দুঃখজনক হলেও সত্য যে হজরত ক্বাম্বার এর কৃতিত্ব এবং অবদান অনেক রয়েছে কিন্তু ইতিহাসে তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। হজরত ক্বাম্বারের বংশধারা সম্পর্কে ইতিহাসের যুগের পাতায় বিশেষ কিছু উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে বিষয় তা হচ্ছে ইতহিাসের পাতায় হজরত ক্বাম্বার তারা বাবা দাদার পরিচয়ে না বরং আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.) এর দাশ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে এটা অবশ্যই তাঁর জন্য একটি অত্যান্ত গর্বের বিষয়।
একদা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার চাটুকারদের বলে আমার ইচ্ছা হয় যে হজরত আলী (আ.) এর একজন অনুসারীকে এনে তাকে হত্যা করে খোদার নৈকট্য অর্জন করতে! দরবারের চাটুকারগণ হজরত ক্বাম্বারের কথা বললে তাকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশে দরবারে উপস্থিত করা হয়।
হজরত ক্বাম্বার দরবারে উপস্থিত হলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাকে বলেঃ তুমি কে?
হজরত ক্বাম্বার নির্ভয়ে বলেনঃ আমি হচ্ছি তার দাশ যিনি দুইটি তরবারি দ্বারা যুদ্ধ করতেন, যার তরবারীর দুটি মাথা ছিল, যিনি দুই কেবলাতে নামাজ পড়েছেন, যিনি দুইবার রাসুল (সা.) এর কাছে বাইয়াত করেন, দুইবার হিজরত করেন, যিনি মুহুর্তের জন্যও কখনও কুফরী কাজ সম্পাদন করেননি, আমি হচ্ছি তার দাশ যিনি হচ্চেন মুমিন, সালেহ, সৎ, আম্বিয়াদের ওয়ারিস এবং আল্লাহর ওয়াসী……
যখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উক্ত কথাগুলো শুনে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়।(আল ইখতেসাস, পৃষ্ঠা ৭৩, মোজামে রেজালুল হাদীস, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১৮৬, আল ইরশাদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩৮, সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ১২৬)
কিন্তু ইতিহাসে কিছু পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে হজরত ক্বাম্বার হামেদান গোত্রের একজন। তার উপাধি ছিল “আবু হামেদান”।
তিনি কুফাতে জীবন যাপন করতেন এবং যখন থেকে তিনি হজরত আলী (আ.) এর চিনতে পারেন তখন থেকেই তিনি তাঁর অনুসারী এবং ভক্ত ছিলেন। ইমাম আলী (আ.) ও তাকে ভালবাসতেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সমূহের দ্বায়িত্বও তাঁকে দান করতেন।
বন্দিত্ব থেকে ইসলাম আনায়নঃ যখন মুসলমানদের সাথে সাসানীয়দের যুদ্ধ হতো তখন মুসলমানরা তাদের যুদ্ধের গণিমতের মাল সম্পদ বহনের জন্য বন্দি ইরানীদেরকে দাশ হিসেবে নিয়ে আসতো এবং মদীনাতে তাদের দ্বারা বিভিন্ন কাজ করাতো। যখন মুসলমানেরা শুনতে পেল যে হামেদানের পুত্র বন্দি হয়েছে তখন সে লজ্জায় নিজের মাথাকে নত করে রাখে এবং নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। তখন ইমাম আলী (আ.) তাকে ক্রয় করেন এবং তার নাম আবু হামেদান পরিবর্তন করে রাখেন ক্বাম্বার।(আল ইরশাদ, পৃষ্ঠা ১৭৩, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ১২৬)
সে অতি দ্রুত ইসলামী সমাজ এবং পরিবেশের রংঙে নিজেকে রাঙ্গিয়ে তুলে এবং ইমাম আলী (আ.) এর প্রকৃত অনুসারী হয়ে যায়। সে তার কাজের মাধ্যমে ইমাম আলী (আ.) এত বিশ্বস্ততা অর্জন করে যে হজরত আলী (আ.) ও তাঁর ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষ্য দিতেন।
হজরত ক্বাম্বারের ইমামতের মারেফাত অর্জনঃ
একদা জনৈক ব্যাক্তি হজরত ক্বাম্বারকে জিজ্ঞাসা করেন তুমি কে? তিনি প্রতি উত্তরে বলেনঃ আমি হচ্ছি সেই ব্যাক্তির দাশ যিনি হচ্ছেন মুমিনদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম, আম্বিয়াদের ওয়ারিস এবং মহান আল্লাহ তায়ালার উত্তম ওয়াসী, দয়ালু, মেহেরবান, বিনয়ি এবং সমস্ত গুণাবলি তাঁর মধ্যে রয়েছে। তিনি চালাক, বিচক্ষণ, পবিত্র, মক্কাবাসী, সাহসী, মহৎ চিন্তাধারী, ইবাদতকারী এবং জনগণের হেদায়াতকারী।(সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪৩, পৃষ্ঠা ১২৬)
হজরত ক্বাম্বারের যৌবন ও বার্ধক্যঃ
হজরত ক্বাম্বার প্রায় ৩০ বছর (২৫ থেকে ৫৫ বছর বয়স) হজরত আলী (আ.) এর খেদমত করেন। তিনি যখন থেকে ইমাম আলী (আ.) এর মারেফত অর্জন করেন তখন থেকে মৃত্যু অবধি কোনপ্রকার ঈমানী বিচ্যুতি তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি। তিনি মনেপ্রাণে হজরত আলী (আ.) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন এবং মৃত্যু অবধি তাঁর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে সরে যাননি। হজরত ক্বাম্বার শুধুমাত্র হজরত আলী (আ.) এর দাশ ছিলেন না বরং তিনি ইসলামেরও খেদমত ও রক্ষার কাজের নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
হজরত ক্বাম্বারের প্রতি হজরত আলী (আ.) এর ভালবাসাঃ
একদা হজরত আলী (আ.) ক্বাম্বারকে নিয়ে বাজারে যান এবং একটি কাপড়ের দোকানে যেয়ে দোকানিকে দুটি কাপড় দেখাতে বলেন। দোকানি দুটি কাপড় দেখায় কিন্তু একটি কাপড় দামী এবং অপরটি একটু কমদামী। ইমাম আলী (আ.) দামী কাপড়টি হজরত ক্বাম্বারকে দান করেন। হজরত ক্বাম্বার বলেনঃ হে ইমাম আপনি মেম্বারে আরোহন করেন আপনি আমার মালিক আপনাকে ভাল কাপড় পরা উচিত। প্রতি উত্তরে ইমাম আলী (আ.) বলেনঃ হে ক্বাম্বার! তুমি একজন যুবক আমি খোদার কাছে কি জবাব দিব যে আমি ভাল কাপড় পরিধান করব আর আমার অধিনস্তরা সাধারণ কাপড় পরিধান করবে। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেনঃ তুমি যা আহার করবে বা পরিধান করবে তোমার অধিনস্ত ব্যাক্তিদের তাই দান করবে অর্থাৎ কোন ধরণের পার্থক্য রাখবে না। (মানাকেবে ইবনে শাহর আশূব, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৬৬, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৪৩, ইরশাদুল কুলুব দেইলামী, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২২) ।
