শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায় ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের পবিত্র শাহাদাতে প্রভাবিত হয়ে মুহররম মাসে আহলে বাইতের অনুসারী ও ভক্তদের সাথে থেকে ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন আমরা মানবতার নেতার সঙ্গে আছি। মানবতাহীন নেতা ইয়াজিদকে ধিক্কার জানাই।
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা গান্ধীজি বলেন : কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনা আমি যখন পড়ি তখন আমি বয়সে তরুণ ছিলাম। কারবালার এই বীরের জীবনী খুব গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌছেছি যে, হিন্দুস্থানের মুক্তির একমাত্র পথ ইমাম হোসাইনের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব।
গান্ধীজিকে জনৈক এক ব্যক্তি যখন প্রশ্ন করলেন আপনি এমন এক বৃহৎ সাম্রাজ্য শক্তির সাথে মোকাবিলা করছেন যার রাজ্যে সূর্য্য অস্ত যায় না? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি দৃঢ়তার সাথে কারবালার উদাহরণ উল্লেখ করে গর্বভরে বলেছিলেন, যে শক্তি আমি ইমাম হোসাইন ইবনে আলীর কাছ থেকে পেয়েছি সে শক্তির সামনে বৃটিশ সাম্রাজ্যের কোন শক্তিই কাজে আসবে না।
গান্ধীজি আরো বলেন : আমি মনে করি ইসলাম তরবারির জোরে নয়, বরং ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের চরম বা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ফলেই বিকশিত হয়েছে। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের মহত আত্মত্যাগের ব্যাপক প্রশংসা করছি এ কারণে যে তিনি শাহাদাত ও পিপাসার যাতনা সয়ে নিয়েছিলেন নিজের জন্য, নিজ সন্তানদের জন্য এবং নিজ পরিবারের জন্য আর এই সবই সয়েছেন যাতে জালেম শাসকের কাছে নত হতে না হয়। মজলুম হওয়া অবস্থায় কিভাবে বিজয় অর্জন করতে হয় আমি তার শিক্ষা পেয়েছি ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের কাছে। ভারত যদি একটি বিজয়ী রাষ্ট্র হতে চায় তাহলে তাকে ইমাম হোসাইনের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। ইমাম হোসাইনের ৭২ জন বীর সেনানীর মত সেনা যদি আমার থাকতো তাহলে আমি ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ভারতের স্বাধীনতা এনে দিতে পারতাম।
সর্দার কির্তার সিং বলেন : যদি ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেতেন তাহলে সে রাষ্ট্র হতো ঐশ্বরিক। তা সত্ত্বেও শাহাদাতের পরও তিনি এমন এক রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন তা অন্য কোন মৃত ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি চিরঞ্জীব সিংহাসন ও মুকুটের অধিকারী।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন : ন্যায়বিচার ও সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে অস্ত্র ছাড়াই বিজয় আসতে পারে, জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে ঠিক যেভাবে মানবতার নেতা ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম শীতলতম হৃদয়কেও উষ্ণ করেন। ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ আধ্যাত্মিক স্বাধীনতাকে তুলে ধরে।
বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স বলেন : যদি ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম পার্থিব কামনা বাসনার জন্য যুদ্ধ করতেন তাহলে তিনি তাঁর বোন, স্ত্রী ও শিশুদের সঙ্গে আনতেন না। তিনি শুধু ইসলামের জন্যই ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
ইংরেজ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইল বলেন : আল্লাহর প্রতি ইমাম হোসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের ঈমান ছিল মজবুত। তারা দেখিয়ে গেছেন যে, যেখানে সত্য ও মিথ্যা মুখোমুখি সেখানে সংখ্যার আধিক্য কোন বিচার্য বিষয় নয়। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যে বিজয় অর্জন করেছেন তা আমাকে বিস্মিত করেছে।
বিখ্যাত ইংরেজ প্রাচ্যবিদ অ্যাডওয়ার্ড ব্রাউন বলেন : এমন কোন অন্তর পাওয়া যাবে কি? যে, যখন কারবালার ঘটনা সম্পর্কে শুনবে অথচ দুঃখিত ও বেদনাহত হবে না? এমনকি কোন অমুসলিমও এই ইসলামী যুদ্ধকে ও তাঁর পতাকাতলে যে আত্মিক পবিত্রতা সাধিত হয়েছে তা অস্বীকার করতে পারে না।
মহাকবি ডক্টর আল্লামা ইকবাল বলেন : ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের তরবারী ছিল “লা বা না” যার অর্থ আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। আর এই তরবারি দিয়ে তিনি কুফুরিকে বা ঈমানহীনতাকে ধ্বংস করেছেন। কারবালায় তিনি তাওহিদের চিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। এটা আমাদের মুক্তির শ্লোগান। আমরা আসলে ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের কাছ থেকে তাওহিদের শিক্ষা পেয়েছি।
মরহুম মুফতি মো. শফি বলেন : পবিত্র আহলে বাইত আলাইহিস সালামের ভালবাসা ঈমানের অংশ বিশেষ। ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর নিপীড়নমূলক ঘটনা এবং হৃদয়বিদারক শাহাদাত যার অন্তরে শোক ও বেদনা সৃষ্টি করে না, সে মুসলমান তো নয়ই, মানুষ নামের অযোগ্য।
কাজী নজরুল ইসলাম বলেন : ‘একদিকে মা ফাতেমার বীর দুলাল হোসাইনী সেনা আর এক দিকে যত তখত বিলাসি লোভী ইয়াজিদের কেনা”।
হিন্দের ওয়ালি খাজা মুইনউদ্দিন চিশতী (রহ.) বলেন : আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট হলেন ইমাম হোসাইন, বাদশা হলেন ইমাম হোসাইন। দীন হলেন ইমাম হোসাইন, দ্বীনের আশ্রয়দাতা হলেন ইমাম হোসাইন। দিলেন মস্তক, না দিলেন হাত, ইয়াজিদের হাতে। হক্ব তো এটাই যে, লা-ইলাহার সমস্ত স্তম্ভ হলেন ইমাম হোসাইন।
খাজা মুইনুদ্দিন চিশতী (রহ.) আরো বলেছেন : আমি নিজেকে ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের নামে সম্পূর্ণ উজার করেছি আমি তো কেবল তারই গোলাম, যে ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের গোলাম।
আল্লামা নুরুদ্দিন আবদুর রহমান জামী (রহ.) বলেন : সমগ্র সৃষ্টির হৃদয় হলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম, আর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লামের হৃদয় হলেন ইমাম হোসাইন ইবনে আলী আলাইহিস সালাম।
সেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লামের হৃদয় নিজের সবকিছু কুরবান করে আল্লাহর দীন ও এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী ও রাসূল-এর ইজ্জত সম্মান কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষা করলেন, তাঁর জন্য মানবতার চোখ দিয়ে এক ফোটা পানি বেরিয়ে আসলে বেদাত ফতোয়া দিবেন?
বস্তুত কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালামের এ আত্মমুক্তির বিষয়টি ছিল, ইতিহাসের একটি জ্বলন্ত অধ্যায় যা থেকে অনাদিকালের মুক্তিকামী মানুষ শিক্ষাগ্রহণ করে উপকৃত হবে। হোসাইনী বিপ্লবের মূল লক্ষ্য উপলব্ধি করতে হলে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হবে। উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে ‘তোমাদের সেই উন্মত হওয়া চাই যারা সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে।’ যে উন্মাতের মধ্যে এ গুণ আছে তারাই তো সফলকাম (সূরা : আলে ইমরান-১০৪)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের উপদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে বাধা দান করবে, নতুবা অধমরাই তোমাদের কাঁধে চেপে বসবে (ফুরুয়ে কাফী-৪/৫৬)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম তাঁর উন্মতকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন : তোমরা যদি মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাও তবে ‘আমর বিন মারূফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার’ কায়েম কর। নতুবা তোমরা হীন-দুর্বল ও অপমানিত হবে।
কুরআন-হাদীসের আলোকে হযরত ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াজিদের শাসনের সূচনালগ্ন থেকেই এই অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। তাই ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম বলেন : আমি ক্ষমতা বা যশের লোভে কিংবা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য বিদ্রোহ করছি না। আমি আমার নানার উন্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই। আমি চাই সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করতে এবং অসৎ কাজে বাধা দিতে, সর্বোপরি, আমার নানা এবং পিতা হযরত আলী আলাইহিস সালাম যে পথে চলেছেন সে পথেই চলতে চাই (মাকতালু খাওয়ারেযমী ১/১৮৮)
দৃষ্টিভঙ্গি বদলান জীবন বদলে যাবে। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। জানাকে মানায় রূপান্তর করতে না পারলে সে জানা অর্থহীন। সামাজিক মুখোশ নয়, অর্ন্তগত শক্তিই হচ্ছে ব্যক্তিত্ব। নিজের পরিবর্তন না এনে আমরা অন্যের পরিবর্তন দেখতে চাই। তাই আমাদের সত্যিকার পরিবর্তন আসে না।
একটি ভালো কথা এমন একটি ভালো গাছের মতো, যার শিকড় রয়েছে মাটির গভীরে আর শাখা-প্রশাখার বিস্তার দিগন্তব্যাপী, যা সারা বছর ফল দিয়ে যায় (সূরা: ইবরাহীম-২৪)
যে সমাজ মৃতপ্রায়, প্রাণস্পন্দনহীন হয়ে পড়েছে, যে সমাজে মানুষ তাদের বিশ্বাস হারাতে বসেছে। যে সমাজ আত্মসমর্পণ নীতি অবলম্বন করে নিজের সত্তাকে হারাচ্ছে যে সমাজের মানুষ নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বিস্মৃত, যে সমাজের মানুষ তার মানবিক সত্তা ও মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে অসচেতন, যে সমাজ তার উৎপাদিকা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, সেই সমাজের হৃৎপিন্ড হিসাবে ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম সেই শুষ্ক ও মৃত সমাজে আজও আধ্যাত্মিক রক্ত সরবরাহ করছেন। সমাজের গতিহীন লাশে আধ্যাত্মিক প্রাণ সঞ্চার করছেন। এই আশায় যে হয়তো এক দিন প্রাণ ফিরে পাবে। হয়তো বা একদিন আমরা জাগ্রত হবো।
ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম কোন দল, মাজহাবের বা গোত্রের নেতা নন। তিনি বিশ্বের মানবতার, মাজলুম ও মুক্তিকামি মানুষের নেতা। হোক সে হিন্দু, বোদ্ধ, খ্রিষ্টান, শিখ বা মুসলমান যাদের অন্তরে বিন্দু পরিমান মানবতা আছে তারা ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম এর এই মহান আত্মত্যাগকে প্রতিটি মুহুর্তে স্মরণ করতে বাধ্য। আর যারা মানবতাহীন তারা স্মরণ করবে না, এবং বসে বসে বে’দাত ফতওয়া ঝাড়বে।
“ইনসান্কো বের্দাতো হোলেনেদো, হার কোওম পুকারেগি হামারে হ্যায় হোসাইন।”
অর্থাৎ, “মানুষকে জাগ্রত হতে দাও, বিশ্বের সকল জাতি বলবে আমাদের হোসাইন।
বিশ্ব বিখ্যাত আলেম আল্লামা শাহ আব্দুল আজিজ মোহাদ্দেসে দেহলাভী (রহ:) তার গ্রন্থ সিররুস শাহাদাতাইন-এ লিখেছেন: “জাহির তো ইয়ে কাতলে ইবনে বাতুল হে” পার গওর কিজিয়ে তো ইয়ে কাতলে রাসুল হে”
অর্থাৎ, কারবালার ময়দানে আশুরার দিন এজিদী মুনাফেকরা খাতুনে জান্নাতের সন্তান, ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম কে শহিদ করেনি, যদি অন্তরের মানবতার চোখ দিয়ে দেখলে সত্যিকার অর্থে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম কে শহিদ করা হয়েছে।
ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম বিশ্বের মানবতার নেতা ও ঐক্যের প্রতিক তার বড় প্রমাণ হচ্ছে: আমরা যখন কোন দেশে ভ্রমণ করি তখন সেই দেশের একটা পতাকা থাকে সেই পতাকা আমরা আমাদের দেশে ব্যবহার করি না কিন্তু হোসাইনী পতাকা আপনি যে কোন দেশে উত্তোলন করতে পারেন, আর এই হোসাইনী পতাকার ছায়ায় একটু বিশ্রাম নিয়ে দেখুন না ঐশ্বরীক ও আত্মিক পবিত্রতা সাধিত হবে। এবং শীতলতম হৃদয়কেও উষ্ণ করবে এবং এমন এক আধ্যাত্মিকতার গভিরে প্রবেশ করবেন তখন আপনি নিজেকে প্রশ্ন করবেন আমি কে? আমি কেন এই পৃথিবিতে এসেছি? আমার দায়িত্ব কি? আমি কি পেলাম এটা উদ্দেশ্য নয় আমি কি দিলাম এটাই উদ্দেশ্য। নিজেকে জানো ! ! ! তুমি কে?
“মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু”
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিজেকে চিনেছে সে অবশ্যই তার রবকে চিনেছে।
পরিশেষে এটাই আবেদন করতে চাই যদি পৃথিবীর সকল সম্প্রদায় ইমাম হোসাইন আলাইহিস সালাম-এর নীতিকে গ্রহণ করে নেয় এবং এর উপর আমল করে তাহলে বিশ্বমানবতার সকল ঝগড়া ফ্যাসাদের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে।
“ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ”#######

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔