জাফরি ফিকাহ’র আলোকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির রায় প্রদান ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার কারণসমূহ (১ম পর্ব)

by Rashed Hossain

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন ড. আব্দুল কাইউম

বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ফৌজদারি (খুন-জখম, মারপিট, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি বিষয়ক) দণ্ডবিধির ক্ষেত্রে আদালতের নিয়ম হচ্ছে দ্রুত সময়ের মধ্যেই বাদী-বিবাদী বা অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণের বক্তব্য শুনে এবং সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে রায় প্রদান করা এবং নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক রায় কার্যকর করা। প্রাথমিকভাবে দীন ইসলামও একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। আদালতে আনীত অভিযোগটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, বাদীপক্ষ প্রতিপক্ষের দ্বারা ক্ষতির শিকার হয়েছেন এবং প্রতিপক্ষ কোনোভাবেই এ ক্ষতি পুষিয়ে দেননি বা পুষিয়ে দিতে রাজি হননি। কাজেই মাননীয় আদালত যেন, তার বা তাদের অভিযোগটি আমলে নিয়ে এবং সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করতঃ তা পুষিয়ে দেয়ার সুব্যবস্থা করেন।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে ন্যায়নীতিবান সব মানুষই বলবেন যে, আদালতের উচিৎ “দ্রুতই” যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাদী পক্ষের চাহিদা পূরণ করা। তবে আজকাল সাধারণভাবে “দ্রুতই” পরিভাষাটিকে অনেকেই মানতে রাজি নন। বরং তারা “সম্ভবপর “দ্রুততর” সময়ের মধ্যে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। তাদের মতে, বাদীর আবেদন বা অভিযোগের সব ফাইলকে একই পাল্লায় পরিমাপ করা সম্ভব নয় এবং তা উচিৎও না। কারণ, বাস্তব ক্ষেত্রে এক একটি কেস সংঘটিত হওয়ার ভিন্ন ভিন্ন কারণ ও প্রেক্ষাপট রয়েছে। কাজেই একটি কেসকে অপর একটি কেসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। কারও গৃহের মালপত্র চুরি-ডাকাতি করা এবং কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা- এ দুটি বিষয় কি সমান?! আদৌ না। সাধারণতঃ চুরি-ডাকাতি আসে পরার্থের প্রতি লোভ-লালসা ও পেটের ক্ষুধা থেকে এবং চোর-ডাকাতের শাস্তি আর যাইহোক না কেন, কিন্তু তাকে ফাঁসিরকাষ্ঠে ঝুলানোর কোনো আইনগত সুযোগ থাকে না। পক্ষান্তরে, কাউকে হত্যার বিষয়টি যেমন জটিল তেমনি তার শাস্তিও গুরুতর এবং এ ধরনের বিচারকার্য সম্পন্ন করতে বেশ কিছু সময়ের প্রয়োজন। কাজেই এক একটি ফাইলের সমাপ্তি টানতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের প্রয়োজন আছে। এ প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে, দ্বিতীয় পক্ষের অভিমতটিই অগ্রাধিকার পাওয়ার হকদার।

তবে উভয় পক্ষের অভিমত দুইটির যেটিই অনুসরণ করে বাদী-বিবাদীর বক্তব্য ও সাক্ষীগণের সাক্ষ্য শুনে বিচারকার্যের রায় প্রদানের পর্যায়ে উপনীত হোক না কেন, এরপরও কিন্তু বিচারক মহোদয় বা মহোদয়গণ কিছু মানবিক কারণ দৃষ্টিতে রেখে রায় প্রদানকে বিলম্বিত করতে পারেন। অনুরূপভাবে রায় প্রদান করার পরও যদি সেসব কারণের কোনো একটি দেখা দেয় বা নির্বাহী বিভাগের অবগতিতে আসে তাহলে সে ক্ষেত্রেও নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগের ঘোষিত রায়কে কার্যকর না করে স্থগিত রাখতে পারে। আর সেসব কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রুগ্নতা, পাগলামি, বয়সের স্বল্পতা, গর্ভধারণ, দুগ্ধদান, নেফাস, ইস্তেহাযা প্রভৃতি। এ কারণগুলোর বিষদ আলোচনা আমরা ক্রমান্বয়ে তুলে ধরব।

উক্ত কারণগুলোর কোনো একটিকে দৃষ্টিতে রেখে বিচারের রায় প্রদান কিংবা রায় কার্যকর করতে বিলম্ব করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তার সময়সীমার ব্যাপারে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ফৌজদারি দণ্ডবিধির পুরনো এডিশনে বলা হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে একজন বিচারক কিংবা নির্বাহী বিভাগ ছয় মাস থেকে দুই বছরকাল পর্যন্ত বিলম্ব করতে পারেন। কিন্তু পরবর্তী সংশোধিত এডিশনে বলা হয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে কাজি বা বিচারকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন যে, তার কত সময় বিলম্ব করা উচিৎ। আর এ জন্যে কাজি বা বিচারককে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুজতাহিদ হওয়া বা ইসলামি শরিয়তের জ্ঞান-পাণ্ডিত্য থাকা জরুরী।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আধুনিক যুগের অধিকাংশ বিচারকই অমুজতাহিদ [সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বেখবর]। তারা নিজেরা কুরআন-হাদিস চষে কোনো সিদ্ধান্ত বের করার যোগ্যতা রাখেন না। বরং গতানুগতিক আইনের কিছু ধারা মুখস্থ করে কিংবা আইনের কিছু বই-পুস্তক দেখে বিচারকার্য সম্পন্ন করে থাকেন।

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা ভাল যে, বিচারকার্যের এমন সুন্দর মানব হিতৈষী ব্যবস্থাপনাটি ইসলামি ফিকাহশাস্ত্রে বিশেষতঃ জাফরি মাজহাবের ফিকহের কিতাবসমূহে বহু প্রাচীনকাল থেকেই আলোচনা করা হয়েছে। আর এ মানব হিতৈষিতার দিকে দৃষ্টি রেখেই অনেক অমুসলিম দেশও এ আইনের চর্চা শুরু করেছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ার্জনের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যখন এটিকে বিধিবদ্ধ আইনে পরিণত করার চিন্তা-ভাবনা করছিল ঠিক তখনই এক সূত্রে জানতে পারে যে, ফ্রান্সের ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে এ ধরনের মানব হিতৈষী বিষয় রাখা হয়েছে। আর তখনই ইরান স্বীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে এটিকে অনুমোদন দেয়। এ দিক থেকে ফ্রান্স ইরানের অগ্রজ।

এ পরিকল্পনাটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে মানব হিতৈষী এ আইনটিকে যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা হয়, অর্থাৎ কাজি কিংবা নির্বাহী বিভাগ যদি এটিকে অবৈধ আয়ের উৎস বানিয়ে নেন তাহলে নিঃসন্দেহে বাদীপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং বিচার ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্য ভেঙ্গে পড়বে। (চলবে)###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔