আশুরার দিনে শোক প্রকাশ নাকি আনন্দ?

by Syed Yesin Mehedi

আশুরার দিনে শোক প্রকাশ নাকি আনন্দ?
লোকমান হোসাইন
আমরা এমন একটা সমাজে বেড়ে উঠেছি যে, দীর্ঘ পথ পরিক্রমার এই পরিবেশ আমাদের মুসলমানদের বিশাল একটা সংখ্যা আশুরা বা ১০ই মহাররম সম্পর্কে প্রচলিত কিছু কথাকে মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) হাদীস হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। আর আমরা সেসব হাদীসকে শুধু সহজভাবে গলাধঃকরণই করিনি, বরং আমাদের বিশ্বাসের সাথে মিলিয়ে ফেলেছি। আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত ও বানোয়াট যেসব কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে তা হচ্ছে: “আল্লাহ এই দিনে পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, কলম, লওহে মাহফুজ ও আরশ সৃষ্টি করেছেন। কুরসী সৃষ্টি করে তাতে সমাসীন হয়েছেন। জান্নাত, জিবরাঈল ও ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি ও জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। হযরত ইদ্রীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। হযরত নূহকে (আ.) নৌকা থেকে বের করেছেন। হযরত দাউদের (আ.) তওবাহ কবুল করেছেন। হযরত সুলাইমানকে (আ.) রাজত্ব দান করেছেন। হযরত আইয়ুবের (আ.) মুসিবত দূর করেছেন। এই দিনে হযরত ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, খলিফা উপাধি লাভ করেন ও নমরুদের অগ্নিকুÐ থেকে রক্ষা পান। হযরত ইসমাঈলকে (আ.) কুরবানী করা হয়। হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বের হন। হযরত ইউসুফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করা হয়। হযরত ইয়াকুব (আ.) ও হযরত ইউসুফ (আ.) পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন ও হযরত ইয়াকুব (আ.) স্বীয় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান এবং এই দিনে কেয়ামত সংগঠিত হবে – ইত্যাদি।” এই বর্ণনাগুলিতে উল্লেখিত ঘটনাসমূহ ইতিহাসে সংগঠিত হলেও তা যে মহাররম মাসের ১০ তারিখে ঘটেছিল তার কোন সত্যতা হাদীসবিদগণ খুঁজে পাননি। বরং দলিলগতভাবে বর্ণনাগুলো খুবই দুর্বল এবং কোন কোনটি অসত্য। এই রকম হাজারো বানোয়াট কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। তবে হ্যাঁ, প্রচলিত কথাসমূহের মধ্য থেকে হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীগণ যে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পান তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তবে এই দিনের রোযা, উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা বর্ণিত হাদীস দ্বারা পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়েছে।
তাহলে কেন এত মিথ্যাচার? : আল্লাহ আমাদের বিবেক দিয়েছেন। আমরা বিবেক দ্বারা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারব যে, আশুরার দিনকে ঘিরে এসব বর্ণনা সাজানো হয়েছিল যে কারণে তা হচ্ছে নিদারুণ নির্যাতনের মাধ্যমে শাফায়াতের কান্ডারি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) দেহের অংশ, হযরত ফাতেমার (আ.) কলিজার টুকরা, হযরত ইমাম আলী ইবনে আবী তালিবের (আ.) নয়নমণি, জান্নাতের সর্দার হযরত ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদতের ফলে সৃষ্ট শোকের বন্যাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ানের অনুসারীদের একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ – যেন মহানবীর (সা.) উম্মতের ক্ষোভ ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান ও তার অনুসারীদের গ্রাস করতে না পারে। আর পরবর্তীতে স্বার্থান্বেষী মানুষদের একটি চক্র মুসলমানদেরকে কারবালার শিক্ষা ও তার দর্শন থেকে দূরে রেখে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে।
প্রসিদ্ধির দিক থেকে আশুরা: ১০ই মহাররম কারবালার ঘটনার পূর্বে, অনেক মর্মান্তিক ঘটনাই ঘটেছিল। তবে সেসব ঘটনা নিয়ে এত লেখালেখি ও শোক প্রকাশ হয়নি এবং আগত কোন ঘটনা নিয়ে হবেও না। ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের ১৩৪৩ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও তাঁর শাহাদাতের শোক আজও দুনিয়াব্যাপী বয়ে চলছে। ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের ঘটনার ওপর রচিত হয়েছে অনেক গ্রন্থ, কাব্য ও মহাকাব্য। এগুলোর মাধ্যমে মানুষের মাঝে শোক, আহাজারি ও বিলাপ আজও বহমান।
কিন্তু কেন? কারণ এটা কেবল হযরত হোসাইনের (আ.) শাহাদাতই ছিল না, বরং এটা ছিল নবী জীবনেরই একটি অধ্যায়। অন্য কোন শাহাদাত যেন এই মর্যাদায় পৌঁছতে না পারে, সে জন্যই এর আলোচনা ও প্রসিদ্ধির প্রয়োজন ছিল। আর সে জন্যই অন্য শহীদদের শাহাদাতের আলোচনা হয় তাঁদের শাহাদাতের পরে। কিন্তু ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের আলোচনা হয়েছিল তাঁর শহীদ হওয়ার পূর্বে, এমনকি তাঁর মাতৃক্রোড়ে থাকাবস্থায়ই।
হযরত উম্মুল ফজল (রা.) বর্ণিত হাদীস থেকে: হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) হুজুরের (সা.) কোলে খেলা করছিলেন এমন সময় তিনি ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের কথা আলোচনা করছিলেন।
হযরত উম্মুল ফজল [নবী করিমের (সা.) চাচা হযরত আব্বাসের স্ত্রী] বিনতে হারেসা (রা.) হতে বর্ণিত, একদা তিনি রসুলের (সা.) দরবারে আগমন করে প্রার্থনা জানালেন: “হে আল্লাহর রসুল! আজ রাতে আমি এক ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছি।” নবী করীম (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন: “কী সেই স্বপ্ন?” হযরত উম্মুল ফজল (রা.) বললেন: “সেটি অত্যন্ত ভয়ানক।” নবী করীম (সা.) বললেন: “আমাকে বল দেখি, সেটা কী?” হযরত উম্মুল ফজল (রা.) বললেন, “আমি দেখলাম যে, স্বয়ং আপনার পবিত্র দেহ মোবারকেরই একটি অংশ যেন কেটে ফেলা হচ্ছে! আর সেটি এনে যেন আমার কোলে রাখা হচ্ছে।” একথা শুনে প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করলেন, “তুমি ভালো স্বপ্নই দেখেছ। আল্লাহ চায়লে ফাতেমার ঘরে এক ছেলে সন্তান আসবে যাকে তোমার কোলে দেওয়া হবে।” ঠিকই, হযরত ফাতেমার (আ.) গৃহে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) জন্ম নিলেন। আর তাঁকে এনে আমার কোলে দেওয়া হল। অতঃপর আমি রসুলের (সা.) নিকট গেলাম এবং হযরত ইমাম হোসাইনকে (আ.) হযরত নবী করীমের (সা.) কোলে তুলে দিয়ে অন্যমনস্ক হলাম। এরপর দেখতে পেলাম, নবী পাকের (সা.) দুই চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রæ ঝরছে। হযরত উম্মুল ফজল (রা.) বলেন, “আমি নবী করীমকে (সা.) বললাম, “হে আল্লাহর রসুল! আপনার চৌকাঠে আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক! আপনার এ অবস্থা কেন?” উত্তরে তিনি বললেন, “এই মাত্র হযরত জিবরাঈল (আ.) আমার নিকট আগমন করেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন যে, আমার উম্মত (মুসলমানদের একটি দল) আমার এই পুত্রকে অচিরেই শহীদ করবে।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এই সন্তানকে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” আর তিনি আমাকে সেই ভূ-খÐ হতে কিছু মাটি দিলেন যেগুলো ছিল লাল। [সূত্র: তাবরিযী, কিতাবুল মাসাবীহ, বাবু মানাকিবে আহলে বাইত; শাহাদাতে ইমাম হোসাইনের দর্শন ও শিক্ষা।]
হযরত উম্মে সালামা (রা.) বর্ণিত হাদীস: হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) তখনও শিশুই ছিলেন – এমতাবস্থায় নবী করীম (সা.) হযরত উম্মে সালামাকে (রা.) সেই স্থানের কিছু মাটি দিয়েছিলেন যেই স্থানে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) শহিদ হবেন।
হযরত উম্মে সালামা (রা.) বলেন, হযরত ইমাম হাসান ও হোসাইন (আ.) উভয়েই আমার ঘরে, নবী করীমের (সা.) সম্মুখে খেলা করছিলেন। এমন সময় নবী পাকের (সা.) খেদমতে হযরত জিবরাঈল (আ.) হাজির হয়ে বললেন, “হে মোহাম্মদ (সা.)! নিঃসন্দেহে আপনারই উম্মতের মধ্য থেকে একটি দল আপনার পুত্র হোসাইনকে আপনার পরবর্তীতে কতল করবে। হযরত জিবরাঈল তাঁকে (সেই জায়গার) কিছু মাটি দিলেন। হুজুরে পাক (সা.) মাটিগুলো নিজের বুকে লাগালেন আর কান্না করতে লাগলেন। অতঃপর এরশাদ করলেন:
“হে উম্মে সালামা! যখন দেখবা যে, এই মাটি রক্তের রূপ ধারণ করেছে তখনই বুঝে নিবা যে, আমার পুত্র হোসাইনকে কতল করা হয়েছে।” হযরত উম্মে সালামা (রা.) সেই মাটিকে একটি বোতলে যতœ সহকারে রেখে দিয়েছিলেন। আর প্রত্যেক দিনই সেই মাটির প্রতি লক্ষ্য করতেন আর বলতেন, হে মাটি! যেদিন তুমি রক্ত হয়ে যাবে সে দিনটি হবে অতিশয় মহান। (সূত্র: আল্ খাসায়িসুল কুবরা, র্সিরুশ্ শাহাদাতাইন ও আল্ মু’জামুল কাবীর লিত্তাবারানী, শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস।)
শাহাদাতের স্থান চিহ্নিতকরণ: নবী করীম (সা.) শুধুমাত্র ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের সংবাদই দেননি, বরং যে স্থানে শহীদ হবেন সেই স্থানটিও চিহ্নিত করে দিয়েছেন।
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) এরশাদ করেন: হযরত জিবরাঈল আমীন আমাকে সংবাদ দেন যে, আমার পরবর্তীতে আমার পুত্র হোসাইনকে ‘ত্বাফ’ (কুফার পার্শবর্তী স্থান যা বর্তমানে কারবালা নামে পরিচিত) নামক স্থানে কতল করা হবে।
হযরত জিবরাঈল (আ.) আমার নিকট (সেই স্থানের) মাটি নিয়ে এসেছেন। আর তিনি আমাকে বলেছেন, এই মাটি হোসাইনের কবরের। (সূত্র: র্সিরুশ্ শাহাদাতাইন, জামেউল ফাওয়ায়েদ, তাবারানী রচিত তারীখে ইসলাম।)
কারবালাপ্রান্তর ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতভূমি: হযরত ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের কয়েক বছর পূর্বে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে একথা প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, তিনি কারবালাপ্রান্তরে শহিদ হবেন।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, বৃষ্টি বর্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা আল্লাহর কাছে, নবী করীমের (সা.) খেদমতে আগমন করার অনুমতি চায়লে তিনি অনুমতি পেয়েও গেলেন। সেদিন হুজুর (সা.) হযরত উম্মে সালামার (রা.) গৃহেই ছিলেন। ফেরেশতার আগমনে নবী পাক (সা.) বললেন: “হে উম্মে সালামা, দরজার দিকে খেয়াল রাখবে! কেউ যেন প্রবেশ করতে না পারে!” তিনি দরজার দায়িত্বে থাকাকালে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) আগমন করে জোরপূর্বক ভিতরে প্রবেশ করলেন। তিনি গিয়ে সোজা নবী করীমের (সা.) কাঁধের ওপর চড়ে বসলেন। আল্লাহর রসুল (সা.) তাঁকে কোলে নিয়ে চুমু দিতে লাগলেন। এমন সময় উক্ত ফেরেশতা আরজ করল: “আপনি কি তাঁকে খুবই ভালবাসেন?” নবী পাক (সা.) বললেন, “হ্যাঁ।” ফেরেশতা বলল, “আপনার উম্মতই তাঁকে কতল করবে। আপনি ইচ্ছে করলে আমি আপনাকে সেই স্থানটি দেখিয়ে দিতে পারি যেখানে তাঁকে কতল করা হবে।” অতঃপর তিনি স্বীয় হাত বাড়ালেন এবং তাঁকে লাল মাটি দেখালেন। সেই মাটি হযরত উম্মে সালামা (রা.) নিয়ে আপন কাপড়ের কোণায় বেঁধে নিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা শুনে থাকতাম যে, হোসাইন (আ.) কারবালায় শহিদ হবেন। (সূত্র: আল্ খাসায়িসুল কুবরা, র্সিরুশ্ শাহাদাতাইন, আস্ সাওয়ায়েকুল মুহরকাহ্, তারীখে ইসলাম।)
হযরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা নবী করীম (সা.) কাৎ হয়ে শুয়ে ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ জেগে উঠলেন। তখন তাঁকে খুবই চিন্তিত ও দুর্ভাবনাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল। তাঁর হাতে ছিল লাল রংয়ের মাটি। তিনি সেই মাটি নাড়াচাড়া করছিলেন। আমি আরজ করলাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! এগুলো কিসের মাটি?” তিনি এরশাদ করলেন: জিবরাঈল আমাকে সংবাদ দিলেন, আমার পুত্র হোসাইনকে ইরাকের মাটিতে কতল করা হবে। এগুলো সেখানকারই মাটি। হে উম্মে সালামা! এই মাটি যখন রক্তে রূপ নিবে তখন বুঝে নিবে যে, আমার পুত্রকে কতল করা হয়েছে। (সূত্র: আল্ মু’জামুল কাবীর লিত্তাবারানী, আল খাসায়িসুল কুবরা, র্সিরুশ্ শাহাদাতাইন।)
হযরত ইয়াহ্ইয়া হাযরামী (রা.) বলেছেন, সিফফিনের সফরে আমি হযরত আলীর (আ.) সঙ্গে ছিলাম। তিনি যখন ‘নেইনাওয়া’ নামক স্থানটির কাছাকাছি এলেন তখন বললেন, “হে আবু আব্দিল্লাহ! ফোরাতের তীরে তুমি ধৈর্য্য ধারণ করিও।” আমি বললাম, “সেখানে কী ঘটবে?” জবাবে তিনি বললেন, “প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেছেন, আমাকে জিবরাঈল আমীন বলেছেন, হোসাইন ফোরাতের তীরে শহীদ হবেন। আর তিনি আমাকে সেখানকার এক মুষ্ঠি মাটিও দেখিয়েছেন।” (সূত্র: আল খাসায়িসুল কুবরা, র্সিরুশ্ শাহাদাতাইন।)
প্রকৃতপক্ষে, ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদত সম্পর্কে এতই সাক্ষ্য-প্রমাণ বিদ্যমান ছিল যে, হযরত নবী করীমের (সা.) থাকা অবস্থাতেই ছোট-বড় সকলের নিকটই ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদতের কথা বহুলভাবে আলোচিত ছিল।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, আমরাসহ আহলে বাইতের (আ.) কারো মধ্যেই কোনোরূপ দ্বিধা-সন্দেহ ছিল না যে, ইমাম হোসাইন (আ.) ‘ত্বাফ’ নামক স্থানে শহিদ হবেন। (সূত্র: আল্ খাসায়িসুল কুবরা, র্সিরুশ্ শাহাদাতাইন ও শাহাদাতে ইমাম হোসাইনের শিক্ষা ও দর্শন।)
হযরত ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদত, নবী (সা.) কর্তৃক প্রদর্শিত: অন্যদের শাহাদতের তুলনায় হযরত হোসাইনের (আ.) শাহাদত এ কারণে ব্যতিক্রম যে, অন্যদের শাহাদতের বিষয়টি নবী করীম (সা.) ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়েছেন; কিন্ত হযরত ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের বিষয়টি স্বয়ং নবী করীমই (সা.) প্রদর্শন করেছেন।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “একদা দুপুর বেলা নবীকে (সা.) স্বপ্নে দেখলাম তাঁর চুলগুলো ছিল এলোমেলো ও ধূলামলিন। তাঁর হাতে রক্ত ভর্তি একটি বোতল। আমি আরজ করলাম, আপনার চৌকাঠে আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক! আপনার হাতে এগুলো কিসের রক্ত?” তিনি বললেন, “এগুলো হোসাইন ও তাঁর সাথীদের রক্ত। আজ সারাদিন ধরে এগুলো আমি বোতলে ভর্তি করেছি।” বর্ণনাকারী বলেন, “আমি সেই সময়টির কথা স্মরণ রেখে দিলাম। পরবর্তীতে সেই সময়টিতেই হযরত হোসাইনকে (আ.) শহিদ হওয়া পেয়েছিলাম।” (সূত্র: হিবরুল উম্মাহ, তরজুমাতুল কুরআন, শাহাদাতে ইমাম হোসাইনের শিক্ষা ও দর্শন।)
উম্মুল মুমেনীন হযরত উম্মে সালামা (রা.) যিনি ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদতের সময় জীবিত ছিলেন; তাঁর সম্পর্কে হযরত সালমা আবসারিয়া (রা.) বলেন, “আমি একদা উম্মে সালামার (রা.) নিকট গেলাম। তিনি তখন কান্না করছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কান্না করছেন কেন?” হযরত উম্মে সালামা (রা.) বললেন, “আমি আল্লাহর রসুলকে (সা.) স্বপ্নে দেখলাম যে, তাঁর মস্তক ও দাঁড়ি মোবারক ধূলামলিন। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কী ব্যাপার, আপনার বদনে এসব ধূলাবালি কিসের?” তিনি তখন বললেন, আমি এইমাত্র হোসাইনকে শহিদ হতে দেখলাম। (সূত্র: জামে আত্তিরমিযী, তারিখে ইসলাম।)
আশুরা শোক ও ক্ষোভ প্রকাশের দিন: আশুরার দিনটি কোনভাবেই আনন্দ প্রকাশের হতে পারে না। কেননা, আশুরার দিনে কারবালার প্রান্তরে এক অসম জিহাদ সংঘটিত হয়। সেখানে ইয়াযীদের ৩০ হাজারের অধিক সৈন্য দ্বারা বেষ্টিত হয়ে এবং সম্মুখের পাঁচ হাজারেরও বেশি সেনাবাহিনীর সাথে ইমাম হোসাইনের (আ.) যুদ্ধাস্ত্রহীন মাত্র ৭২জন সৈন্য নিজেদের জীবন, ইসলামের পথে, বাতিলের মোকাবেলায় উৎসর্গ করে শাহাদাতের অমৃত সুধা পান করেন। একমাত্র ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) ব্যতীত ইমাম হোসাইন (আ.) সহ নবীর (সা.) পরিবারের সকল পুরুষই শহিদ হন।
কারবালায় ইমাম হোসাইনকে (আ.) শুধু শহিদ করাই হয়নি, বরং তাঁর মাথা মোবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল যেভাবে ভেড়ার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাঁর নিথর দেহের ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে তাঁর দেহকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল। তাঁর পবিত্র দেহ মোবারকে তেত্রিশটি বর্শার এবং ত্রিশটি তরবারির আঘাতের চিহ্ন ছিল। শুধু তাই নয়, ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদতের পর উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ও ইয়াযীদ ইবনে মোয়াবিয়া তাঁর (আ.) পবিত্র দাঁতে ছড়ি দিয়ে আঘাত করছিল। অথচ সেই ঠোঁটে অসংখ্যবার চুমু খেয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। (সূত্র: তাবাকাত, তারীখে ইসলাম।)
আর তাই ইতিহাসের পাতায় এই দিনটিকে কেউ ‘মর্মান্তিক’ আবার কেউ ‘বিয়োগান্ত’ ঘটনার দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই এই দিনটি হচ্ছে নবী পরিবারের জন্যে শোক প্রকাশের এবং ইয়াযীদ ও তার অনুসারীদের জুলুমের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের দিন।
এ শোকের দিনটি সম্পর্কে মহানবী (সা.) নিজেও বেদনার্ত হয়েছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন: নবীর (সা.) অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করলে (যে অসুখে পরে তিনি ইন্তেকাল করেন) তিনি হোসাইনকে (আ.) ডাকলেন এবং তাঁকে স্বীয় বুকে চেপে ধরলেন। যখন তাঁর চেহারায় মৃত্যুর ঘাম স্পষ্ট হয়ে উঠলো তখন তিনি বললেন, “আমার কাছে ইয়াযীদ কী চায়? হে আল্লাহ, তুমি তাকে প্রাচুর্য দিও না এবং তার উপর তোমার অভিশাপ প্রেরণ কর!” এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন এবং সে অবস্থায় অনেক্ষণ থাকলেন। এরপর তাঁর জ্ঞান ফিরলে তিনি হোসাইনকে চুমু দিলেন। তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রæ ঝরে পড়ছিল আর তিনি বলছিলেন, “জেনে রাখ! আমি আর তোমার হত্যাকারী সর্বশক্তিমানের সামনে দাঁড়াব এবং তিনি আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিবেন। (সূত্র: শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস, ১ম খÐ, পৃ. ৪০।)
উম্মতের একটা অংশ যে মহানবীর (সা.) ইন্তেকালের পর তাঁর আহলে বাইতের (আ.) ওপর নির্মম নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণ করবে তা তিনি (সা.) জানতেন। আর এ কারণেই বিভিন্ন সময়ে তাঁদের ব্যাপারে কান্নাকাটি ও শোক প্রকাশ করেছেন। যেমন বর্ণিত আছে যে, হযরত সাঈদ বিন যুবাইর হতে বর্ণিত, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, একদিন আমি পবিত্র নবীর (সা.) কাছে বসেছিলাম যখন ইমাম হাসান (আ.) এলেন। নবীর (সা.) দৃষ্টি তাঁর দিকে পড়লে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, “আমার কাছে এসো! আমার কাছে আসো!!” অতঃপর তাঁকে তাঁর ডান উরুতে বসালেন। কিছুক্ষণ পর ইমাম হোসাইন (আ.) এলেন এবং নবী (সা.) তাঁকে দেখার পরও কাঁদতে শুরু করলেন। এরপর তিনি ইমাম হোসাইনকে (আ.) বাম উরুতে বসালেন। এর কিছুক্ষণ পর হযরত ফাতিমা (আ.) এলেন এবং নবী (সা.) আবারো কাঁদতে লাগলেন এবং তাঁকে তাঁর দিকে মুখ করে বসতে বললেন। এরপর যখন ইমাম আলী (আ.) এলেন তিনি আবার কাঁদতে শুরু করলেন এবং তাঁকে তাঁর ডান পাশে বসার জন্যে ইশারা করলেন। আর এ অবস্থা দেখে সেখানে বসা সাহাবীরা বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! তাঁদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে দেখে আপনি কাঁদেননি; তাদের মধ্যে কি এমন কেউ নেই যার সাক্ষাৎ আপনাকে আনন্দিত করতে পারে?”
উত্তরে নবী করীম (সা.) বললেন, “আমি তাঁর নামে শপথ করি যিনি আমাকে নবুওয়াতের সম্মান দিয়েছেন এবং আমাকে পুরো সৃষ্টি জগতের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন! এ বিশ্ব জগতে আর কেউ নেই যারা এদের চাইতে আমার কাছে বেশি প্রিয়। আমার কান্নার কারণ হচ্ছে, আমার ইন্তেকালের পর তাঁদের ওপর যে দুঃখ-কষ্ট আপতিত হবে তাই। আর আমি স্মরণ করছি সেই জুলুমের বিষয়ে যা হোসাইনের ওপর আপতিত হবে। তা এমন যে আমি যেন তাঁকে দেখতে পাচ্ছি আমার কবরে এবং পবিত্র কাবাগৃহে সে আশ্রয় নিচ্ছে, কিন্তু কেউ তাঁকে সেখানে থামতে দিচ্ছে না। এরপর সে সেই জায়গায় যাবে যা তাঁর শাহাদত এবং দুঃখ ও মুসিবতের জায়গা। তখন একদল মানুষ তাঁকে সাহায্য করবে যারা কিয়ামতের দিন আমার জাতির মধ্যে সকল শহিদের নেতা হবে। এটি এমন যে আমি যেন সেই তীরগুলো দেখতে পাচ্ছি যা তার দিকে ছোঁড়া হচ্ছে এবং সে তাঁর ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেছে। এরপর তারা তাঁকে অত্যাচার করে একটি ভেড়ার মত জবাই করবে।” এরপর তিনি কান্না ও হাহাকার করা শুরু করলেন এবং যারা তাঁর কাছে ছিল সবাই কাঁদলেন এবং তাদের আওয়াজ বাড়ছিল। এরপর তিনি উঠে বললেন, “হে আল্লাহ! আমার ইন্তেকালের পর আমার বংশকে যেসব দুঃখ-কষ্ট সইতে হবে আমি তার জন্যে আপনার কাছে নালিশ করছি।” (সূত্র: শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস, ১ম খন্ড, পৃ. ৪০-৪১।)
ইমাম হোসাইনের (আ.) জন্যে শোকপ্রকাশের মর্যাদা: হযরত রসুলে করীম (সা.) বলেছেন, “সমস্ত চোখ কিয়ামতের দিন কাঁদতে থাকবে, নিশ্চয়ই সেই চোখ ছাড়া যা হোসাইনের বিয়োগান্ত ঘটনায় কাঁদবে; সেই চোখ সেদিন হাসতে থাকবে এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ ও বিপুল নেয়ামত প্রদান করা হবে।” (সূত্র: বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খÐ, পৃ. ১৯৩।)
হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.) প্রায়ই বলতেন, “যেসব মুমিনের চোখ হোসাইন ইবনে আলী (আ.) ও তাঁর সহযোগীদের হত্যার কারণে অশ্রæপাত করে এবং সেই চোখের পানি তার গাল গড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে জান্নাতে একটি সম্মানিত গৃহ দান করবেন।” (সূত্র: ইয়ানাবীউল মুয়াদ্দাত, পৃ. ৪১৯।)
হযরত ইমাম জাফর আস্সাদিক (আ.) সব সময় বলতেন, “হোসাইন হলেন বিশ্ববাসীর কান্নার মাধ্যম।” (সূত্র: শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস, ১ম খন্ড, পৃ. ২৩।)
ইমাম মূসা র্আ রেজা (আ.) বলেছেন, “মহাররম এমনই এক মাস যখন ইসলামপূর্ব মূর্তিপূজক আরবরা রক্তপাত করাকে অন্যায় মনে করত। কিন্তু আমাদের রক্ত ঝরানো হয়েছে এ মাসে। আমাদের পবিত্রতা লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং শিশু ও নারী সদস্যদের বন্দী করা হয়েছে। আমাদের তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে যা পাওয়া গেছে তা লুট করা হয়েছে। তারা রাসুলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ককেও সম্মান করেনি। যেদিন হোসাইনকে (আ.) শহিদ করা হয়েছে সেদিন আমাদের চোখকে আহত করা হয়েছে এবং তখন থেকে অবিরাম আমাদের অশ্রæ বইছে। করাবালার ময়দানে আমাদের প্রিয়জনদের অসম্মান করা হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুঃখ ও দুর্দশার জন্যে পথ করে দিয়েছে। তাই শোকার্ত মানুষের উচিত ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদতের ওপর শোক পালন করা। কারণ এ বিষয়ে কান্না, কবিরা গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেয়।”
এরপর তিনি বলেন, “যখন মহাররম মাস আসত তখন আমার পিতাকে (ইমাম মূসা কাযিম) কেউ হাসতে দেখত না এবং তাঁর ওপর শোক নেমে আসত। দশম দিন ছিল দুঃখ, শোক এবং বিলাপের দিন এবং তিনি বলতেন, আজ হচ্ছে সেই দিন যেদিন ইমাম হোসাইনকে (আ.) অনেকে মিলে হত্যা করেছিল।” (সূত্র: শোকার্তর দীর্ঘশ্বাস, ১ম খন্ড, পৃ. ২৫।)
ইমাম জাফর আস্সাদিক বলেছেন, “আমাদের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে তার কারণে যে শোকার্ত, তার দীর্ঘশ্বাস হচ্ছে তাসবীহ এবং আমাদের বিষয়ে তার দুশ্চিন্তা হচ্ছে ইবাদত এবং আমাদের রহস্যগুলো গোপন রাখা আল্লাহর পথে জিহাদের পুরস্কার বহন করে।” এরপর তিনি বলেন, নিশ্চয়ই এ হাদীসটি স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখা উচিত। (সূত্র: শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস, ১ম খন্ড, পৃ. ২২।)
আসুন! ইসলাম ও মুসলমানদের এ মারাত্মক ক্ষতির দিনটিকে শোকের সাথে স্মরণ করি এবং হযরত রাসুলুল্লাহকে (সা.) আমাদের পক্ষ থেকে সমবেদনা পৌঁছে দেওয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করি।
আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলি মুহাম্মাদ

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔