রোজার ফিতরাঃ একটি গবেষণা ধর্মী আলোচনা

by Syed Tayeem Hossain

পূর্বে আমি আমার এ লেখাটি ভিন্ন শিরনামে প্রকাশ করেছি। যেহেতু উপলব্ধিটি গবেষণাধর্মী তাই এটি কিছুটা সংশোধন করে পুনঃ প্রকাশ করলাম। ফিতরা আদায়ে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে মানবিকতার একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে উপলব্ধিটা ব্যাপক ও বিস্তৃত হওয়া দরকার। আর তাই এ বিষয়ে আপনার সুচিন্তিত মতামতের আশা করছি।
(এক)
রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে আমরা সাদকাতুল ফিতরা আদায় করে থাকি। বাংলাদেশের মুসলমানেরা কেন অমুসলমানগণও এ বিষয়ের সাথে পরিচিতি। কারণ এ বিষয় নিয়ে নানারূপ আয়োজন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের আলেমদের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে চলতি বছরে ফেতরার মূল্য কত হবে। ধনীরা এবং রাজনীতিবিদগণ বা উদ্দেশ্যবাদীগণ তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে ফেতরা বা যাকাত প্রদানের জন্যে ক্যাম্প খুলে থাকেন। আর এরকম আয়োজনের কারণে মাঝে মাঝে নানারূপ অঘটনও ঘটে থাকে।

আসুন আমরা সাদকাতুল ফিতরের মূল কিছু উৎস সম্পর্কে জেনে নেই। আধুনিক প্রকাশনী, ২৫, শিরিশ দাস লেন, ঢাকা ১ থেকে ১৯৮৬ সনের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত বঙ্গানুবাদকৃত সহীহ আল বুখারী এর ২য় খন্ডের ৬১ থেকে ৬৩ পৃষ্ঠায় ক্রমিক নং ১৪০৬ থেকে ১৪১৫ পর্যন্ত মোট ১০টি হাদিস সাদকাতুল ফিতরের উপর বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো আমরা এখানে হুবহু তুলে ধরলাম।

অনুচ্ছেদঃ সদকায়ে ফিতর ফরয হওয়ার বর্ণনা। আবুল আলীয়া, আতা ও ইবনে সীরীন-এর মতে সদকায়ে ফিতর ফরয।
১৪০৬. ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুসলিম দাস ও স্বাধীন ব্যক্তি; নর ও নারী এবং বালক ও বৃদ্ধের উপর সদকায়ে ফিতর (রোযার ফিতরা) এক সা (এ দেশীয় ওজনে এক সা সমান তিন সের এগার ছটাক) খেজুর কিংবা এক সা যব নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তিনি এটাও আদেশ করেছেন যে, লোকদের (ঈদের) নামাযে যাবার পূর্বেই যেন তা আদায় করা হয়।
অনুচ্ছেদঃ সদকায়ে ফিতর মুসলিম দাস ও স্বাধীন সবার ওপর ওয়াজিব।
১৪০৭. ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুসলিম নর-নারীর স্বাধীন ও গোলাম প্রত্যেকের ওপর সদকায়ে ফিতর এক সা খেজুর অথবা এক সা যব নির্ধারিত করে দিয়েছেন।
অনুচ্ছেদঃ সদকায়ে ফিতর বাবদ এক সা যব প্রদান করা।
১৪০৮. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা সদকায়ে ফিতর বাবদ এক সা যব খাওয়ায়ে দিতাম।
অনুচ্ছেদঃ সদকায়ে ফিতর বাবদ এক সা খাবার প্রদান করা।
১৪০৯. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (রাসুলুল্লার যামানায়) সদকায়ে ফিতর বাবদ (মাথা পিছু) এক সা পরিমাণ খাবার অথবা এক সা যব অথবা এক সা খেজুর অথবা এক সা পনির কিংবা কিশমিশ-মোনাক্কা প্রদান করতাম।
অনুচ্ছেদঃ সদকায়ে ফিতর বাবদ এক সা খেজুর প্রদান করা।
১৪১০. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, নবী (সাঃ) সদকায়ে ফিতর বাবদ এক সা খেজুর অথবা এক সা যব প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ বলেন, (পরবর্তীকালে) লোকেরা (আমীর মুয়াবিয়া ও তার সঙ্গীরা) তার স্থলে দুই মুদ (দুই মুদ হলো এক সার দু ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ এক সের সাড়ে তের ছটাক) গম নির্ধারিত করেছেন।
অনুচ্ছেদ ঃ এক সা কিশমিশ-মোনাক্কা প্রদান করা।
১৪১১. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) এর যমানায় আমরা ফিতরা বাবদ (মাথা পিছু) এক সা খাবার অথবা এক সা খেজুর অথবা এক সা যব কিংবা এক সা কিশমিশ-মোনাক্কা প্রদান করতাম। মুয়াবিয়া এর যামানায় যখন গম আমদানী হল তখন তিনি বললেন, আমার মতে এর (গমের) এক মুদ (অন্য জিনিসের) দুই মুদের সমান।
অনুচ্ছেদ ঃ ঈদের নামাযে যাবার আগেই ফিতরা আদায় করা।
১৪১২. ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সাঃ) লোকদের (ঈদের) নামাযে গমনের পূর্বেই সদকায়ে ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
১৪১৩. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) এর যামানায় ঈদুল ফিতরের দিন আমরা ফিতরা বাবদ (মাথা পিছু) এক সা পরিমাণ খাবার প্রদান করতাম। আবু সাঈদ (খুদরী) বলেন তখন আমাদের খাবার ছিল যব, কিশমিশ-মোনাক্কা, পনির ও খুরমা।
অনুচ্ছেদ ঃ ক্রীতদাস ও স্বাধীন উভয়ের উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। যুহরী বলেন, ব্যবসার ক্রীতদাসের ক্ষেত্রে যাকাত ও ফিতরা দু’টোই করতে হবে।
১৪১৪. ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) নর ও নারী এবং স্বাধীন ও ক্রীতদাসের উপর সদকায়ে ফিতর অথবা বলেছেন রোযার ফিতরা (রাবীর সন্দেহ) এক সা খেজুর অথবা এক সা যব নির্ধারিত করে দিয়েছেন। পরবর্তীকালে লোকেরা আধা সা গমকে এক (এক সা খেজুরের) সমান ধরে নিয়েছেন। ইবনে উমর (সব সময়) খেজুর প্রদান করতেন। একবার মদীনাবাসীর ওপর খেজুরের আকাল দেখা দিলে তখন তিনি যব প্রদান করেন এবং ইবনে উমর ছোট বড় সবার ফিতরা প্রদান করতেন। (রাবী নাফে বলেন) আমার ছেলে মেয়েদের ফিতরাও তিনি দিয়ে দিতেন। ইবনে উমর ওদেরকেই ফিতরা প্রদান করতেন যারা তা গ্রহণ করত এবং সাহাবারা ঈদুল ফিতরের এক কিংবা দু’দিন পূর্বেই (আদায়কারীর নিকট ফিতরা দিয়ে দিতেন)।
অনুচ্ছেদ ঃ বড় ও ছোট সবার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। আবু উমর বলেন, উমর, আলী, ইবনে উমর, জাবির, আয়শা, তাইস, আতা ও ইবনে সীরীন-রে মতে এতিমের মাল থেকেও যাকাত (সদকায়ে ফিতরা) আদায় করতে হবে। যুহুরী বলেনঃ পাগলের সম্পদেরও যাকাত দিতে হবে।
১৪১৫. ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেণ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেক ছোট, বড়, স্বাধীন ও ক্রীতদাসের ওপর সদকায়ে ফিতর এক সা যব অথবা এক সা খেজুর নির্ধারিত করে দিয়েছেন।
সদকায়ে ফিতর বা রোযার ফিতরা সম্পর্কে এ দশটি হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে-
১। সদকায়ে ফিতর কে আদায় করবে-ক্রীতদাস, স্বাধীন, নর, নারী, বালক, বৃদ্ধ, ছোট বা বড় প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উপর সদকায়ে ফিতর আদায় করা বাধ্যতামূলক।
২। কী কী উপাদানের মাধ্যমে সদকায়ে ফিতর আদায় করা যাবে-খেজুর, যব, খাবার, পনির, কিশমিশ-মোনাক্কা দ্বারা সদকায়ে ফিতর আদায় করা। প্রথম চার খলিফার সময়ে এগুলো দিয়ে সদকায়ে ফিতরা আদায় করা হত। পরবর্তীকালে মুআবিয়ার সময়ে গম প্রদান শুরু হয়। অবশ্য হাদিসে ‘খাবার’ শব্দ থাকায় সুবিধা হল আমরা যা খাবার (যার যার প্রধান খাবার) হিসেবে খেয়ে থাকি তা দ্বারা আমরা ফিতরা আদায় করতে পারি।
৩। সদকায়ে ফিতরার পরিমাণ হবে কত যে উপাদানেই দেওয়া হোক না কেন তার পরিমাণ হবে এক সা (এ দেশীয় ওজনে এক সা সমান তিন সের এগার ছটাক)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সময় থেকে চতুর্থ খলিফা পর্যন্ত এ পরিমাণই দেয়া হতো। কিন্তু মুয়াবিয়ার সময়ে এর পরিমাণ অর্ধেক হয়ে যায় অর্থাৎ আধা সা (এক সের সাড়ে তের ছটাক) হয়ে যায়।
দুই
রোযার ফিতরা সম্পর্কে আমাদের দেশে যা দেখতে পাই তা হল রমজান মাসের শেষের দিকে এসে আমাদের আলেম সম্প্রদায় এভাবে একটা ঘোষণা দেন যে এবারের ফিতরা হল এত (আধা সা গম বা চালের দাম হিসেবে ধরুন ৪৫) টাকা। আর সে মোতাবেক দেশবাসী ঐ পরিমাণ টাকা প্রদান করে নিজেদের ক্ষতিসাধান করছে। আমাদের দেশের প্রচলিত এ প্রথা সম্পর্কে আমার কিছু জিজ্ঞাসার উদ্ভব হয়েছে।
জিজ্ঞাসা-১। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সময় থেকে চতুর্থ খলিফা পর্যন্ত চলে আসা উপাদানের পরিমাণ হঠাৎ করে মুয়াবিয়ার সময়ে কেন এক সা থেকে আধা সা এ পরিণত হল?
এ বিষয়ে আমি অনেক আলেম এর সাথে আলোচনা করেছি। তারা আমাকে কোন যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর দিতে পারেন নি। তাদের কাছ থেকে যেসব উত্তর পেয়েছি তার কয়েকটি নিম্নরূপ-
উত্তর ১.১। মনে হয় অন্যান্য প্রদেয় উপকরণের চেয়ে গমের দাম বেশী ছিল।
এ উত্তর আমি গ্রহণ করতে পারি নি। কারণ হিসেবে আমি তাদের পাল্টা প্রশ্ন করেছি যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সময়ে উল্লেখিত পন্যসমূহের দাম কি এক রকম ছিল? যেমন যবের দাম, পনিরের দাম, খেজুরের দাম, কিশমিশ-মোনাক্কার দাম বা সকল খাবারের দাম কি একই ছিল? বুদ্ধি কি বলে? আর উত্তরটি ‘মনে হয়’ দিয়ে শুরু করা হয় নি কি? উত্তরদাতারা আমার এ সকল পাল্টা প্রশ্নের আর কোন জবাব দিতে পারেন না।
উত্তর ১.২। নর নারী মানে স্বামী স্ত্রী। তাহলে দু’জনের জন্যে এক সা হলে এক জনের জন্যে তো আধা সা-ই হয়।
এ উত্তর আমি গ্রহণ করতে পারি নি। এবং আর ব্যাখ্যা দেওয়ার কোন প্রয়োজন অনুভব করছি না।
উত্তর ১.৩। খেজুরের আটি আছে কিন্ত গমের কোন আটি নেই। তাই গমের বেলায় এক সা না হয়ে আধা সা দিলে হয়ে যাবে।
এ উত্তরটিও আমি নিতে পারলাম না। কারণ রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যামানায় খেজুরও দেওয়া হত আবার পনির বা যবও দেওয়া হত। তখন খেজুরের আটির জন্যে কি পনিরের পরিমাণ কম দেওয়া হত? তখন যা-ই দেয়া হোক না কেন তার পরিমাণ ছিল এক সা।
উত্তর ১.৪। এক সা এর পরিবর্তে আধা সা করায় তা আদায় করা জনগণের জন্যে সহজ হয়েছে। এক সা পরিমাণ নির্ধারিত থাকলে অনেকের পক্ষে ফিতরা আদায় করা সহজ হত না।
এ উত্তরটি আরও মারত্মক। অধিক মানুষ পালন করতে পারবে এ যুক্তিতে শরীয়তকে অর্ধেক করা কি মারাত্মক জঘন্য কাজ। মানুষ পালন করবে এ যুক্তিতে আমরা নামাজকে, যাকাতকে বা রমজানের রোযাকে অর্ধেক করে দি? তাওবা, আল্লাহ আমাদের হেফাযাত করুন।
জিজ্ঞাসা-২। হাদিসে উল্লেখিত বিভিন্ন উপকরণের কোন একটা দিয়ে সাদকায়ে ফিতরা আদায় করার কথা বলা হয়েছে। তাহলে বাংলাদেশের আলেমগণ কি ভাবে একটা রেট উল্লেখ করে থাকেন? কেন শুধু গমের বা চালের মূল্যে সাদকায়ে ফিতরা আদায় করা হবে? বাংলাদেশে কি খেজুর পাওয়া যায় না বা বাংলাদেশের মানুষ কি খেজুর খায় না? সকল ব্র্যান্ডের চাল, খেজুর বা গমের মূল্য কি একই? এর উত্তর অবশ্যই সকলের জানা। তা হলো আলেমগণ কেন একটা রেট বলে দেন?
এর কোন সদুত্তোর আলেমগণ আমাকে দিতে পারেন নি। তাদের কেউ কেউ বলতে চান হাদিসে খাবারের কথা উল্লেখ আছে। আর বাংলাদেশের জনগণের প্রধান খাবার হল ভাত। তাই তারা চালের মুল্য দিতে বলেন। এ উত্তর একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বাংলাদেশের সকল ব্র্যান্ডের চালের মূল্য এক নয়। আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস সব মুসলমান যেহেতু এক ব্র্যান্ডের একই জিনিস খায় না তাই সাদকাতুল ফিতরের রেট এক হবে না।
মুয়াবিয়া কর্তৃক সাদকায়ে ফিতরার রেট কমানোর প্রেক্ষাপট ছিল এরূপঃ
১। হযরত আলী (রাঃ) খেলাফত গ্রহণ করে ১০টি প্রদেশের দূর্নীতিপরায়ণ গভর্ণরদের পদচুণত করেন। মুয়াবিয়া সিরিয়া প্রদেশের গভর্ণরের পদ হারায়।
২। মুয়াবিয়া হযরত আলী (রাঃ) এর প্রতি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। হযরত আলী (রাঃ) এর সঙ্গে সিফ্ফিন নামক স্থানে যুদ্ধ করে। কথিত আছে এ যুদ্ধে ৫৬০০০ (ছাপ্পান্ন হাজার) লোক মারা যায়।
৩। মুয়াবিয়া অর্থের লোভ দেখিয়ে, পদের লোভ দেখিয়ে, অত্যাচারের ভয় দেখিয়ে লোকদের নিজ দলে আকৃষ্ট করত।
৪। মুয়াবিয়া জানত দরিদ্রদের চেয়ে ধনীরা দৃশ্যতঃ সমাজে বেশী প্রভাব রাখে।
৫। সাদকায়ে ফিতরার রেট কমিয়ে ধনীদের হাত করা মুয়াবিয়ার একটা অপকৌশল ছিল মাত্র।
লেখকঃ সইয়েদ মঈনুল ইসলাম কাজেমী কিচলু, ভাইস প্রেসিডেন্ট এন্ড কো-অর্ডিনেটর, ইউনাইটেড মুসলিম অর্গানাইজেশন (ইউ,এম,ও) খুলনা।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔