জন্মঃ হযরত যয়নাব (আঃ) ১লা শাবান কিছু কিছু রেওয়াতে ৫ই জমাদিউল আওয়াল, অষ্টম হিজরীতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন।
পিতামহঃ হযরত আবু তালিব, পিতামহীঃ হযরত ফাতিমা বিনতে আসাদ, পিতাঃ আমিরুল মোমিনিন হযরত আলী (আঃ),
মাতাঃ হযরত ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ (আঃ), পদবীঃ হাশিম বংশের আকিলা (বুদ্ধিমতি), উপাধিঃ উম্মে মাকছুম।
তাঁর বিবাহ হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সাথে হয়। সন্তানের সংখ্যা পাঁচ। যথাঃ (১) আলী, (২) আওন আকবর, (৩) মুহাম্মদ, (৪) আব্বাস, (৫) কুলছুম।
হযরত যয়নাব (আঃ)-এর গুণাবলীঃ
(ক) শিক্ষাঃ কারবালা কুফা ও শামের দীর্ঘ সফরে বিভিন্ন সময়ে অত্যাচারী শাসকদের কিংবা জন সাধারণের সম্মুখে যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে অতি সহজে বোঝা যায় যে, এই মহান বিবির শিক্ষা কত উচ্চমানের যদিও তিনি কোন শিক্ষকের নিকট হতে তা গ্রহণ করেননি, এর সমর্থন হযরত যয়নুল আবেদীন (আঃ) এর নিম্নোক্ত বাক্য থেকে বোঝা যায়। যে বাক্য হযরত যয়নাব (আঃ) এর জন্য এরশাদ করেছেনঃ
অর্থাৎ, আলহামদু লিল্লাহ আপনি বিনা শিক্ষকে শিক্ষিত ও বিনা ওস্তাদে বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষার জলসায় ও কুরআনের তাফসিরের জলসায় কুফাবাসী মহিলাদের নিকট থেকে এনার শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায়।
(খ) বাগ্মিতা ও বাকপটুতাঃ যে বক্তব্য যেখানে উপযোগী সেখানে সেই বক্তব্য রেখেছেন, বক্তব্যে গাম্ভীর্য ও বাগ্মিতা দিয়ে জনসাধারনের নিকট হৃদয়গ্রাহী করেছেন। এই সমস্ত ভাষণ থেকে বোঝা যায় যে, হযরত যয়নাব (আঃ) বাগ্মী ছিলেন, আর জানতেন কোথায় কেমন বক্তব্য রাখতে হয়, সামঞ্জস্য বজায় রাখা, যেন কেউ অপছন্দ না করে, কেউ যেন রাগ না করে, যেন ভাষণ সময় ও অবস্থার বিপরীত না হয়…….।
কিন্তু আমরা দেখছি যে হযরত যয়নাব (আঃ) কুফা ও শামের পথের মাধ্যমে চারুবাক ও বাগ্মি খোৎবা দিয়েছেন, এমন দুঃখে ও ক্লেশের মাঝে এমন ভাষণ দেওয়া বাকপটুতা ও বাগ্মিতার পরিচয় বহন করে। হযরত যয়নাব (আঃ) এমন এক মহিলা যার চোখের সামনে বাহাত্তর জন প্রিয়কে শহীদ করা হয়েছে। বাকি অবশিষ্টদের বন্দী করা হয়েছে, শহীদদের শিরগুলি যাত্রীদলের সামনে বর্শার আগায় গেঁথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ক্ষুধার্ত অবস্থায়, অনিদ্রা অবস্থায়, শত্রুদের অসম্মানজনক আচরণ এবং অশিক্ষিত ও মুর্খদের কটু বাক্য হযরত যয়নাব (আঃ) এর অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত ও ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল তবুও এমনই ভাষণ দিয়েছেন যে তার প্রভাব শত্রু ও অত্যাচারীদের অন্তরে তীরের মত গেঁথে দিয়েছে।
(গ) আল্লাহর পথে জেহাদ ও উৎসর্গঃ হযরত যয়নাব (আঃ) যখন অনুভব করলেন যে আল্লাহর পথে দ্বীন ইসলামের জন্য জীবন, জান ও মাল দ্বারা জেহাদ করতে হবে ক্ষনিকের জন্যও অলসতা করলেন না, বরং পূর্ণাঙ্গ উৎসর্গের আকাঙ্খা নিয়ে নিজের শহর ও স্বামীর ঘরকে ছেড়ে নিজের কর্তব্যকে পালন করেছেন। আর গুরুত্বপূর্ণ উৎসর্গগুলি এই যে তিনি নিজে এবং নিজের দুই পুত্র সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর কাফেলার (যাত্রীদের) সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন। সম্ভবত বলা যেতে পারে যে, যদি তাঁর এই উৎসর্গ ও বীরত্ব না থাকত তাহলে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর উদ্দেশ্য এবং বক্তব্য প্রচারই হত না।
এমনকি এক দুঃখিনি মা যে সমস্ত যাত্রার পথে সমস্ত ওয়াজ-নসিহতে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর সঙ্গে ছিলেন এবং ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের পর কাফেলার নেতৃত্বের ভার হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাঁধে নিলেন এবং আশুরার বার্তাকে সকলের কাছে পৌঁছাতে লাগলেন। যদি ইতিহাসের পাতা পাল্টানো যায় তো দেখা যাবে যে এই কর্তব্যকে কত সুন্দরভাবে পালন করেছেন এবং সর্বকালের জন্য দুনিয়াবাসিদের হয়রান ও হতভম্ব করে দিয়েছেন।
(ঘ) ইবাদতঃ বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত যয়নাব (আঃ) সমস্ত জীবন রাত জেগে ইবাদত করেছেন। এ পর্যন্ত যে দশই মহারমের পরে যে রাত এসেছে সেই রাতেও রাতের ইবাদতকে পালন করেছেন।
হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ এগারো মহররমের রাতে আমার ফুফিআম্মা জনাবে যয়নাবকে নামাজরত অবস্থায় দেখেছি। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম জয়নুল (আঃ) এরশাদ করেছেনঃ আমার ফুফিআম্মা যয়নাব (আঃ) এত বালা মসিবত সত্যেও কারবালা থেকে শাম পর্যন্ত নফল নামজকে ছাড়েননি বরং সকল মসিবত সহ্য করেও নফল নামাজ পড়েছেন। এছাড়াও বর্ণিত হয়েছে যে, যখন ইমাম হোসাইন (আঃ) শেষ বিদায় চান তখন নিজের বোনের উদ্দেশ্যে একটি বাক্য উপদেশস্বরূপ বলেছিলেন তা এই বাক্য ছিলঃ হে বোন! তুমি আমাকে নিজের তাহাজ্জুদ নামাজে ভুলে যেওনা অর্থাৎ, আমাকে তুমি তাহাজ্জুদ নামাজে স্মরণ রেখ।
(ঙ) মসিবতে ধৈর্যশীলঃ হযরত যয়নাব অনেকগুলি বালা ও মসিবত সহ্য করেছেন যার মধ্যে নিম্নে কিছু দেওয়া হলোঃ
(১) হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ওফাতের মসিবত।
(২) হযরত আলী (আঃ) এর শাহাদতের ক্লেশ।
(৩) হযরত ফাতিমা (আঃ) এর শাহাদতের কষ্ট।
(৪) হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এর শাহাদতের যন্ত্রণা।
(৫) হযরত ইমাম হোসাইনের সঙ্গে যাত্রাকালীন কষ্ট ও পরিশ্রম সহ্য করা এবং দশই মুহাররমে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর শাহাদতের দুঃখ।
(৬) নিজের দুই নয়ন তারাকে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে দেখা। যাদের নামঃ (ক) আওন ও (খ) মুহাম্মাদ।
(৭) কুফা ও শামের মসিবত….।
কিন্তু ইনি এই সকল মসিবতের সময় নিজের কর্তব্যকে পালন এবং ইসলামকে সাহায্য করেছেন এবং ইমাম হোসাইনের সম্মানকে সকলের নিকট সুন্দরভাবে সুস্পষ্ট করেছেন এবং ৫৩ বৎসর বয়সে ৬১ হিজরীতে সম্মানিত অবস্থায় এই দুনিয়া থেকে পরলোক গমন করেছেন।
(চ) সফরসমূহঃ হযরত যয়নাব (আঃ) নিজের জীবনে অনেক জায়গায় সফর করেছেন যার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সফরগুলি উল্লেখ করা হলঃ
(১) মদীনা থেকে কুফা যখন হযরত ইমাম আলী (আঃ) খলিফা হন।
(২) কুফা থেকে মদিনা নিজের পিতার শহীদ হওয়ার পর।
(৩) মদীনা থেকে মক্কা ভাইয়ের কাফেলার (যাত্রীদলের) সাথে।
(৪) মক্কা থেকে কারবালা ইমাম হোসাইন (আঃ) এর সাথে।
(৫) ইমাম হোসাইন (আঃ) এর শাহাদতের পর কারবালা থেকে কুফা।
(৬) বন্দী অবস্থায় কুফা থেকে শাম শহরে। (সূত্রঃ ইন্টারনেট)###
1.3k
আগের পোস্ট
