পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে অপবাদ

by Rashed Hossain

অনুবাদকঃ মাওলানা মোঃ শহিদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।

আয়াতসমূহঃ

  • ১- নিজের গোনাহ অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া : “যে ব্যক্তি ভুল কিংবা গোনাহ করে, অতঃপর কোন নিরোপরাধের ওপর অপবাদ আরোপ করে সে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ নিজের মাথায় বহন করে ।” (সূরা নিসাঃ ১১২)
  • ২- যা কিছু করল না সে ব্যপারে অপবাদ দেয়া : “যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” (সূরা আল আহযাবঃ ৫৮)
  • ৩- আল্লাহর পথপ্রদর্শদর ওপর অপবাদ দেয়া : “সে তো এমন ব্যক্তি বৈ নয়, যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে এবং আমরা তাকে বিশ্বাস করিনা।” (সূরা আল মুমিনুনঃ ৩৮)
  • ৪- ব্যক্তিত্বকে পদদলিত করা : “যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয়, তখন তারা বলে, তোমাদের বাপ-দাদারা যার ইবাদত করতঃ এ লোকটি যে তা থেকে তোমাদেরকে বাধা দিতে চায়। তারা আরও বলে, এটা মনগড়া মিথ্যা বৈ নয়। আর কাফেরদের কাছে যখন সত্য আগমন করে, তখন তারা বলে, এতো এক সুস্পষ্ট যাদু।” (সূরা সাবাঃ ৪৩)
  • ৫- পয়গম্বার (হযরত নূহ আ.)-এর ওপর অপবাদ : “তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বললঃ আমরা তোমাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মাঝে দেখতে পাচ্ছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, আমি কোন ভ্রান্ত নই; কিন্তু আমি বিশ্বপ্রতিপালকের রাসুল।” (সূরা আল আরাফঃ ৬০,৬১)

হাদীসসমূহঃ

  • ১- বৃহৎ গোনাহ : ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “কোন পূণ্যবান মুমিন ব্যক্তির ওপর অপবাদ দিলে বৃহৎ পাহাড় থেকে অধিক ভারি গোনাহ করা হবে।” (খেসাল, পৃ. ৩৪৮)
  • ২- শাস্তি : হযরত রাসুল করীম (স.) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে অপবাদ দিল অথবা তার সম্পর্কে এমন কিছু বলল যা তার মধ্যে দেখা যায় না এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা একটি আগুনের উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে দিবে যাতে সে স্বীয় মুমিন ভাই সম্পর্কে যে অপবাদ দিয়েছে তা প্রমাণ করে।” (বিহারুল আনোয়ার, খন্ড ৭, পৃ. ১৯৪)
  • ৩- তিরস্কার করো না : হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে নিজেকে অপবাদের বিষয়ে অভিযুক্ত করে, তাকে তিরস্কার করা উচিৎ নয়, তাহলে এ ব্যপারে তার সন্দেহ হতে পারে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ২, পৃ. ৭৬৩)
  • ৪- ঈমান দূর হয়ে যায় : ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “যে মুমিন স্বীয় মুমিন ভাইয়ের ওপর অপবাদ দেয়, ঈমান তার অন্তর থেকে এমন ভাবে দূর হয়ে যায় যেভাবে লবন পানি হয়ে যায়।” (কিতাবুশ শাফী, খন্ড ৪, পৃ. ৩৪৪)
  • ৫- অপবাদকারী অভিশপ্ত : ইমাম মুসা কাজেম (আ.) বলেছেনঃ “অভিশপ্ত ঐ ব্যক্তি যে স্বীয় দ্বীনি ভাইয়ের ওপর অপবাদ দেয়। (অসায়েলুশ শীয়া, খন্ড ১২, পৃ. ২৩১)

বিশ্লেষণ: অপবাদ একটি বৃহৎ গোনাহ। মুখ দ্বারা সংঘঠিত গোনাহের মধ্যে একটি গোনাহ হল অপবাদ। অপবাদ অর্থাৎ ধারণা ও সন্দেহের বেশে কারো সম্পর্কে খারাপ কথা বলা অথবা গোনাহগার বলে অভিহিত করা। যদি আমি কোন ব্যক্তিকে গোনাহ করতে দেখি তাহলে ঐ গোনাহের ক্ষেত্রে তাকে অভিহিত করা যাবে কিন্তু যখন আমি না দেখি তাহলে কোন ভাবেই আমার অধিকার নেই তাকে অভিযুক্ত করা। যদিও কোন নিদর্শন থেকে থাকে। অপবাদ দিয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে কোন পূণ্যবান নারী ও পুরুষকে মানুষের মধ্যে অপমান ও অপদস্থ করি। কতবড় জঘন্য কাজ যে মানুষ কারো সম্পর্কে গোনাহের অপবাদ দেয় যদিও সে এ থেকে পবিত্র এবং কতবড় অপছন্দনীয় কথা যে, মানুষ অনর্থক ও ভিত্তিহীন কোন কিছুর ওপর নির্ভর করে কোন সম্মানিত মানুষকে অসম্মান ও অপদস্থ করে। নিশ্চিতভাবে এ ধরণের মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকে।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি চৌদ্দ মাসুম (আ.)-এর ওসিলায় আমাদের সবাইকে অপবাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার তৌফিক দান করেন। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- অমুসলমানদের ওপরও অপবাদ দেয়া বৈধ নয়: আমর বিন নো’মান জায়াফি বলেছেনঃ হযরত ইমাম সাদেক (আ.)-এর এক বন্ধু ছিল, ইমাম (আ.) যেখানেই যেতেন তিনিও ইমাম (আ.)-এর সাথে যেতেন, ইমাম (আ.) থেকে পৃথক হতেন না। একদিন তিনি ইমাম (আ.)-এর সাথে বাজারে গেলেন এবং তার সাথে তার গোলাম যে অমুসলিম ছিল সেও গিয়েছিল। কিন্তু পথিমধ্যে গোলাম কোথাও আড়াল হয়ে গেলে তিনি তিনবার পিছনের দিকে তাকালেন কিন্তু গোলামকে দেখতে না পেয়ে যখন চতুর্থবার তাকালেন তখন গোলামকে দেখতে পেয়ে তিনি বললেনঃ হে দুশ্চরিত্রা মহিলার ছেলে তুমি কোথায় ছিলে। বর্ণনাকারী বললেনঃ ইমাম সাদেক (আ.) তাঁর হাত তাঁর কপালে মেরে বললেন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি, তুমি এর মার ওপর অপবাদ দিয়েছো! আমি ভাবতাম তুমি একজন পরহেযগার ব্যক্তি কিন্ত আমি তোমার মধ্যে পরহেযগারীর কোন চিহ্ন দেখছি না। তিনি বললেনঃ আমার জীবন আপনার ওপর কুরবানী হোক! তার মা প্রমাণিত মুশকির। হযরত (আ.) বললেনঃ তুমি কি জাননা প্রত্যেক উম্মত ও ধর্মে বিবাহ হয়ে থাকে? আমার থেকে দূর হয়ে যাও। বর্ণনাকারী বললেনঃ এরপর আমি কখনো তাকে ইমামের (আ.) সাথে দেখিনি, এ সময়ের মধ্যে সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিল।
(গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ২৬১, দস্তানহয়ে আখলাকি, পৃ. ২০১, এবং চেহেল হাদীসে রাসূলে মাহাল্লাতী, খন্ড ২, পৃ. ১৬৬)

২- অপবাদের শাস্তি: হযরত মুসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক কারুনের কাছে যাকাতের দাবি করলেন কিন্তু সে বললো আমি তওরাত পড়েছি এবং আমি মুসা থেকে কোন অবস্থায় কম নয়, কেন আমার সম্পদের যাকাত মুসাকে দিব?

বস্তুত কারুন অবিশ্বাস ও অহংকারের ফলে একটি বিপদজনক পরিকল্পনা করল, আর তা হলো সে এক পতিতা মেয়েকে বলল, আমি তোমাকে কয়েক হাজার দেরহাম দিব আগামীকাল যখন হযরত মুসা বক্তৃতা দেবে তখন তুমি লোকজনের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে (নাউজুবিল্লাহ) মুসা আমার সাথে যেনা করেছে। ঐ মেয়েটি তার এই প্রস্তাব কবুল করল কিন্তু যখন সে হযরত মুসা (আ.) এর নুরানী চেহারা দেখল তখন সে তার পরিকল্পনা ত্যাগ করল এবং চিৎকার করে বললঃ আমি এক লক্ষ্য দেরহাম অপকর্মের অপবাদ দেয়ার জন্য নিয়েছি কিন্ত আল্লাহ তায়ালা তোমাকে এ ধরণের কলুষিতা থেকে পাক ও পবিত্র রেখেছেন। এ সময় হযরত মুসা (আ.)-এর মন ভেঙ্গে গেল এবং কারুনের জন্য বদ দোয়া করলেন, হে জমিন কারুনকে ধরে নিজের ভিতরে নিয়ে যাও! জমিন নিজের মুখ খুললে কারুন জমিনের ভিতরে ঢুকে গেল ও কঠিন আযাবের মধ্যে পতিত হল।

কারুনের ধ্বংসের পর বনি ইসরাঈলের মূর্খ সম্প্রদায়ের লোকেরা একে অপরকে বলতে লাগল, মূসা (আ.) কারুনকে বদ দোয়া করেছিল যাতে সে ধ্বংস হয়ে যায় আর তার ধন-দৌলত আত্মসাৎ করতে পারে। হযরত মূসা (আ.) এই অপবাদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ কারুনের ধন-দৌলতও ধ্বংস করে দাও, দোয়া কবুল হল কারুনের ধন-দৌলতও ধ্বংস হয়ে গেল। (গাঞ্জিনে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ২৬১)

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔