ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ.)

by Rashed Hossain

ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান

দ্বীন বা পবিত্রতম জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা ও সার্বজনীনতার বিষয়ে বর্তমান দুনিয়ার মানুষের কাছে কিছুটা বিভ্রান্তির আবহ তৈরী করা হলেও ইসলামের ১৪৩২ বছরের ইতিহাসের সিংহভাগ সময় এ ধর্মটি অতিশয় গ্রহণযোগ্য, শান্তিপ্রিয় ও উদার জীবনাচরণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভে সক্ষম হয়। রাসুল (সাঃ), খোলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া শাসন, আব্বাসীয় শাসন, ফাতেমীয় শাসন ও উসমানী খেলাফতসহ গত প্রায় দেড় হাজার বছরে পৃথিবীর যেখানেই ইসলামী বা মুসলিম শাসন নামে যে রাজ্য ব্যবস্থার প্রচলন ঘটেছিল তার অধিকাংশই কিছু দুঃখজনক ঘটনা বাদ দিলে সার্থক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবে গোত্রীয় ও বংশীয় দ্বন্দ্ব এবং ধর্মীয় চরম গোঁড়ামী আশ্রিত কতিপয় গোষ্ঠীর কারণে পুরো মুসলিম ইতিহাসের কোথাও কোথাও যে কালিমা লেপন হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
মাযহাব ও ফেরকা ভিত্তিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব, গোত্রীয় বিদ্বেষ এবং যুগে-যুগে ইসলামের সহজ-সরল, শান্তিময়, মানবিক, উদার ও প্রকৃতিজাত জীবন ব্যবস্থা ও আদর্শ কতিপয় আলেম-ওলামা, ইসলামী বিজ্ঞজন হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে জটিল, রুক্ষ, একপেশে ও সংকীর্ণভাবে উপস্থাপনের কারণে কালের পর কাল ধরে মুসলিম সমাজ জীবনে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে তো বটেই সাধারণ মুসলিম জনগণের মধ্যেও বিবাদ, বিষম্বাদ ও অনৈক্যের জন্ম দেয়। আজো পর্যন্তগোটা মুসলিম বিশ্বকে এ রোগ কুরে কুরে খাচ্ছে। বরং সময়ের ব্যবধানে তা আজ তীব্রতর রূপ ধারণ করছে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেছেন ঃ অর্থাৎ, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদেরকে নির্বাচিত করা হয়েছে মানুষ ও মানবতার কল্যাণের জন্য এবং তাদেরকে অকল্যাণ থেকে বিরত রাখবার জন্য।”
ইতিহাসে মুসলমানদের মধ্যে যে বিভেদ ও অনৈক্যের অধ্যায় তার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ খুবই দুর্বল-দুঃখজনক। যেখানে যতটুকু এ বিষয়ে উদ্যোগ ও চেষ্টা চালানো হয়েছে ধৈর্য, ত্যাগ ও অদূরদর্শিতার কারণে তা পদে পদে ব্যর্থ হয়েছে বার বার। এর দৃষ্টান্তআমরা মুসলিম দেশগুলোর জাতীয় পর্যায়ে লক্ষ্য করেছি, অন্তর্জাতিক পর্যায়েও হয়েছি হতাশায় নিমজ্জিত। বরং মাঝে মাঝে ঐক্যের উদ্যোগ কখনো কখনো অনৈক্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ সামাজিক ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত ও পরিচিত। পবিত্র কোরআনে মানব গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ঃ অর্থাৎ, “হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের এবাদত ও আনুগত্য কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে। আশা করা যায় তোমরা পরহেযগার ও সংযমী হবে”।
এ আয়াতে গোটা মানব জাতিকেই তার প্রতিপালনকারীর প্রতি আনুগত্য ও এবাদতের আহ্বান জানানো হয়েছে। খোদা তায়ালার গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় এ আহ্বানটির মূলে ঐক্যবদ্ধ আনুগত্য ও সৌহার্দপূর্ণ একটি মানব সমাজই যে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য এতে কোন সন্দেহ নেই।
ভিন্ন ধর্মের মানুষ হলেও তাদেরকে নিয়েও যে ঐক্যবদ্ধ ও সম্প্রীতিতে ঘেরা একটি মানব সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব তার সফল উদাহরণ প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রতিষ্ঠিত মদিনার সমাজ ও রাষ্ট্র। আমার বিশ্বাস প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর আহলে বাইত-ই হলেন মুসলিম জাতির ঐক্যের সৌধ। আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি অন্তরের ভালবাসার অভাব, বিদ্বেষপূর্ণ গোত্রীয় স্বার্থ এবং জীবন ও জগতের ইসলামী নির্মল দর্শনকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা লিপ্সু ব্যক্তিবর্গের ঔধ্যত্বপূর্ণ কর্মকান্ডের কারণে ইসলামের সেই ঐক্যের সৌধকে আমরা পরিচর্যা করতে পারিনি।
তিন খলিফার শাহাদতবরণ, কারবালার মর্মস্পর্শী নিষ্ঠুর ঘটনা, আহলে বাইতের সদস্যদের প্রতি সীমাহীন নির্যাতন, সকল মাযহাবের ইমামদেরকে হত্যা মুসলিম দুনিয়ার ঐক্য ও শান্তিকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছে। বিপরীতে মাযহাবী ও ফিরকাগত গৌন মতপার্থক্যগুলোকে ঈমান, রেসালাত ও আখেরাতের মত মূল বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিয়ে মুসলিম জাতির ঐক্যের ভিত্তি মূলকেও নড়বড় করে দিয়েছে। বর্তমান মুসলিম উম্মাহ এ বিষয়টিকে যতবেশী ও যতদ্রুত উপলব্ধি করে এর প্রতিকারের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে ভাববেন, বিশ্বায়নের এই দুনিয়ায় জাতি হিসেবে কেবল মুসলিম উম্মাহই বিপদ ও যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবে না বরং বর্তমান পৃথিবীর ভিন্ন ধর্মাবলম্বী আদম সন্তানরাও শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলার ঠাঁই খুঁজে পাবে।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের লক্ষ্যঃ

ইসলামী উম্মাহর ঐক্যের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে চারটি মৌলিক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন।
এক. ইসলামী ঐক্য মুসলমানদের জন্য এমন এক প্রকৃত শক্তির ব্যবস্থা করতে পারে যা সকল অনৈসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহের পরে সবচেয়ে বড় নির্ভরস্থল হিসেবে গণ্য হতে পারে। কারণ মুসলমানরা বিশাল মানব সম্পদ, প্রচুর বস্তুগত উপায়-উপকরণ, গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান, সমুন্নত আধ্যাত্মিক চেতনা এবং স্বীয় সংস্কৃতি, চিন্তা-বিশ্বাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণের অধিকারী।
দুই. ইসলামী ঐক্য মুসলমানদের জন্য ইসলামী তথ্যসূত্রসমূহ নিয়ে যথার্থ ও ব্যাপকতরভাবে আলোচনা, গবেষণা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংগ্রামে এবং বস্তুগত, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত মানবিক সমস্যাবলীর সমাধানে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সাহায্য করতে পারে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এ ধরনের গবেষণা ও আলোচনা-পর্যালোচনার ব্যাপক সম্ভাবনা কেবল শান্তি, সমঝোতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তা-গবেষণার প্রতিফলন এবং বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার পরিবেশেই কার্যে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব।
তিন. ইসলামী ঐক্য বস্তুগত ও নৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে। একই ভাবে ইসলামের সামাজিক আদর্শের বাস্তব রূপায়নের পথ ধরে ইসলামী দৃষ্টিকোণ এ সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে যে, ইসলাম সামাজিক সমস্যাবলীর সমাধান স্বীয় ক্ষমতায় প্রমাণ করবে। মুসলিম জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আত্মিক ও সামাজিক পূর্ণতার বিকাশ ঘটার ফলে এ আশা-আকাংখা বহুলাংশে বাস্তবরূপ লাভ করবে। এভাবে মুসলিম উম্মাহর পরিমন্ডলে স্বীয় লক্ষ্যসমূহ বাস্তবে রূপায়িত করার মাধ্যমে আজকের দুনিয়ায় মানবতার খেদমতে এবং মানব প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
চার. আল্লাহ তায়ালার দ্বীন হচ্ছে মানুষের স্বভাবজাত পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার নাম। তাই মুসলমানদেরকে সকল বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতা থেকে বিরত থাকতে হবে। সুর্য ও চন্দ্র যেমন আপন গতিতে উদয়-অস্ত যায়, কারো বাধা দেয়ার কোন মানসিকতা গড়ে ওঠে না, বাতাস যেমন সাদা-কালো, মুসলিম-অমুসলিম সবার গায়ে লাগে, পানি পানে যেমন সবাই সমান ভাবে তৃপ্ত হয়; খোদা তায়ালার এই দ্বীন তেমন শাশ্বত ও সবার জন্য। আমরা যারা ইসলামের অনুসারী আমাদের জীবনাচরণ দিয়েই এর সর্বব্যাপি গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারি। প্রয়োজন শুধু উদার দৃষ্টি ভঙ্গি এবং ইসলামের স্বচ্ছ ও নির্মল জীবন জগত দর্শন সম্পর্কে সচেতন থাকা।

হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর ঐক্য প্রচেষ্টাঃ

হযরত ইমাম খোমেনী মুসলিম ইতিহাসের সকল অধ্যায়ই গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই ইসলামী ঐক্য বা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর এ প্রসঙ্গে হযরত ইমাম খোমেনীর সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী ও কর্মকৌশল তুলে ধরতে চাই।
হযরত ইমাম খোমেনীর ’৮৭ বছরের সুদীর্ঘ জীবন অধ্যয়ন করলে প্রতীয়মান হয়, জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি সকল প্রকার কুসংস্কার ও সংকীর্ণতাকে পাশ কাটিয়ে এক মহাসত্য ও মহাসুন্দরের খোঁজে পথ চলেছেন। ইসলামকে তিনি সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেই এক মানবতাবাদী, চিরন্তন আদর্শ হিসেবে পুরোপুরি উপলব্ধি করেছিলেন। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস ও বিশ শতকের বাস্তবতায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি ছিল তাঁর পরম এক স্বপ্ন। তাই তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন এবং ইসলামী বিপ্লবের পূর্বাপর সময়ে অন্ততঃ সাড়ে তিনশত বক্তৃতা, বিবৃতি দিয়ে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সাতান্নটি মুসলিম রাষ্ট্রের কোন রাষ্ট্র প্রধান বা কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ইমামের সাক্ষাতে এলে তিনি তাঁর ভূমিকা বক্তব্যেই মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য ও সংহতির প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন।
সাম্রাজ্যবাদীদের চাপিয়ে দেয়া ইরান-ইরাকের প্রায় আট বছরের যুদ্ধে চরম বৈরী পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের পাঁচশত আটানব্বই নম্বর প্রস্তাব মেনে নেয়া ছিল ইমামের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। তাৎক্ষণিকভাবে এ সিদ্ধান্তের ফলে দুনিয়ার ইরানী পক্ষ বিব্রতবোধ করলেও ইমামের সিদ্ধান্তযে শতভাগ দূরদর্শিতা এবং আল্লাহ তায়ালার রহমতের ইশারা ছিল, সেটি পরবর্তী সময় থেকে আজো পর্যন্তসারা পৃথিবীর মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এ যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে মুসলিম উম্মাহর যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হতো তা তিনি ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের যাত্রালগ্নে ইসলামের দুশমনেরা এ বিপ্লবকে শিয়া বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তির বেড়াজাল ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। এমতাবস্থায় ইমাম অত্যন্তদৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করলেন, “ম’ শীয়ে নীস্তীম, ম’ সোন্নী নীস্তীম, ম’ মোসালম’ন হাস্তীম” অর্থাৎ আমরা শিয়া নই, সুন্নীও নই, আমাদের প্রকৃত পরিচয় আমরা মুসলমান।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় কুদস দিবসের প্রবর্তনঃ

হযরত ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকে অর্ধশতকেরও বেশী কালের নির্যাতিত বনী আদম মজলুম ফিলিস্তিনী জাতিকে সহযোগিতা, বলিষ্ঠ নৈতিক সমর্থন সর্বোপরি পৃথিবীর নির্যাতিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে মরহুম ইমাম পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার মাস মাহে রমজানের শেষ শুক্রবারকে আল-কুদস দিবস হিসেবে ঘোষনা করেন। ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদীদের অত্যাচার ও নিস্পেষণে পৃথিবীর এই ভূখন্ডের মানুষগুলো যখন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে নিপতিত, ঠিক তখনই তাঁর এই বিজ্ঞচিত ভূমিকা রেখে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফিলিস্তিনীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, “দুনিয়ার মুসলিম দেশগুলোর শাসকেরা যদি এক বালতি করে পানিও ঢালে, ইসরাইল ভেসে যেতে বাধ্য।” ফিলিস্তিনী জনগণের সাহায্যার্থে আজো ইরানের রাজপথে, অলিতে গলিতে দান বাক্স পেতে রাখা হয়েছে বঞ্চিত এই মানবতাকে সাহায্য করার জন্য।

ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানে আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলনঃ

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর হযরত ইমাম খোমেনীর পরামর্শে গত বিশ বছর ধরে সরকারীভাবে পৃথিবীর প্রায় সকল মুসলিম দেশের ইসলামী চিন্তাবিদদের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সম্মেলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্ম-পরিকল্পনা মুসলিম উম্মাহর জন্য নীতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। এতে সকল মত-পার্থক্যের উর্ধ্বে উঠে ইসলামের মৌল বিশ্বাসকে সামনে রেখে ফিকহী মতবাদ ও আদর্শের সাথে আধুনিক দুনিয়ায় প্রচলিত মতবাদের সংহতি ও সাযুজ্য রক্ষা করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ব্যাপকতর গবেষণার মাধ্যমে মুসলিম সমাজে বিরাজমান পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কারণগুলো চিহ্নিত করে এ অবস্থা অবসানের জন্য শান্তিপূর্ণ উপায় বের করা এ ঐক্য সম্মেলনের মহৎ উদ্দেশ্য। পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র এ ধরনের শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে নিঃসন্দেহে মুসলিম উম্মাহ মৌলিকভাবে উপকৃত হবে।

ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ ঘোষণাঃ

হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) রাসুলে পাক (সাঃ) এর পবিত্র জন্মদিনের মাস রবিউল আউয়াল মাসের সাত তারিখ থেকে সতের তারিখ পর্যন্তসময়কে ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এ পৃথিবীকে যে মহাপবিত্র অস্তিত্বের কারণে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাঁর শুভ জন্ম লগ্নকে উপলক্ষ্য করে মুসলিম উম্মাহর প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানালে, মুসলিম জাতির অনুভূতিকে নাড়া দেবে, পরস্পর মতপার্থক্য ভুলতে চেষ্টা করবে এবং নিজেদেরকে একটি সংহত ও শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে। বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশ দেশেই এ আহ্বানকে সম্মান জানিয়ে ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ পালিত হয়ে আসছে।

রুশদীর বিরুদ্ধে ফতোয়া এক ঈমানী ঐক্যের আহ্বানঃ

মানব সমাজে বিভিন্ন ধর্মের অবস্থান এবং সেগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আনুগত্য কোন অভিনব বিষয় নয় বরং আদম সন্তানের আগমনের পর থেকেই মানুষ হাজারো রকমের বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে যার যার ধর্ম-কর্ম প্রতিপালন করেন। এক্ষেত্রে এ বিশ্বাস একদিকে যেমন চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয় অন্যদিকে একে অন্যের বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি কটাক্ষ করাও চরম অমানবিক। মানুষ কেবল নিজের সুন্দর আচরণ, কর্ম ও আদর্শ দিয়েই অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে পারে। দ্যা স্যাটানিক ভার্সেস-এ সালমান রুশদী আমাদের প্রিয় নবীকে যেভাবে কটাক্ষ করেছিল তা কেবল মুসলিম মিল্লাতের বিশ্বাস ও আদর্শকেই কটাক্ষ করেনি; গোটা মানবতাকেই সে তার কুরুচীপূর্ণ ও কাল্পনিক মন্তব্য করে হেয় প্রতিপন্ন করেছিল। হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) বিষয়টিকে যথাযথভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এজন্যই তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে রুশদীর বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্তঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে তিনি মুসলিম মিল্লাতকে পরোক্ষভাবে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটিও সম্পন্ন করেন বলে মনে করি।

হজ্ব মওসুমে ইরানী হাজীদের ঐক্যের আহ্বানঃ

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ইরানী নর-নারী ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজ্ব পালন করতে গিয়ে আরাফাতের ময়দান ও মীনায় সারা পৃথিবীর মুসলমানদেরকে সচকিত করে আল্লাহু আকবার ধ্বনীর পাশাপাশি মুসলিম জাহানের দুশমনদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে মুসলিম মিল্লাতের ঐক্য জানান দিয়ে আসছেন এবং এটিকে তারা এবাদতের অংশ মনে করছেন। ইরানী হাজীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সোচ্চার ভূমিকায় কখনো কখনো চরম নির্যাতন ও গণনিধনের মতো ঘটনা ঘটেছে। উনিশশ’ সাতাশি সনে প্রায় সাড়ে ছ’শ আল্লাহর মেহমান ইরানী হাজীকে হেলিকপ্টার থেকে ব্রাশ ফায়ার করে শহীদ করা হয়েছে। যাদের বেশীর ভাগই ছিল নারী। জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন হাজার হাজার ইরানী মুসলমান। এ ঘটনা স্মরণে এলে আজো আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ইমামের দেয়া হাজীদের জন্য এ কর্মসূচীর একমাত্র উদ্দেশ্য হজ্বকে উপলক্ষ্য করে মুসলিম মিল্লাতের মাঝে ঐক্যের ভীত মজবুত করা।
ইসলাম সর্বদাই নিপীড়িত, বঞ্চিত ও মজলুম মানুষের পক্ষে। মানবতা যেখানে অসহায়, ইসলাম সেখানে সাহস যোগায়। ইসলাম উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বর্তমান দুনিয়ার মুসলমানদেরকে ইসলামের এই সুমহান বৈশিষ্ট্যগুলোকে ভুলে গেলে চলবে না। উদারতা, মানবতা, ধৈর্য ও ভালবাসা দিয়ে যে ইসলাম এক সময় বিশ্ব জয় করেছিল, আমাদেরকে সে পথেই চলতে হবে। জুলুমকে জুলুম আর জালেমকে জালেম বলার সাহসও আমাদের আবার ফিরে পেতে হবে। তবেই বিশ্বময় ইসলামের সেই সোনালী ও শান্তিময় চেতনা আবার জাগ্রত হবে। ইসলামী মেলিট্যান্স, জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসীর মতো অপবাদ মুছে যাবে আমাদের জীবন থেকে।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔