সৃষ্টিকুলের তাসবীহ্

by Syed Yesin Mehedi

সৃষ্টিকুলের তাসবীহ্
সপ্ত আসমান ও যমিন এবং এতোদ্ভয়ের মাঝে যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহর তাসবীহ্ পাঠ করে।( সূরা: জুমুআহ্, ১ম আয়াত)

প্রাণীই হোক – যেমন পাখি; আর অপ্রাণীই হোক – যেমন পাহাড় ( সূরা: আম্বিয়া, ৭৯তম আয়াত।) এবং বস্ত্র ও বিজলী,(সূরা: রাআদ, ১৩তম আয়াত ) এদের সবার তাহসবীহ্ কিন্তু সম্পূর্ণ সজাগ ও অনুভূতি সহকারে। (কুল্লুন ক্বাদ্ আলেমা সালাতাহু ওয়া তাসবীহাহু।) { সূরা: নূর, ৪১তম আয়াত }
ফেরেশতাগণের তাসবীহ্ এত বিস্তৃত যে, নবী করিম (সা.) বলেন: “আসমানসমূহে এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও ফাঁকা নেই। বরং প্রত্যেকটি স্থানে কোনো না কোনো ফেরেশ্তা নামায ও তাসবীহ্তে মশগুল রয়েছেন।”(তাফসীরে কুরতুবী, ৮ম খন্ড, পৃ. ৫৫৮১)
ইমাম সাদিক্ব (আ.) বলেন: “যখনই হযরত দাঊদ (আ.) যাবুর পাঠ করতেন তখন এমন কোনো পাহাড়, পাথর ও পাখি ছিল না যে তাঁর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাত না!”( তাফসীরে নূরুস্ সাকালাঈন, ৩য় খন্ড, পৃ. ৪৪৪ )

হাদীসসমূহে আমাদের প্রতি নির্দেশ এসেছে যে, তোমরা চতুষ্পদ প্রাণীদের মুখে প্রহার করো না! কেননা তারা তাসবীহ্ পাঠাবস্থায় রয়েছে।
অদৃশ্য জগতের প্রতি যদি তোমার দৃষ্টি খুলে দেওয়া হয় তবে তুমি দেখবে যে, বিশ্বের অণু-পরমাণুগুলি তোমার সঙ্গে সহকর্মী হয়েছে; পানি, মাটি ও ফুলের ভাষায় অনুভবযোগ্য বিবেকবান ইন্দ্রিয়ানুভূতি রয়েছে। বিশ্বের যাবতীয় অণু-পরমাণু গোপনে তোমার সঙ্গে দিবা-রাত্রি বলছে: “আমরা শ্রবণ করি, আমরা অবলোকন করি ও আমরা চেতনাসম্পন্ন; কিন্তু তোমাদের বেগানাদের সঙ্গে আমরা নীরব রয়েছি।”
একদল চড়াই পাখি চিক্ চিক্ করে আওয়ায দিতে দিতে হযরত ইমাম সাজ্জাদের (আ.) সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল তখন তিনি আশপাশের লোকদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: “পাখিরা প্রত্যহ সকালে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁর নিকট তাদের দিবসের শক্তি প্রার্থনা করে।”( তাফসীরুল মীযান, ১৩তম খন্ড, পৃ. ২০৬ )
আল্লাহর রসুল (সা.) বলেন: পশু-পাখিদের মৃত্যু তখন সংঘটিত হয় যখন তারা আল্লাহর তাসবীহ্ পাঠ করাকে বিনষ্ট করে দেয়।
কেউ কেউ বলেন: সৃষ্টিকুলের তাসবীহ্ ও সেজদা রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, প্রকৃত অর্থে নয়।
যেমনভাবে একটি সুন্দর সাইনবোর্ড চিত্রশিল্পীর পূর্ণ রুচি এবং একখানা কাব্যগ্রন্থ কবির সাহিত্য প্রতিভার সাক্ষ্য বহন করে তেমনিভাবে সৃষ্টিকুলের রহস্যাবৃত কাঠামো আল্লাহ তায়ালার ইল্ম, কুদরত, হিকমত ও সু²দর্শিতার উপর সাক্ষ্য প্রদান করে এবং তাঁকে যে কোনো দোষ ও অস¤পূর্ণতা হতে দূরে রাখে। আর এটিই হচ্ছে সৃষ্টিকূলের তাসবীহ্ মর্মার্থ।
প্রথমতঃ যেহেতু এ অর্থের ব্যাপারে কোনো দলীল-প্রমাণ আমাদের নেই এবং দ্বিতীয়তঃ আমরা সেখানেই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ব্যাপারে হাত দিতে পারি যেখানে শব্দের বাহ্যিক অর্থ করা অসম্ভব, দৃষ্টান্তস্বরূপ অত্র আয়াত: “ইয়াদুল্লাহি ফাওক্বা আইদীহিম।”( সূরা: ফাতহ্, ১০ম আয়াত)  (অর্থাৎ তাঁদের হাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে।) এখানে আমরা জানি যে, আল্লাহর হাত থাকা অসম্ভব। আর তাই আমরা বলি: “ইয়াদুল্লাহি” – এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর কুদরতি হাত। কিন্তু আমরা যদি কোনো অর্থই বুঝতে না পারি তাহলে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে হাত দেওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই।

কিভাবে আমরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে হাত দিতে পারি যেখানে পবিত্র কুরআন নিজেই ঘোষণা করছে: “ওয়া ইন্ মিন্ শাইয়িন্ ইল্লা ইউসাব্বিহু বিহামদিহী ওয়ালা-কিন্ লা-তাফক্বাহুনা তাসবীহাহুম”( ইসরা, ৪৪তম আয়াত) অর্থাৎ ধরায় এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ বুঝতে পার না।
কিভাবে আমরা ব্যাখ্যায় হাত দিতে পারি যেখানে পবিত্র কুরআন এরশাদ করছে: “ওয়ামা-ঊতীতুম্ মিনাল্ ইল্মি ইল্লা ক্বালীলা;” অর্থাৎ তোমাদেরকে জ্ঞান হতে কিঞ্চিত পরিমাণ দান করা হয়েছে।
রসুল (সা.) যিনি সীমাহীন জ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাঁর বাণী হতে পবিত্র কোরআনে একাধিকবার আমরা পাঠ করি যে, তিনি বলতেন: “ইন আদরী,”( সূরা: আম্বিয়া, ১০৯তম আয়াত ) অর্থাৎ আমি জানি না। আমরাও যদি বলি যে, আমরা জানি না ও বুঝি না তাতে কি হবে?
আকর্ষণীয় ব্যাপার এই যে, আল্লাহ তায়ালা এ মূর্খতা ও অজ্ঞতাকে আমাদের নিকট সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: “ওয়ালা কিন্ লা-তাফক্বাহুনা তাসবীহাহুম”, কিন্তু অহংকারী মানুষ এ কথা বলতে রাজি নয় যে, সৃষ্টিকূলের গোপনীয়তা অর্থাৎ সৃষ্টিকূলের তাসবীহ্ আমরা বুঝি না।
কিন্তু কুরআন কি স্পষ্টভাবে বলে দেয়নি যে, সূর্যপূজক সাবা সম্প্রদায়ের বিষয়ে হুদহুদ অবগত হল এবং সে বিষয়টি হযরত সুলায়মানকে অবগত করে বললো: “সাবা অঞ্চলের বাদশাহ্ একজন মহিলা যিনি বিশাল সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসে আছেন এবং তাঁর জনগণ সূর্যপূজা করছে। ( সূরা: নামল, ২২-২৭তম আয়াত )” হুদহুদ কোন্ শূন্যে, কোথায়, ভূমির নাম, পুরুষ হতে মহিলা, প্রজা হতে রাজা, তাওহীদ হতে শির্ক এবং অনুরূপ আরও কিছুর মাঝে পার্থক্য নিরুপণ করতে সক্ষম হয়; আর এ সবই সৃষ্টিজগতের অনুভূতির পরিচায়ক।
কিন্তু কুরআন কি বলছে না: পিপীলিকাদের মধ্যে হতে এক পিপীলিকা বললো, “তোমরা সবাই নিজ নিজ বাসায় ফিরে যাও! কেননা, সোলায়মানের সেনাবাহিনী এ স্থান দিয়ে অতিক্রম করতে যাচ্ছে এবং তারা অজ্ঞাতভাবে তোমাদেরকে পদদলিত করবে।( সূরা: নামল, ১৮তম আয়াত )
এ আয়াতসমূহে মানুষের চলাফেরা, সোলায়মানের নাম, তাদের (সেনাবাহিনী) পেশা, নিজ পদতলে তাদের অসচেতন দৃষ্টি – এসব বোঝা এবং অপর সব পিপীলিকার প্রতি সে পিপীলিকাটির সমবেদনা প্রকাশ, এ সব এমনই বিষয় যা আমাদেরকে সৃষ্টিজগতের অনুভূতি ও উপলদ্ধি ক্ষমতার প্রতি জ্ঞাত করাচ্ছে।
বস্তুতঃ যদি আমরা সৃষ্টিজগতের অনুভূতির কথা মেনে নিই যা কুরআনের দলীলের উপর ভিত্তি করে আমাদের মেনে নেওয়া উচিত, তাহলে সৃষ্টিজগতের তাসবীহ্ ব্যাপারে আর কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন থাকে না।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔