আখেরাতের ওপর বিশ্বাস

by Syed Yesin Mehedi

আখেরাত বিশ্বাস মানুষের জীবনে সুদূরপ্রসারী ফলাফল নির্ণয় করে। আর সে জন্যই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) আমাদেরকে আখেরাতের ওপর ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। আখেরাত সংক্রান্ত যে বিষয়গুলোর ওপর ঈমান রাখা জরুরী তা হচ্ছেঃ
একঃ একদিন আল্লাহ তা’য়ালা সমগ্র বিশ্বজগত ও তার ভিতরকার সৃষ্টিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। এ দিনটির নাম হচ্ছে ‘কিয়ামত’।
দুইঃ আবার তাদের সবাইকে দেয়া হবে নতুন জীবন এবং তারা সবাই এসে হাজির হবে আল্লাহর সামনে। একে বলা হয় ‘হাশর’।
তিনঃ সকল মানুষ তাদের পার্থিব জীবনে যা কিছু করেছে তার আমলনামা আল্লাহর আদালতে পেশ করা হবে।
চারঃ আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক ব্যক্তির ভাল- মন্দ কাজের পরিমাপ করবেন। আল্লাহর মানদন্ডে যার সৎকর্মের পরিমাণ অসৎ কর্ম অপেক্ষা বেশী হবে, তিনি তাকে মাপ করবেন এবং যার অসৎকর্মের পাল্লাভারী থাকবে, তিনি তার উপযুক্ত শাস্তি বিধান করবেন।
পাঁচঃ আল্লাহর কাছ থেকে যারা মার্জনা লাভ করবে, তারা জান্নাতে চলে যাবে এবং যাদের শাস্তি বিধান করা হবে, তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
আখেরাতের বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা : আখেরাতের ধারণা যেভাবে মুহাম্মাদ (সা) পেশ করে গেছেন, তার আগেকার নবীরাও ঠিক তেমনি করে তা পেশ করে এসেছিলেন এবং প্রত্যেক যামানায় মুসলমান হওয়ার জন্য এটা ছিল অপরিহার্য শর্ত। যে ব্যক্তি আখেরাতকে অস্বীকার করেছে অথবা সে সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছে, সকল নবীই তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করেছেন, কেননা এ ধারণা ব্যতীত আল্লাহকে তার প্রেরিত কিতাব ও রাসূলদেরকে মেনে নেয়া সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে যায় এবং মানুষের সমগ্র জীবনই হয় বিকৃত। বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখলে সহজেই কথাটি হৃদয়ংগম করতে পারা যাবে। কাউকে যখন কোন কাজের কথা বলা হয়, তখন সবার আগে তার মনে প্রশ্ন জাগেঃ একাজ করলে কি লাভ হবে, আর না করলেই বা কি ক্ষতি হবে? এ প্রশ্ন কেন জাগে? যে কাজে কোন লাভ নেই মানুষ তাকে মনে করে অর্থহীন ও ব্যর্থ। যে কাজ সম্পর্কে মানুষের অন্তরে প্রত্যয় রয়েছে যে তাতে কোন ফায়দা হবে না, তা করার জন্য মানুষ কখনো তৈরী হবেনা। তেমনি এমন কোন কাজ থেকে কেউ বিরত হয়ে থাকতে রাজী হবে না, যাতে কোন ক্ষতি হবে না বলে প্রত্যয় রয়েছে। সন্দেহের ক্ষেত্রেও এ একই অবস্থা। যে কাজের লাভ সম্পর্কে কারো সন্দেহ রয়েছে তাতে সে কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারবে না। কোন কাজ ক্ষতিকর কিনা, সে সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে তা থেকে বেঁচে থাকবার জন্য সে কোন বিশেষ চেষ্টা করবে না। শিশুদের দিকে তাকালেই তার প্রমাণ মেলে। শিশুরা আগুনে হাত দেয় কেন? তার কারণ হচ্ছেঃ তাদের মনে প্রত্যয় নেই যে, আগুন পুড়িয়ে দেয়। আবার পড়াশুনা থেকে তারা কেন দূরে থাকতে চায়? তার কারণ হচ্ছেঃ তাদের গুরুজনরা এ থেকে যেসব কল্যাণ প্রাপ্তির কথা তাদেরকে বুঝাবার চেষ্টা করেছেন তা তাদের মনে লাগছেনা। অনুরূপ কারণেই যে লোক আখেরাতে বিশ্বাসী নয়, সে আল্লাহকে মানা ও তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলাকে মনে করে নিষ্ফল। তার কাছে আল্লাহর আনুগত্য যেমন কোন লাভ নেই, তেমনি তার না- ফরমানীতেও কোন ক্ষতি নেই। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর রাসূল ও কিতাবের মাধ্যমে যেসব আদেশ দিয়েছেন, তার আনুগত্য করা তার পক্ষে কি করে সম্ভব হবে? যদি ধরে নেয়া যায় যে, সে আল্লাহকে মেনে নিয়েছে তা হলেও তার সে মানা সম্পূর্ণ নিরর্থক, কেননা সে আল্লাহর প্রদত্ত আইনের আনুগত্য করবেনা এবং তার ইচ্ছা অনুসারে চলবে না।
এখানেই ব্যাপারটি শেষ নয়। আরো ভাল করে চিন্তা করলে বুঝতে পারা যায় যে, আখেরাতের স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি মানুষের জীবনে চূড়ান্ত প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। আগেই বলেছি, মানুষের স্বভাবই হচ্ছে এমনি যে, সে যে কোন কাজ করার বা না করার সিদ্ধান্ত করে লাভ ক্ষতির দিক বিবেচনা করে। এখন এক ব্যক্তির দৃষ্টি কেবল দুনিয়ার লাভ-ক্ষতির উপর নিবদ্ধ। এমন কোন সৎকাজের প্রবণতা তার মধ্যে কখনো দেখা যাবে না, যার কোন লাভ এ দুনিয়ায় প্রাপ্তির আশা নেই; আবার এমন কোন কাজ থেকে সংযত হয়ে থাকবে না, যা থেকে এ দুনিয়ার বুকেই কোন ক্ষতি হওয়ার মতো বিপদ সম্ভাবনা না থাকবে। অপরদিকে আর এক ব্যক্তি রয়েছে, যার দৃষ্টি রয়েছে কাজের শেষ পরিণামের উপর। দুনিয়ার লাভ -ক্ষতিকে সে মনে করে ক্ষণস্থায়ী। সে আখেরাতের স্থায়ী লাভ -ক্ষতি বিবেচনা করেই সৎকর্মের পথ অবলম্বন করবে আর অসৎকর্মের পথ বর্জন করে চলবে, তাতে সৎকর্ম থেকে তার যত বড় ক্ষতিই আসুক আর অসৎকর্ম থেকে যত বেশী লাভের সম্ভাবনাই থাকুক। চিন্তা করা দরকার এদের দু’জনের মধ্যে কত বড় প্রভেদ। একজনের কাছে সৎকাজ হচ্ছে তাই, যা সে পাবে পাবে এ ক্ষণস্থায়ী জীবনে; যেমন কিছু টাকা তার মিলবে, কিছু জমিন তার অধিকারে আসবে, হয়ত কোন পদ, সুনাম-সুখ্যাতি ও মানুষের বাহবা মিলবে, হয়ত কোন লালসা চরিতার্থ হবে, কিছুটা আকাংখা তার পূর্ণ হবে; হয়ত কিছুটা ভোগের পরিতৃপ্তি সে পাবে? তার ধারণা অনুযায়ী অসৎকাজ হচ্ছে তাই যাতে এ জীবনে কোন খারাপ পরিণাম আসে অথবা আসার ভয় থাকে; যেমন ধন- প্রাণের ক্ষতি, স্বাস্থ্যহানি, সরকার তরফের শাস্তি, কোন রকম দুঃখ কষ্ট অথবা অবাঞ্ছিত অবস্থা। পাক্ষান্তরে, অপর ব্যক্তির কাছে সৎকাজ তাই যাতে আল্লাহ খুশী হন, আর অসৎকাজ হচ্ছে তাই যাতে আল্লাহ নারাজ হন। সৎকাজের ফলে দুনিয়ায় যদি তার কোন লাভ না হয় বরং কোন ক্ষতি হয়, তবুও সে তাকে সৎকাজই মনে করে এবং প্রত্যয় পোষণ করে যে, শেষ পর্যন্ত তার সৎকাজের জন্য চিরদিনের প্রাপ্য লাভ সে আল্লাহর কাছে পাবে। অসৎকর্ম থেকে যদি তার কোন ক্ষতি নাও হয়, কোন ক্ষতির ভয় না থাকে বরং তার ফলে কাছে কেবল সুযোগ-সুবিধাই আসতে থাকে, তবুও সে তাকে অসৎকর্মই বলে মনে করে এবং প্রত্যয় পোষণ করে যে, যদি দুনিয়ায় এ সংক্ষিপ্ত জীবনে শাস্তি থেকে বেঁচে যায় এবং কিছুদিন মজা লুটবার সুযোগ পায়; তবু শেষ পর্যন্ত আযাব থেকে তার রেহাই নেই।
এ দু’টি বিভিন্ন ধারণার প্রভাবে মানুষ দু’টি বিভিন্ন পথ অবলম্বন করে। যে ব্যক্তি আখেরাতের উপর প্রত্যয় পোষণ করে না, তার পক্ষে ইসলামের পথে এক পাও অগ্রসর হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভাব। ইসলাম বলেঃ ‘ আল্লাহর পথে গরীবকে যাকাত দাও’। জবাবে সে বলে যাকাত দিতে গেলে আমার সম্পত্তি কমে যাবে। আমার অর্থের উপর আমি সুদ নেব এবং সুদের ডিক্রিতে তাদের ঘরের শেষ কপর্দকটি পর্যন্ত ক্রোক করে নেব। ইসলাম বলেঃ ‘হামেশা সত্যিকথা বল, আর মিথ্যা থেকে সংযত হয়ে থাক, সত্যভাষণ তোমার যতই ক্ষতি হোক আর মিথ্যা ভাষণে যতই লাভ হোক। জবাবে সে বলেঃ এমন সত্যকে গ্রহণ করে আমি কি করব, যাতে আমার কেবল ক্ষতিই হবে, কোন লাভ হবে না? আর এমন মিথ্যা থেকে আমি সংযত হয়ে থাকবো কেন যা আমার জন্য লাভজনক হবে এবং যাতে কোন দুর্নামের ভয় পর্যন্ত নেই? এক নিঃসংগ পথ অতিক্রম করতে করতে তার দৃষ্টি পড়ছে একটি বহু মূল্যবান বস্তু, অমনি ইসলাম তাকে বলে, ‘এ তোমার সম্পত্তি নয়, কিছুতেই তুমি এ জিনিস গ্রহণ করতে পার না, সে তার জবাব দেয় ঃ আপনা আপনি যে জিনিস আসে তা কেন ছেড়ে দেব। এখানে তো এমন কেউ নেই যে দেখে পুলিশকে খবর দেবে। অথবা আদালতে সাক্ষ্য দেবে অথবা লোকের কাছে আমার বদনাম করবে। এরপর কেন আমি কুড়িয়ে পাওয়া অর্থ থেকে লাভবান হব না? একটি লোক গোপনে তার কাছে কিছু জিনিস আমানত রেখে মারা যায়? ইসলাম তখন তাকে বলেঃ আমানত বিনষ্ট কর না; যার ধন তার সন্তান -সন্তুতির কাছে পৌঁছে দাও। সে বলে উঠেঃ কেন? মৃত ব্যক্তির ধন যে আমার কাছে রয়েছে তার তো কোন সাক্ষী নেই তার সন্তান -সন্তুতিও এ খবর জানেনা। সহজেই আমি যখন কোন আইনের ভয় না করে কোন বদনামীর আশংকা না করে আত্মসাৎ করতে পারি,তখন কেন তা করব না? সোজা কথায় জীবনের পথে প্রত্যেক পদক্ষেপে ইসলাম তাকে এক বিশেষ পথে চলার নির্দেশ দেবে, আর সে তার সম্পূর্ণ বিপরীত পথ অনুসরণ করে চলবে। কেননা ইসলামে প্রত্যকটি জিনিসের কদর ও মূল্যমান নির্ধারিত হয় আখেরাতের স্থায়ী ফলাফল বিবেচনায়; কিন্তু সে ব্যক্তি প্রত্যেক ব্যাপারে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে পাওয়ার মত ফলাফলের উপর। আখেরাতের উপর ঈমান পোষণ ব্যতীত মানুষ যে কেন মুসলমান হতে পারে না, তা এখন সুস্পষ্টরূপে বুঝতে পারা যায়। মুসলমান হওয়া তো দূরের কথা প্রকৃতপক্ষে আখেরাতকে অস্বীকার করে মানুষ মুনষ্যত্ব থেকে নেমে গিয়ে পশুত্ব অপেক্ষা নিম্নতর স্তরে চলে যায়।
আখেরাত বিশ্বাসের সত্যতা : আখেরাতে বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা ও কল্যাণকারিতা আলোচনা করার পর এখন সংক্ষেপে বলতে চাই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা) আখেরাত বিশ্বাস- সম্পর্কে আমাদেরকে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা যুক্তির দিক দিয়েও সত্য বলে আপনাদের বোধ্যগম্য হয়। যদিও নিছক যুক্তিভিত্তিক না হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থার উপরই আমাদের এ বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে,তবুও আমরা যখন বিশেষভাবে চিন্তা করি, তখন আখেরাত সম্পর্কিত সকল বিশ্বাসের মধ্যে এ বিশ্বাসকেই সবচেয়ে যুক্তিভিত্তিক মনে হয়।
আখেরাত সম্পর্কে দুনিয়ায় তিন রকমের বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছেঃ
এক দলের ধারণা মরার পর মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর আর কোন জীবন নেই। এ হচ্ছে নাস্তিকের বিশ্বাস যারা নিজেরদেরকে বিজ্ঞানী বলে দাবী করে।
দ্বিতীয় দল বলে, মানুষ নিজস্ব কর্মফল ভোগ করার জন্য বারবার এ দুনিয়ায় দেহ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অসৎ কাজ করলে পরজন্মে তারা কুকুর বিড়ালের মত কোন জানোয়ার হয়ে আসবে, অথবা কোন গাছ হয়ে জন্মাবে, অথবা কোন নিকৃষ্ট স্তরের মানুষের আকৃতি ধারণ করবে। আর যদি ভাল কাজ করে তাহলে আরো উঁচু স্তরের জীবনে পৌঁছবে। কোন কোন জড়ত্ব প্রাপ্ত ধর্মে এ ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
তৃতীয় দল কিয়ামত, পুনর্জীবন লাভ, আল্লাহর আদালতে উপস্থিতি এবং কৃতকর্মের প্রতিদান ও প্রতিফলের উপর ঈমান পোষণ করে। এ হচ্ছে সকল নবীর সাধারণ বিশ্বাস।
এবার প্রথম বিশ্বাস সম্পর্কে চিন্তা করা যাক। তাদের বক্তব্য হচ্ছেঃ ‘ মরার পর কাউকে জীবিত হতে আমরা দেখিনি। আমরা বরং দেখি মানুষ মরার পর মাটিতে মিশে যায়। সুতরাং মৃত্যুর পর আর কোন জীবন নেই। কিন্তু চিন্তা করে দেখলে বুঝা যায় যে, এ কথার মধ্যে কোন যুক্তি নেই। মরার পর কাউকে জীবিত হতে দেখা যায়নি, এ জন্য বড় জোর বলা যায়ঃ মরার পর কি হবে আমরা জানিনা ‘ এর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে যে দাবী করা হয়, মরার পর কিছুই হবে না, আমরা জানি এর স্বপক্ষে কি প্রমান পেশ করা যেতে পারে? যে পল্লিবাসী কখনো উড়োজাহাজ দেখেনি, সে বলতে পারেঃ উড়োজাহাজ কি জিনিস আমার জানা নেই। কিন্তু সে যখন বলেঃ ‘আমি জানি উড়োজাহাজ বলতে কোন জিনিসই নেই। ‘ তখন বুদ্ধিমান লোকেরা তাকে নির্বোধ বলবেন। কারণ কোন বিশেষ জিনিস না দেখবার অর্থ এ হতে পারে না যে, তা কোন অস্তিত্ব নেই। একটি মানুষ কেন, বরং সারা দুনিয়ার মানুষও যদি একটা বিশেষ জিনিস না দেখে থাকে, তবুও এ দাবী করা চলে না যে সে জিনিসটির অস্তিত্ব নেই অথবা তা থাকতেই পারে না।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বিবেচনা করা যাক। এ বিশ্বাস অনুযায়ী ব্যক্তি বিশেষ যখন মানুষ হিসেবে বর্তমান জীবনযাপন করেছে, তখন তার কারণ হচ্ছে, বিগত জীবনে সে জানোয়ার থাকা অবস্থায় সৎকার্য করেছিল আর যে জানোয়ার বর্তমান জীবনে জানোয়ার হিসেবে অতিবাহন করছে, অতীত জীবনে মানুষ হিসেবে বসবাস করে সে অসৎকার্য করেছিল। অন্য কথায় মানুষ জানোয়ার অথবা বৃক্ষ হওয়া প্রকৃতপক্ষে অতীত জীবনের কর্মফল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছেঃ প্রথমে কি জিনিস ছিল? যদি বলা হয় যে, সবার আগে ছিল মানুষ তাহলে মেনে নিতে হবে যে, তারও আগে ছিল জানোয়ার অথবা বৃক্ষ নইলে প্রশ্ন উঠবেঃ মানুষের আকৃতি কোন্ সৎকর্মের পরিবর্তে পাওয়া গিয়েছিল? যদি বলা হয় সবার আগে পশু অথবা বৃক্ষ ছিল ; তাহলে মেনে নিতে হবে যে তারও আগে ছিল মানুষ নইলে প্রশ্ন উঠেঃ বৃক্ষ অথবা পশুর আকৃতি কোন অসৎকর্মের শাস্তি স্বরূপ পাওয়া গিয়েছিল? সোজা কথা এ বিশ্বাসের অনুসারীরা সৃষ্টির প্রারম্ভিক রূপ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেনা, কেননা যে কোন রূপের আগে অপর এক রূপ পরিকল্পনা তাদের পক্ষে অপরিহার্য, যাতে পরবর্তী রূপকে পূর্ববর্তী রূপসম্পন্ন সৃষ্টির কর্মফল বলে ধরে নেয়া যায়। এ বিশ্বাস সোজাসুজি যুক্তি বিরোধী।
এবার তৃতীয় বিশ্বাস বিবেচনা করা যাক। এতে সবার আগে বলা হয়েছেঃ একদিন কিয়ামত আসবে এবং আল্লাহ নিজেই তার এ কারখানাকে ভেঙ্গে চুরে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে তার জায়গায় গড়ে তুলবেন আর এক উচ্চতর পর্যায়ের উৎকৃষ্টতর কারখানা। এ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার সত্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ ও অবকাশ নেই। দুনিয়ার এ কারখানা নিয়ে যত চিন্তা করা যায়, তত বেশী করে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এটা একটি স্থায়ী কারখানা নয়, কারণ যেসব শক্তি এর ভিতরে কাজ করে যাচ্ছে, তারা সবাই সীমাবদ্ধ ও একদিন তাদের সমাপ্তি নিশ্চিত। এ কারণে সকল বিজ্ঞানী এ সম্পর্কে এক মত যে, একদিন সূর্য শীতল ও জ্যোতিহীন হয়ে যাবে, গ্রহ উপগ্রহসমূহের পরস্পরের মধ্যে ঘটবে সংঘাত এবং দুনিয়া হয়ে যাবে ধ্বংস।
দ্বিতীয় কথাটি বলা হয়েছেঃ ‘মানুষকে দ্বিতীয়বার জীবন দান করা হবে। ‘ এও কি সম্ভব? যদি অসম্ভব হয়, তা হলে মানুষ বর্তমানে যে জীবন উপভোগ করছে, তা কি করে সম্ভব হল? স্পষ্টতঃ যে, আল্লাহ এ দুনিয়ায় মানুষকে পয়দা করেছেন, অপর কোন দুনিয়ায়ও তিনি মানুষকে আবার নতুন করে পয়দা করতে পারেন।
তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছেঃ ‘মানুষ এ দুনিয়ার জীবনে যা কিছু কাজ করেছে, সবকিছুর রেকর্ড সংরক্ষিত হয়ে রয়েছে এবং হাশরের দিন তা পেশ করা হবে। এ দুনিয়ায়ও এর প্রমাণ আজ আমরা পাচ্ছি। আগেকার দিনের চলতি ধারণা ছিল যে, যে আওয়াজ মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, হাওয়ার উপর তা কিছুটা তরঙ্গ সৃষ্টি করে মিলিয়ে যায়। কিন্তু আজকের দিনে আমরা জানতে পারছি যে, প্রত্যেক আওয়াজ তার গতি পথে বিভিন্ন জিনিসের উপর দাগ রেখে যায়। সে আওয়াজ আবার নতুন করে সৃষ্টি করা যায়। অবশ্যি এ নীতির উপরই উদ্ভাবন করা হয়েছে গ্রামোফন রেকর্ড।
তা থেকেই বুঝা যায় যে, যেসব জিনিস আমাদের গতি পথে আসছে, তার সব কিছুতেই আমাদের গতিবিধির চিহ্ন অংকিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সম্পূর্ণ আমলনামা যে সংরক্ষত হয়ে আছে এবং তা যে পুনরায় হাজির করা যেতে পারে তা এঅবস্থা থেকে প্রত্যয় সহকারে উপলব্ধি করা যেতে পারে।
চতুর্থ বিষয় হচ্ছেঃ ‘আল্লাহ হাশরের দিনে আদালত বসাবেন, ন্যায়নীতি অনুযায়ী আমাদের ভাল-মন্দ কাজের পুরস্কার ও শাস্তি বিধান করবেন। একে কে অসম্ভব বলতে পারে? এর মধ্যে কোন কথাটি যুক্তি বিরোধী? যুক্তির দাবীই হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাঁর ন্যায়ের আদালতে ন্যায়নীতি অনুযায়ী সবকিছুর সিদ্ধান্ত করবেন। আমরা দেখতে পাই, এক ব্যক্তি ভাল কাজ করে, অথচ দুনিয়ায় তার কোন লাভ সে পায় না। আবার এক ব্যক্তি খারাপ কাজ করে যায়, অথচ তার কোন ক্ষতি সে ভোগ করে না। শুধূ তাই নয়, বরং আমরা এমনি হাজার হাজার দৃষ্টান্ত দেখতে পাই, ব্যক্তি বিশেষ ভাল কাজ করে যাচ্ছে অথচ উল্টো তার ক্ষতি হচ্ছে। পাক্ষন্তরে, অপর ব্যক্তি খারাপ কাজ করেও বেশ মজা লুটছে। এ ধরনের সব ঘটনা লক্ষ্য করে  ‍যুক্তি দাবী করে যে, কোন না কোন জয়গায় সৎকর্মশীল ব্যক্তির সৎকার্যের ও দুস্কৃতি পরায়ণ ব্যক্তির দুস্কৃতির প্রতিফলন পাওয়া প্রয়োজন।
সর্বশেষ জিনিস হচ্ছে জান্নাত ও জাহান্নাম। তার অস্তিত্ব অসম্ভব নয়। যে আল্লাহ চন্দ্র, সূর্য, মঙ্গল গ্রহ ও জমিন সৃষ্টি করতে পারলেন, শেষ পর্যন্ত- তিনি কেন জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করতে পারবেন না? তিনি যখন আদালত বসিয়ে মানুষের ভাল-মন্দের পুরস্কার ও শাস্তি বিধান করবেন, তখন পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য লোকদের কোন বিশেষ সম্মান, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের এবং শাস্তি পাওয়ার যোগ্য লোকদের জন্য অপমান দুঃখ বেদনা ভোগের জন্য স্থান নির্দিষ্ট থাকাও প্রয়োজন।
এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করলে যুক্তি আপনিই বলে উঠবে যে, দুনিয়ার মানুষের পরিণাম সম্পর্কে যত ধারণা রয়েছে, তার মধ্যে এ ধারণাই হচ্ছে সবচেয়ে যুক্তিসংগত এবং এর ভিতরে অযৌক্তিক অথবা অসম্ভব কিছুই নেই।
আল্লাহর সাচ্চা নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) যখন একে সত্য বলে বর্ণনা করে গেছেন এবং এর সবকিছুই আমাদের জন্য কল্যাণকর, তখন বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে এর উপর প্রত্যয় পোষণ করা এবং বিনা যুক্তিতে এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ না করা ।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔