লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী
ইমাম হোসাইন (আঃ) এর পবিত্র শাহাদাত স্মরণে আযাদারী নবী (সাঃ) এর বংশধরদের প্রতি ভালবাসার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত। এর চাইতে হক ও বাতিলের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি আর কোথায় দেখা যায়? আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) ছিলেন পরিপূর্ণ হক-এর উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বাতিল কখনও আবু জেহেলের রূপে, কখনও আবু লাহাবের রূপে প্রকাশিত হয় যাদের বাতিল ও কাফের হওয়া ছিল সূর্যালোকের মত সত্য। এখন থাকলো আবু সুফিয়ান যে ছিল বাতিল শক্তির ধ্বজাধারী, হকের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। কিন্তু এমন এক সময় আসে যখন ইসলামের পোষাক পরিধান করে সে নেফাকের কাজ আঞ্জাম দিতে থাকে। রাসুআল্লাহ (সাঃ) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল কাফেরদের সাথে। কিন্তু ইসলামকে প্রতিহত করতে মোনাফিক শক্তি চিন্তাগত ও সু-সংগঠিত ভাবে ইসলামী পোষাকে খলিফাতুল মুসলিমীনের রূপে দেখা দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে হক থেকে বাতিলকে পৃথক করা ছিল দুরূহ একটি কাজ যেখানে বক্তৃতা, আলোচনা, রচনা কিংবা তাবলীগ কোন কাজে আসেনি। তাই একমাত্র শাহাদত ও কুরবানী ছিল এমন এক হাতিয়ার যা বাতিলের চেহারা থেকে মুখোশ উন্মোচন করতে পারতো এবং হক ও বাতিলের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে পারতো। আমার এ দাবির সপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হচ্ছে যে, এমন খলিফাকে কী ভাবে অসম্মানিত করা যাবে যাকে ‘জিলুল্লাহ’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে অথবা সেই হাদীসের বর্ননা মতে যেখানে হযরত আবু বকর বলেন যে, আমি রাসুল্ললাহ(সাঃ) কে বলতে শুনেছি যে “যে ব্যক্তি শাসককে অসম্মানিত করবে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে অসম্মানিত করবেন” (জামায়ে তিরমিযী, খঃ ২, পৃঃ ৫৩)। এ ধরণের হাদীসের আলোকে কোন শাসকের বিরুদ্ধে সে অত্যাচারীই হোক না কেন তাকে কে অসম্মানিত করতে পারে? এর জন্য প্রয়োজন ছিল কুরবানীর।
মুয়াবিয়া কতটা সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিল তা হযরত আম্মার ইয়াসিরের শাহাদাতের পরই বোঝা উচিৎ ছিল। কেননা রাসূল (সাঃ) স্বয়ং ইরশাদ করেছিলেন যে, ‘হে আম্মার! একদল বিদ্রোহী তোমাকে হত্যা করবে’।
হযরত আবু হোরায়রা হতে বর্ণিত যে রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেন, ‘হে আম্মার তোমাকে সু-সংবাদ দিচ্ছি যে, একদল বিদ্রোহী তোমাকে শহীদ করবে’। (জামায়ে তিরমিযী, খঃ ২, পৃঃ ৭৪৯)।
এ বিষয়টি ইমাম হোসাইন (আঃ) সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। একদিকে ইয়াজীদের পরিচয় তুলে ধরেন যেমন রাসূল (সাঃ) মুয়াবিয়ার পরিচয় স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। অপরদিকে যে মূহুর্তে ইয়াজীদ খেলাফতের সিংহাসনে আরোহণ করে ইমাম হোসাইন (আঃ) ইরশাদ করলেন-“ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন”। উম্মতের আমীর যদি ইয়াজীদের ন্যায় ব্যক্তি হয় তাহলে সে ইসলামকে আল্লাহই রক্ষা করুন”। ইমাম হোসাইন (আঃ) এর এমন উক্তির মাধ্যমে ইয়াজীদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় এবং এর মাধ্যমে একটি উসূল বা নীতিও তিনি স্পষ্ট করে দিলেন। এর পাশাপাশি ইমাম (আঃ) এর এই প্রসিদ্ধ উক্তিটিও একটি উসূল হিসেবে নির্ধারিত হল। তিনি বলেন “নিশ্চয় মৃত্যুকে আমি সৌভাগ্য ও সফলতা জ্ঞান করি এবং জালিমদের সাথে বাস করাকে গ্লানি ও অপমানকর মনে করি। একাজটি ছিল ঠিক তদরূপ যেমন রাসুল (সাঃ) করেছিলেন মুয়াবিয়ার পরিচয় স্পষ্ট করে দিয়ে। আলীও (আঃ) একই কাজ করেছিলেন। কিন্তু ইমাম হোসাইন (আঃ) বাতিল শক্তিকে অসম্মানিত করার এমন এক ব্যবস্থা করেন যার পর হোসাইন (আঃ) একটি মতাদর্শের রূপ লাভ করে।
হোসাইন (আঃ) থেকে হোসাইনিয়াত এবং ইয়াজীদ থেকে ইয়াজীদিয়াত। অর্থাৎ, একদিকে পরিপূর্ণ হক অপরদিকে পরিপূর্ণ বাতিল। শুধু এতুটুকুই নয় ভবিষ্যতের পথ প্রদর্শনও স্বয়ং কারবালা করবে।
একদিকে হোসাইন (আঃ) রাসূল (সাঃ) এর সীরাতের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে সামনে এলেন, অপরদিকে কুফর ও নেফাকের ছদ্মবেশে খলীফাতুল মুসলিমীন হিসেবে ইয়াজীদ নিজেকে প্রকাশ করল। কুফর দ্বারা ধোকা বা প্রতারিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। ধোকা হয় সেখানে যেখানে উভয় দিকে একই কলেমার ধারকের অবস্থান থাকে এবং সত্যিকারার্থে মুসলমানরা ধোকা খেলেনও। উভয় পক্ষের লোকদের কখনও কখনও “রাজিয়াল্লাহ” শব্দ দ্বারা বিশেষায়িত করা হয়। কিন্তু রাসূল (সাঃ) এর সন্তান এগিয়ে এসে মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাতিলের দেহ থেকে ইসলামের পোষাক খুলে স্পষ্ট করে দিলেন যে, আমার মোকাবিলায় এগিয়ে আসা শক্তি বাতিল ছাড়া অন্য কিছু নয়। এ নিয়ম-নীতি শত শত বছর ধরে কায়েম রয়েছে এবং ইসলাম ধর্মেরও একই নীতি আমরা দেখতে পাই যে, সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর সত্যাশ্রয়ী হওয়া এবং সত্যের পক্ষাবলম্বন এবং মিথ্যা বা বাতিল থেকে বিচ্ছেদ ও অসন্তষ্টি প্রকাশ করা। কেননা জুলুম দেখে নিশ্চুপ থাকাও জুলুম। আমরা ‘যেয়ারতে ওয়ারিসা’ নিয়মতি পড়ি। যেয়ারতে ওয়ারিসাতেও এ নীতির প্রতি তাকিদ করা হয়েছে যে, “আল্লাহ্র লানত বর্ষিত হোক যে হত্যা করেছে, লানত হোক তার উপর যে জুলুম করেছে এবং লানত হোক তার উপর যে জুলুম দেখেও নীরব থেকেছে”। জীবনের উদ্দেশ্য যদি দ্বীন হয়, ঈমান ও তাকওয়া হয় তাহলে এ নীতির উপরও আমল করা অত্যন্ত জরুরী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ, “হে ঈমানদারগণ! তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে হয়ে যাও”।
ইমাম হোসাইন (আঃ) যদি হকের উপর থাকেন এবং নিঃসন্দেহে তিনি হকের উপরে ছিলেন এবং রাসূল (সাঃ) এর সন্তান ও পরিবারের (নিকট আত্মীয়) অন্তর্ভূক্ত ছিলেন সে ক্ষেত্রে তার প্রতি ভালবাসা যেমন ফরজ, ভালবাসার প্রকাশও তেমনি ফরজ।
অতএব, বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হোসাইন (আঃ) এর পক্ষাবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহ্র অভিসম্পাৎ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সত্যবাদীদের সাথে হওয়ার অর্থ যাতে তাকওয়া এবং মুয়াদ্দাত ও মুহাব্বত এর হক আদায় করা যা আল্লাহ্র নির্দেশ মান্য করতে হলে মুয়াদ্দাত ও মুহাব্বতের হক আদায় করতে হবে এবং এর বিকল্প নেই। ইরশাদ হচ্ছে “হে নবী বলে দিন আমার রিসালতের বিনিময়ে কিছই চাইনা একমাত্র আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা (মুয়াদ্দাত)”। (সূরাঃ শূরা, আয়াতঃ ২৩ )
আর এ আযাদারী হচ্ছে ভালবাসা প্রকাশের মাধ্যম ও ঘোষণা। আল্লামা ইকবাল হলেন-
“আগার চে বুত হায় জামাত কি আস্তিনো মে
মুঝে হায় হুকমে আযান লা ইলাহা ইল্লাহ”।
অর্থঃ যদিও জামায়াতের (নামাযে দন্ডায়মান ব্যক্তিবর্গ) আস্তিনে মূর্তি আছে
আমি আদিষ্ট হয়েছি আযানে লা ইলাহা ইল্লালহ ধ্বনি তুলতে।
আযাদারীর অন্তর্নিহিত তত্ত্ব ও দর্শন যারা বোঝেননি তারা বিদআত ও শিরক এর ফতোয়া তো দিতে পারেন; কিন্তু যারা জানেন বিদাআত ও শিরক কী এবং সত্যের প্রকাশকেও যারা জরুরী মনে করেন তারা আযাদারীর গুরুত্বকে বুঝেন।
এ আযাদারী অনেক বড় বড় বিপ্লবের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। হযরত যয়নাব (আঃ) এর আযাদারী ইয়াজীদের রাজপ্রাসাদ প্রকম্পিত করেছিল যার পর কোন ইয়াজীদ ও ইয়াজীদি শক্তির সাহস হয়নি পরবর্তী ইমামগণের (আঃ) নিকট হতে বায়াতের দাবি তোলার। যেখানে আযাদারী ছিল, রাজতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান ও পদাঘাত করে সেখানে এক মহান বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে।
হযরত ইমাম খোমেনী (রহ) স্বয়ং বলেন যে, এ বিপ্লব ইমাম হোসাইন (আঃ) এর মহান শাহাদাতের কাছে চির ঋণী। আমার কাছে যা আছে তার সবকিছুর ভিত্তি কারবালা। (মা হারচে দারিম আয কারবালা দারিম)
যারা হোসাইন (আঃ) কে বুঝতে পারেনি সেখানে আজও রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন এবং জুলুম অত্যাচার অব্যাহত আছে। তাই ইয়াজীদি শক্তি ধ্বংসের লক্ষ্যে হোসাইনিয়াতের প্রচার খুবই জরুরী যার উৎকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে আযাদারী।
আমরা স্বীয় আমলের প্রতি সন্তুষ্ট; তাই বলে অন্যদেরকেও নিরুত্তর ছাড়তে চাই না যারা প্রতিনিয়ত বিদআত ও শিরক এর শ্লোগান অবিরাম গতিতে দিয়ে চলেছেন।###
